নাগরাজ তক্ষকের কাহিনীর আগেই উগ্রশ্রবা সৌতি ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের এই যে সামান্য চরিত্র-বিচারটুকু করে নিলেন, তার কারণ মহাভারতের তাবৎ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়কুলের মধ্যে এই হৃদয়বৃত্তিগুলি আমরা দেখতে পাব। ইতিহাস পুরাণ জুড়ে ব্রাহ্মণ মুনি-ঋষির সম্বন্ধে যে সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে পরবর্তীকালে, তার পেছনে ব্রাহ্মণের সামাজিক মর্যাদা বা সুবিধাভোগ যতবড় কারণ, তার চেয়েও বড় কারণ এই আপাত-কঠিন স্বভাব। অন্যায়, অভব্যতা দেখামাত্র, শোনামাত্র সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এবং তা থেকে অভিশাপ পর্যন্ত গড়িয়ে। যাওয়া। কুত্রাপি এমনও দেখা যাবে, যেমন এই উতঙ্ক-পৌষ্যের কাহিনীতেও দেখা গেল যে, অপরাধ তত না থাকা সত্ত্বেও অপরাধের অনুমানমাত্রেই অভিশাপ উচ্চারিত হয়েছে ব্রাহ্মণের মুখে। লৌকিক দৃষ্টিতে ব্রাহ্মণের আপাতিক এই দুঃস্বভাব অত্যন্ত কঠিন মনে হলেও লোক-ব্যবহারে এর তাৎপর্য আছে। অন্য উদাহরণ টেনে এনে কথা বাড়াব না, তাৎপৰ্যটা এই উতঙ্ক-পৌষ্যের কাহিনী থেকেই একটু বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।
তৈত্তিরীয় উপনিষদের এক জায়গায় পিতাকে দেবতার মতো দেখো, মাকে দেবতার মতো দেখো, আচার্যকে দেবতার মতো সম্মান করো ইত্যাদি বাণী পড়তে হত। ছোটবেলায় এগুলো বাণীর মতোই লাগত, এখন সেটা খানিকটা উপলব্ধিতে আসে। তৈত্তিরীয়ের এই একই প্রসঙ্গে বলা আছে-কাউকে যদি কিছু দাও, তো সাহংকারে দিও না, মনে বিনয় রেখে সলজ্জে দিও। যদি দিতে হয়, তো তার মধ্যে মধ্যে যেন শ্রী থাকে সৌন্দর্য থাকে, ছিছিক্কার করে ছুঁড়েমুড়ে দিও না, দেওয়ার মধ্যে যে শ্রী অর্থাৎ ছিরি’ থাকে- হিয়া দেয়। শ্রিয়া দেয়। এর পরে আছে মোক্ষম কথাটা। তৈত্তিরীয় বলেছে- যদি দিতে শ্রদ্ধা হয়, তবেই দিও। আর দিতে যদি ইচ্ছা না হয়, যদি শ্রদ্ধা না হয়, তবে দিও না বরং, তাও ভাল- শ্রদ্ধায় দেয়ম। অশ্রদ্ধয়া অদেয়ম।
এই যে শেষে নেতিবাচক কথাটা শুধু শ্রদ্ধার প্রসঙ্গে বলা হল অর্থাৎ শ্রদ্ধা না থাকলে দিও না, এই নেতিবাচক ভাবটুকু অন্যত্রও প্রযোজ্য অর্থাৎ দেওয়ার মধ্যে ‘ছিরি’ না থাকলে দিও না, অবিনয় থাকলে দিও না। রাজা পৌষ্য ব্রাহ্মণ স্নাতককে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেই খেতে দিয়েছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু তার খেতে দেওয়ার মধ্যে সেই শ্ৰী, সেই পরিচ্ছন্নতা ছিল না। অন্ন শীতল, কেশযুক্ত। শুধুমাত্র এই নিরীক্ষণী শ্ৰীর অভাবেই উতঙ্ক আজ দুঃখিত। তবে রাজা ভুল স্বীকার করে নিতেই উতঙ্ক তাকে শাপমুক্ত করেছেন এবং রাজাকে বুঝিয়ে গেছেন যে, শাপ প্রত্যাহারের ক্ষমতা তার না থাকলেও রাজাই যেহেতু দোষী, অতএব তার শাপ উতঙ্কের গায়ে লাগবে না। যাই হোক পৌষ্য-পত্নীর কানের দুল দুটি নিয়ে উতঙ্ক পথ চলতে আরম্ভ করলেন। রাজমহিষীর কথায় নাগরাজ তক্ষক সম্বন্ধে মনে তার সাবধানতা আছে ঠিকই, তবে তত ভীত তিনি নন, যতখানি রাজমহিষী তাকে বলেছেন।
এখানে একটা কথা আমায় বলে নিতে হবে। পণ্ডিতেরা উতঙ্ক পৌষ্যের কাহিনীকে মহাভারতের মৌলাংশে স্থান দেবেন না। অর্থাৎ তাদের মতে এটা প্রক্ষেপ। কিন্তু মনে রাখতে হবে–ইতিহাসের দিক থেকে এ কাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম। মহাভারতের কথকঠাকুর সৌতি উগ্রশ্রবা যখন এ কাহিনী বলছেন, তখন বৌদ্ধ ধর্মের হাওয়া এসে গেছে ভালরকম। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র বৌদ্ধধর্মের প্রভাব রুখবার জন্য সবরকম ভাবে চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় বৌদ্ধ-ক্ষপণকদের চোর সাজিয়ে নিন্দা করে উগ্রশ্রবা সৌতি তার নিজের কালের হাওয়া লাগিয়ে দিয়েছেন মহাভারতের গায়ে। এবারে আসল ঘটনায় আসি।
উতঙ্ক পথে নেমেই দেখতে পেলেন একজন উলঙ্গ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তার পিছন পিছন আসছেন। তাকে কখনও দেখা যাচ্ছে আবার কখনও সে লুকিয়ে পড়ছে উতঙ্কের দৃষ্টিকে কি দিয়ে। এইভাবে একসময় উতঙ্ক তাকে দেখতে পেলেন না এবং নিশ্চিন্তে কুণ্ডল দুটি একটি পুকুরের পাড়ে রেখে জলে নেমে স্নান-আহ্নিক সেরে নেবার ইচ্ছা করলেন। উতঃ পুকুরে নেমেছেন–এই অবসরে সেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এসে রাজরানির কানের দুল-দুটি নিয়ে পালালেন। উতঙ্ক সন্ধ্যা-বন্দনা কোনওরকমে সেরে পুকুর থেকে উঠে দেখলেন-সন্ন্যাসী পালাচ্ছেন। উতঙ্ক তার পিছু নিলেন।
এই যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে আপনার পরিচয় হল, ইনিই কিন্তু নাগরাজ তক্ষক। তিনিই নগ্ন ক্ষপণকের বেশ ধরে রাজরানির কুণ্ডল চুরি করেছেন। বস্তুত এই চুরির দায়টা সোজাসুজি তক্ষকের ওপর চাপালেই হত। কিন্তু তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে বৌদ্ধরা কত খারাপ, চুরি-তঞ্চকতার মতো হীন কাজ তারা কী রকম নির্দ্বিধায় করে– ধর্মের বৌদ্ধিক স্তরে এটা প্রমাণ করা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের পক্ষে জরুরি ছিল। সৌতি উগ্রশ্রবা সমাজের এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মহাভারতের কথা বলছেন। অতএব বৌদ্ধ ক্ষপণকের ভণ্ড বেশ তিনি কাজে লাগিয়ে দিলেন ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের পক্ষে জনমত তৈরি করার জন্য। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই প্রক্ষেপ তাই ভয়ঙ্কর রকমের গুরুত্বপূর্ণ।
উতঙ্ক ছুটতে ছুটতে বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীকে ধরে ফেললেন। সন্ন্যাসী সঙ্গে সঙ্গে আপন বেশ ত্যাগ করে নাগরাজ তক্ষকে পরিণত হল এবং তাকে ধরার সাধ্য হল না উতঙ্কের। সামনে একটি গর্ত দেখেই সর্পরাজ সেখানে ঢুকে পড়লেন এবং সেই গর্তের ভিতর দিয়েই সোজা চলে গেলেন পাতালে, একেবারে সটান নিজের বাড়িতে। যেন সাপ বলেই তার এত সুবিধে হল, আর মানুষ বলে উতষ্ক আর তাকে ধরতে পারলেন না। বুঝতে পারছি এখানে আরও দুটো কথা আমায় বলতে হবে।
