প্রসঙ্গত জানাই, যদুর বিভিন্ন বংশধর যেমন মথুরা, বিদর্ভ, মাহিষ্মতী, অবন্তী প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে যমুনা নদীর ওপার থেকে একেবারে তাপ্তী নদী পর্যন্ত সমস্ত জায়গাটাই দখল করে নিয়েছিলেন, তেমনই অনুর বংশধরেরাও বিখ্যাত হয়েছিলেন পাঞ্জাব অঞ্চলে। পরবর্তীকালে অনুর চেয়েও এই বংশ উশীনর শিবির নামে বেশি বিখ্যাত হয়েছিল। উশীনর শিবি তার দয়া আর করুণার গুণে ভারতবিখ্যাত হয়েছিলেন। কার্টিয়াস অথবা ডিয়োডোররাসের মতো পূর্বতন গ্রিক লেখকেরা ঝিলাম এবং চেনাব নদীর অন্তর্বর্তী নিম্নাঞ্চলে বিখ্যাত শিবিদের নাম শুনেছেন। যযাতিপুত্র অনুর সপ্তম পুরুষ হলেন মহামনা। তাঁর দুই ছেলে। একজন উশীনর, দ্বিতীয় জন তিতিক্ষু। ঐতিহাসিকেরা বলেন–-Usinara and his descendants occupied the Punjab, and Titikshu founded a new kingdom in the east, viz, in East Behar. তার মানে অনুবংশের একটি ধারা পূর্ব বিহারেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, অনুবংশের এই পূর্বগামিনী ধারা থেকেই প্রাচীন অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গে আর্যসভ্যতার প্রথম অনুপ্রবেশ।
যযাতির অন্য পুত্র স্থাকে নিয়ে আমাদের খুব মাথাব্যথা নেই। তবে তার বংশের অন্যতম প্রধান পুরুষ প্রচেতা এবং তার পুত্রেরা ভারতবর্ষের বাইরে আরও উত্তর দিকে গিয়ে এমন জায়গায় বসতি স্থাপন করেছিলেন, যেখানে আর্তের জনজাতির প্রাধান্য ছিল বেশি। ফলে প্রচেতার সব ছেলেই ম্লেচ্ছদের রাজা হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন।
প্ৰচেতসঃ পুত্রশতং রাজানঃ সর্ব এব তে।
ম্লেচ্ছরাষ্ট্রাধিপাঃ সর্বে হুদীচীং দিশমাশ্রিতাঃ।
এই যে দ্রহ্যুবংশে প্রচেতার নাম পাওয়া গেল, এই প্রচেতার এক ভাইয়ের নাম গান্ধার। অন্যমতে তিনি দ্রুহ্য বংশে জাত অরুদ্ধের পুত্র। গান্ধার বলে যে রাজ্যটা ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত, তা এঁরই নামে প্রতিষ্ঠিত এবং পণ্ডিতেরা বলেন গান্ধার রাজ্যেই দ্রু্যরা বাস করতেন। তখনকার দিনে গান্ধার কাশ্মীরের উপত্যকার খানিকটা নিয়ে তক্ষশিলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
যযাতির সব পুত্রের বসবাস নির্ণয় করার পরেও যার বসবাস নিয়ে আমরা এখনও উচ্চবাচ্য করিনি, তিনি হলেন তুর্বসু। ধারণা করা হয়, তুর্বসুরা রাজত্ব করতেন এখনকার মধ্যপ্রদেশের সাতনা-রেওয়া অঞ্চলে। পূর্বকালে এই অঞ্চলের আরও খানিকটা জুড়ে নিয়েই বৈশালী নগরীর মানচিত্র তৈরি করা যায়। আরও পরিষ্কার করে বললে বৈশালীতেই তুর্বসুদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলা যায়। এই বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা হলেন মরুত্ত, যার কথা আমরা পূর্বে বৃহস্পতি এবং সংবর্তের কাহিনীতে উল্লেখ করেছি। মহারাজ যুধিষ্ঠির রাজা হওয়ার পর যখন অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চাইলেন, তখন নাকি তার ভীষণ অর্থাভাব চলছে। ব্যাস প্রমুখ মুনি-ঋষিরা তখন সৎপরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন–মহারাজ! মরুত্তের সম্পত্তি গচ্ছিত আছে পাহাড়ের গুহায়। সেই সম্পত্তি, ধন-রত্ন নিয়ে এসে তোমার যজ্ঞ সম্পন্ন করো।
মহাভারতের কবি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাস যে কথাটা যুধিষ্ঠিরকে বলেননি, সেটা হল– তুৰ্ববংশীয় মরুত্ত ছিলেন এক অর্থে যুধিষ্ঠিরের পূর্বপুরুষ। কেন না, ভারত-বিখ্যাত মহারাজ দুষ্যন্ত, যাঁকে মহাকবি কালিদাস অমর করে দিয়েছেন, যাঁর পুত্রের নামে প্রখ্যাত ভরতবংশের সৃষ্টি, অথবা যার পুত্রের নামে এই দেশের নাম ভারত, সেই দুষ্যন্ত মানুষ হয়েছিলেন এই তুর্বসুবংশীয় মরুত্ত রাজার কাছে। পুরুবংশের দুষ্যন্তকে যে কোন টানে তুর্ক-বংশীয় মরুত্ত নিজের ঘরে এনে মানুষ করলেন, তার পিছনে অন্য এক ইতিহাস লুকনো আছে।
মনে রাখতে হবে–যযাতির যে পাঁচ সন্তানের নাম আমরা পেয়েছি, যযাতির মৃত্যুর পর সেই সব সন্তানের বংশধরদের মধ্যে কখনও যেমন সৌহার্দও লক্ষ্য করেছি, তেমনই কখনও দেখেছি প্রচণ্ড ঝগড়া এবং মারামারি। এইসব বিবাদ-বিসংবাদ যে খুব স্পষ্ট করে ইতিহাসের তারিখ মিলিয়ে বলে দেওয়া যাবে তা নয়, তবে মহাভারতের মূল ঘটনা কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধে এইসব পুরনো ঝগড়াঝাটির সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব যে বেশ খানিকটা আছে, সেটা বেশ ভাল করেই দেখিয়ে দেওয়া যাবে।
যযাতি গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী পৈতৃক রাজ্যটি খুব ভালবেসে পুরুকে দিয়ে গেলেন বটে, কিন্তু যযাতি যে প্রথম পুত্রটিকে রাজ্যছাড়া করেছিলেন সেই যদু কিন্তু ভিম্রাজ্যে গিয়ে এতটাই শক্তি বিস্তার করেছিলেন যে তার বংশধরেরা অতি অল্পদিনের মধ্যেই এক বিশাল মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
যদুবংশ কিছুদিনের মধ্যেই দুই বিশাল বংশে রূপান্তরিত হয়। যদুবংশের প্রথম ধারা যদুর দ্বিতীয় পুত্র ক্রোষ্ঠুর বংশ ধরে চলতে থাকে। তারা যদুর নাম বজায় রেখে মথুরা-শূরসেনী অঞ্চলে রাজত্ব করতে থাকেন। যদুপুত্রের ধারায় আছে হৈহয়-বংশ। হৈহয় হলেন যদুর প্রথম পুত্র সহস্রজিতের নাতি। এই হৈহয়বংশে বিখ্যাত কার্তবীর্যাজুনের জন্ম। যদুর দ্বিতীয়পুত্র ক্রোঙ্গুর ধারায় প্রথম বিখ্যাত রাজা হলেন শশবিন্দু। তিনি শুধু রাজা ছিলেন না, তিনি রাজচক্রবর্তী সম্রাট–চক্রবর্তী মহসত্ত্বো মহাবীর্যে মহাপ্রজঃ। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, শশবিন্দু তার পার্শ্ববর্তী পুরুবংশীয় রাজাদের রাজ্য থেকে উচ্ছেদ করে ছেড়েছিলেন, কারণ ঐতিহাসিকদের মতে–The neighbouring countries were the Paurava realm on his (Shashavindu’s) east and the Druhyu territory on his north. He appears to have conquered the Pauravas, beacuse there is a great gap in the Paurava genealogy. From this point till Dusyanta restored the dynasty long after wards, which means that the dynasty underwent an eclipse.
