ঋগবেদে যদু-তুবসু এবং অনুদের যেটুকু পরিচয় আমরা পেয়েছি, তাতে তাদের যথেষ্ট যুদ্ধবাজ মনে করার কারণ আছে, কিন্তু কোনওভাবেই তারা ব্রাহ্মণ্য যজ্ঞাচারহীন ম্লেচ্ছ-যবন ছিলেন না। একথা ঋগবেদের প্রমাণেই যথেষ্ট মেনে নেওয়া যায়। যাতির অভিশাপের অনিবার্যতা মাথায় না রেখে আমরা যদি এমনটি বিশ্বাস করি যে, যদু-তুর্ক অথবা অনুরা যেখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন, সেখানকার অধিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে পৌরাণিকেরা তাদের বংশধরদের ম্লেচ্ছ-যবন বানিয়ে দিয়েছেন, তবে বোধ করি সেই তর্কটাই বাস্তবসম্মত হবে। কারণ, ঐতিহ্যগত দৃষ্টিতে দেখলে কোনও আর্য-জাতির প্রতিভূ যদি যবনদেশ, ম্লেচ্ছদেশ অথবা শূদ্র-বসতিতে গিয়ে থাকতেন, তবে সমাজের চোখে তারা ম্লেচ্ছ যবন অথবা শূদ্রই হয়ে যেতেন। আমাদের বিশ্বাস, অনু-তুর্বসুদের ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে।
শেফার বলে এক সাহেব আছেন, তিনি ক্ষুদ্ৰজাতি এবং দাসদের মধ্যে যদু-তুবসুর বসতির অভিশাপ শুনে তাদের বংশধরদের একেবারে ‘ভীল’ বানিয়ে দিয়েছেন–racially Bhils. অন্যদিকে অনু থেকে ম্লেচ্ছজাতির উদ্ভব শুনে তার নামে নতুন জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করেছেন শেফার। তাদের নাম ‘আনব ম্লেচ্ছ’—an original stock of Anava Mleccha. এই বাঁচাল সাহেবের কত কথা আর শোনাব। এর মতে পাণ্ডব-কৌরবদের বহু পূর্বপুরুষ অর্থাৎ যযাতির সেই পরমপ্রিয় কনিষ্ঠ পুত্রটি—আমরা পুরুর কথা বলছি–তিনি নাকি সংস্কৃত ভাষাটাই ভাল জানতেন না। আর দ্রুহু লোকটার নামের মধ্যে যেহেতু ‘হ’ বা ‘দ্রোহে’র গন্ধ আছে, অতএব উনি শত্রু গোছর লোক অথবা ফরেনার। পুরু-তুর্কসুদের কোন শ্যালক যে শেফার সাহেবকে এই সব খবর দিয়েছিল, তা তিনিই জানেন।
আমরা যদু-তুর্বসু অথবা দ্রু-অনুর বিশাল বংশলতার বাঁধনে আমাদের প্রিয় পাঠকদের পেঁচিয়ে বাধতে চাই না। কিন্তু পাণ্ডব-কৌরবরা যেহেতু পুরুবংশের লোক তাই যদু-তুর্বসু অথবা অনুস্থ্যদের একটু-আধটু খবরও আমাদের নিতে হবে। নইলে, পরিবার বা সমাজগতভাবে মহাভারতের প্রধান চরিত্রগুলিকেও ভাল করে চেনা যাবে না। এমনকি সঙ্গে সঙ্গে এইসব রাজবংশের ভৌগোলিক অবস্থানটাও একটু জেনে নিতে হবে।
বলতে পারেন, যযাতির ছেলেরা পাঁচ জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার মানে হল আরেক দফা আর্যায়ন। যযাতির প্রথম পুত্র যদু এবং তার বংশধর যাদবরা গঙ্গা-যমুনার মধ্যদেশ ছেড়ে প্রথমে কোন জায়গায় এসে বসতি স্থাপন করেন, সে কথা স্পষ্ট করে বলা যায় না বটে, তবে মহাভারতে এবং পুরাণে মথুরা জায়গাটাই যাদবদের বাসস্থান বলে বারংবার চিহ্নিত। মনে রাখতে হবে, ভগবান বলে কথিত সেই বহুত মানুষটি, যাঁর নাম কৃষ্ণ, তার ঠাকুরদাদা ছিলেন শূর বা শূরসেন। এই শূরসেনের নামে যে জায়গাটা বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল, মথুরা তার একটি অঞ্চল মাত্র। আলেকজান্ডারের সমসাময়িক গ্রিক লেখকেরা মথুরার নাম জানতেন ‘মেথোরা (Methora) বলে আর শূরসেনের পুরো রাজ্যটাকে জানতেন Sourasenoi বলে। তবে এখন যে সময়ের কথা বলছি, সে অনেক আগের কথা। কৃষ্ণ-পিতামহ শূরসেন তখন কোথায়? এবং এটাও মনে রাখতে হবে, কৃষ্ণ-পিতামহ শুর বা শূরসেনের বহু পূর্বে এই যদুবংশেই শুর এবং শূরসেন নামে দুই ভাই ছিলেন। তারা বিখ্যাত কার্তবীর্যাজুনের পুত্র। হয়তো তাদের নামেই Sourasenoi।
আমরা আসলে বলতে চাই–শুধু মথুরা বলে নয়, যাদবরা প্রথমত গঙ্গা ছেড়ে একটু নীচের দিকে যমুনার ওপারে চলে এসেছিলেন এবং তারপর সে জায়গাও ছেড়ে ভারতবর্ষের দক্ষিণ দিকে বেশ খানিকটা এবং পশ্চিম দিকেও বেশ খানিকটা দখল করে নেন। এইভাবে পশ্চিমে সমুদ্রতীরবর্তী দ্বারকা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে নর্মদার পর-প্রান্তে বিদর্ভ, মাহিষ্মতী পর্যন্ত যাদবদের দখলদারি স্বীকার করে নিতে হবে। তবে এ সবের ওপরেও কিন্তু যদু বা যাদবদের প্রথম বসতি হিসেবে মথুরার কথাটাই আমাদের মনে বেশি ধরে। তার কারণ এই নয় যে, শুধু কৃষ্ণ পর্যন্ত এখানে যাদবদের স্মৃতিচিহ্ন আছে, তার কারণ আমরা শাক্যসিংহ বুদ্ধের মুখে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতেই একটা বিশাল বড়-রাস্তার খবর পাচ্ছি। এই রাস্তা একদিকে মথুরার সঙ্গে বেরঞ্জা বলে একটা জায়গায় সংযোগ ঘটিয়েছে। এই বেরঞ্জার সঙ্গে আবার যোগ রয়েছে বুদ্ধের প্রিয় শহর শ্রাবস্তীর সঙ্গে। শ্রাবস্তী হল রাপ্তী নদীর তীরে উত্তরপ্রদেশের গোন্দা জেলার বহেইচ অঞ্চল জুড়ে। কিন্তু এই বেরঞ্জা আর শ্রাবন্তীর সংযোগকারী পথটি যে সব শহর ছুঁয়ে এসেছিল সেগুলি পালি ভাষায়–সোরেয্য, সংকাসস (সাংকাশ্য) কন্নকুজ্জ (কাণ্বকুজ-কনৌজ) এবং পয়াগ-পতিষ্ঠান।
শেষ জায়গাটা যদি পালি ভাষাতেই চিনে থাকেন, তাহলে বুঝবেন, এ হল আমাদের সেই প্রয়াগের কাছে প্রতিষ্ঠানপুর। যযাতির ছেলে যদু হয়তো এইরকমই এক পুরনো রাস্তা ধরে মথুরায় এসে যাদবদের শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে একটা কথা এই সঙ্গে মনে রাখতে হবে–যদুর নামে যতবড় যদুবংশই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, রাজা হিসেবে যদুর ক্রিয়া-কলাপ এমন কিছু বিখ্যাত নয়, বরঞ্চ তার বংশধরদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা বিখ্যাত হয়েছেন শৌর্যে, বীর্যে, ক্ষমতায়। একইভাবে অনু কিংবা দুস্থ অথবা তুর্বসুও এমন কিছু বিখ্যাত নন। কিন্তু তাদের বংশধরদের মধ্যে অনেকেই শ্রুতকীর্তি রাজা-মহারাজা আছেন, যাঁদের নাম শুনলে এখনও আমরা মুগ্ধ হব।
