শতদ্রু, বিপাশা এবং সিন্ধুনদীর তীরবর্তী অঞ্চলে এই যে যুদ্ধগুলি হয়েছিল, তাতে বোঝ যায় দশ রাজার জোটের সকলেই প্রায় ভারতবর্ষের উত্তরাঞ্চলেরই অধিবাসী ছিলেন। কিন্তু এই জোটের মধ্যে কখনও আমরা সদস্য বা পুরুকে সুদাসের মিত্রস্থানেও দেখছি। আবার তুর্বসু এবং যদুকে দেখছি শত্রুস্থানে। অন্যত্র আরেক জায়গায় মৎস্যদেশবাসীদের সঙ্গে সুদাসের শত্রুপক্ষকে একত্র দেখছি। মৎস্যদেশ কিন্তু আধুনিক জয়পুরের কাছে। আরও একটি জায়গায় ‘ভেদ’ নামে এক রাজার ধ্বজান্তরালস্থিত তিনটি জনগোষ্ঠীর (অজস, শিশ্রু এবং যক্ষু) সঙ্গে যুদ্ধরত দেখছি সুদাস রাজাকে, কিন্তু সে যুদ্ধ হয়েছিল যমুনার তীরভূমিতে।
আমরা যে শতদ্রু, বিপাশা নদী থেকে আরম্ভ করে যমুনা পর্যন্ত সুদাস রাজার গতি-স্থিতি দেখাতে চাইছি, তার কারণ একটাই। পরবর্তী কালে অর্থাৎ মহাভারতে কুরু রাজাদের সঙ্গে ভরতগোষ্ঠীর রাজারা (যাঁদের মধ্যে যযাতি রাজার পাঁচ ছেলেও পড়েন) একাত্ম হয়ে যান কুরবো নাম ভারতাঃ। কিন্তু অঞ্চল এবং ভূখণ্ডের নিরিখে দেখতে গেলে বলতে হবে। অনু-হুঁ-যদু-তুর্বসুদের কথা ঋগবেদে যতই শতদ্রু-বিপাশা অথবা সরস্বতী-দৃষদ্বতী নদীর তীরবাহিনী কথা হোক, কুরুদের নাম কিন্তু তখনই যথেষ্ট শোনা যাচ্ছে কুরুশ্রবণমাবৃণি রাজানং ত্রাসদস্যবস্। এই কুরুশ্রবণ’-যার অর্থ অনেকে করেছেন কুরুদের নাম শোনা যাচ্ছে’- তিনি নাকি ঝগবৈদিক সদস্যুর পুত্র। অন্যদিকে শতপথব্রাহ্মণের মতো পুরাতন ব্রাহ্মণ গ্রন্থে কৃবি’দের নাম করে বলা হচ্ছে- পুরা-কালে পাঞ্চালদেশ বলতে কৃবি’দের বোঝাত-কৃব্যা (ক্ৰিব্যা) ইতি হ বৈ পুরা পাঞ্চালান আচক্ষতে। আধুনিকমতে পাঞ্চালের অবস্থান উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে।
শতপথব্রাহ্মণের সময়েই সেটা পুরাকাল, সে কাল নিশ্চয়ই ঋগবেদের সময় পর্যন্ত পৌঁছবে। আবার ওই শতপথব্রাহ্মণেই দেখছি পাঞ্চাল দেশের এক রাজা সাত্রাসহ যখন যজ্ঞ করছিলেন, তখন তৃসুদের উদয় হয় এবং তারা সংখ্যায় ছিলেন ছয় হাজার ছ তিরিশ জন বর্মধারী পুরুষ।
সাত্ৰাসহে যজমানেশ্বমেধেন তৌর্বশাঃ।
উদীরতে ত্রয়স্ত্রিংশাঃ ষট্সহস্রাণি বর্মিণা।
তুর্বসুদের জনসংখ্যা ঝগবৈদিক দ্রুহু্য অনুদের জনগোষ্ঠীর সংখ্যার সঙ্গে প্রায় মেলে–যষ্টিঃ সুষুপুঃ ষট্ সহস্রাঃ।
পরিষ্কার বোঝা যায় তুর্বসুরা যুদ্ধবীরের পোশাকে এসেছিলেন পাঞ্চালে অপিচ তুর্বসু বংশীয়দের সঙ্গে পাঞ্চাল বা কৃবির যোগ বহু পূরাতন। শতপথব্রাহ্মণের এই প্রবচনের নিরিখে পাঞ্চাল দেশে যদি বহু পূর্বেই তুর্বসুদের আগমন হয়ে থাকে, তবে আমাদের সেই প্রতিষ্ঠানপুরে পুরুর রাজ্য কল্পনা করাটাও অসম্ভব নয় এবং আরও অসম্ভব নয় এই জন্য যে, মহাভারতের দৃষ্টিতে এবং প্রবীণ ঐতিহাসিকদের মতেও কুরুদের দেশটা– Stretched from the Sarasvati to the Ganges. কাজেই ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র যযাতি-যদু-তুর্ককে যতই সরস্বতী নদীর তীরে আর্যদের পূর্বাবাসে টেনে নিয়ে যান, আমরা তাদের গঙ্গা-যমুনার তীরবাহী অঞ্চলে টেনে আনতে আগ্রহী।
.
৪১.
যতি এবং তার পাঁচ ছেলের কথা একটু বেশি করে বলতে হল এই কারণে যে, ভারতবর্ষের উত্তর-দক্ষিণ এবং পশ্চিমের একটা বড় জায়গা জুড়ে যে কটি নামী-দামি রাজবংশের নাম ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে, তাদের অনেকই এই যযাতির পুত্রদের নামে প্রসিদ্ধ। বস্তুত যযাতির পাঁচ পুত্রের অসংখ্য বংশধরই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যুদ্ধ করে ভারতবর্ষের এক বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছিলেন।
মহাভারতে যযাতি তার প্রিয় পুত্রদের যে কঠিন অভিশাপ দিয়েছিলেন, তাতে আপাত ভাবে মনে হতে পারে যেন পুরু ছাড়া যযাতির অন্য পুত্রেরা সকলেই ম্লেচ্ছ-যবনে পরিণত হয়েছিলেন। মহাভারতে এমনও বলা হয়েছে যে, যদু থেকেই বিখ্যাত যাদব বংশের উৎপত্তি এবং তুর্কষ্ট্র থেকে জন্ম হয়েছে যবনদের-যদোস্তু যাদবা জাতা স্তুৰ্বসোর্যর্বনাঃ স্মৃতা। যযাতির তৃতীয় পুত্র দ্রুম্যা থেকে ভোজবংশীয়রা জন্মেছেন আর অনু থেকে জন্মেছেন ম্লেচ্ছরা–অনোস্ত ম্লেচ্ছজাতয়ঃ।
আমাদের দৃষ্টিতে এই ম্লেচ্ছ-যবন ইত্যাদি শব্দের ওপর খুব বেশি জোর দেবার কারণ নেই। যাতির অভিশাপের তাৎপর্য এইখানেই যে, তিনি পিতৃ-পরম্পরাগত রাজ্য জ্যেষ্ঠ পুত্রের হাতে তুলে দেননি, কিংবা অন্য তিন পুত্রকেও দেননি, সেটা দিয়েছেন কনিষ্ঠকে। কিন্তু যযাতি বিশিষ্ট রাজা ছিলেন, তার শাসন-ভুক্ত মূল রাজ্যটি ছাড়াও প্রান্তদেশীয় রাজ্যগুলিতে তার যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। যযাতি তার চার পুত্রকে ওই প্রান্তদেশেই ঠেলে দিয়েছিলেন। বায়ুপুরাণের মতো প্রাচীন পুরাণ এই মর্মেই মন্তব্য করেছে–যযাতি নিজের রাজ্যে পুরুকে বসিয়ে সেই রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে স্থাপন করেন তুর্বসুকে, দক্ষিণ-পশ্চিমে বসান যদুকে। পশ্চিম ও উত্তর ভাগে ক্রমান্বয়ে দ্রুৎ আর অনুকে রাজ্য দিয়ে যযাতি তার বিশাল রাজ্য পাঁচভাগে ভাগ করে দেন–ব্যভজৎ পঞ্চধা রাজা পুত্রেভ্যো নাহুষস্তদা। তর্কের খাতিরে মেনে নিতে পারি, হয়তো এই সব রাজ্য নির্বিঘ্নে যদু-তুর্কসুদের হাতে চলে আসেনি। তাদেরকে এই রাজ্য পেতে হয়েছিল সামান্য লড়াই করে। আরও একটা কথা, নিজের চেষ্টায় এবং তেজে যে সব জায়গায় এঁরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, সেইসব জায়গায় হয়তো আর্যেতর জাতির বসতি ছিল। পুরাণের কথক ঠাকুর তাই নির্দ্বিধায় বলে দিলেন তুর ছেলেরা সব যবন আর অনুর ছেলেরা ম্লেচ্ছ।
