সমস্ত ঘটনা থেকে রমেশচন্দ্রর সিদ্ধান্ত হল যে, যযাতির মতো পুরনো আর্যগোষ্ঠীর রাজারা থাকতেন পাঞ্জাব অঞ্চলেই এবং পূরুর রাজধানীও সেখানেই ছিল। বেশ বোঝা যায়– রমেশচন্দ্র বেদের মধ্যে যযাতি এবং তার ছেলেদের উল্লেখ দেখেই সরস্বতী নদীর তীর ছেড়ে আর এগোতে পারেননি। সরস্বতী এবং দৃষদ্বতীর মধ্যবর্তী অঞ্চলটাই যেহেতু ঋগবৈদিক আর্যদের পূর্বাবাস বলে চিহ্নিত, এবং ঋগবেদেই যেহেতু যযাতি, যদু তুর্বদের উল্লেখ আছে, অতএব প্রতিষ্ঠান নয়, পাঞ্জাবই যযাতি-পুরুদের ভদ্রাসন– এই হল রমেশচন্দ্রের সিদ্ধান্ত।
কথাটার যৌক্তিকতা যথেষ্টই আছে এবং পরবর্তী কালে ভাষাতত্ত্বের নিরিখেও এই যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতেও অসুবিধে হয় না। এমন হতেই পারে যে, জনমেজয়ের পূর্বপুরুষ কুরু-পাঞ্চালরা যেহেতু প্রতিষ্ঠানপুরে এসে বাসা বেঁধেছিলেন, তাই মহাভারতের কবি প্রতিষ্ঠানপুরকেই নহুষ-যযাতি-পুরুদের আদি নিবাস বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে যে, ঋগবেদে যে যদু, তুর্বসু অথবা দ্রুহ্যু-অনুদের পাওয়া যাচ্ছে তারা সকলেই ছিলেন প্রায় যাযাবর আর্যজাতির এক-একটি গোষ্ঠী। প্রধানত যযাতির রাজ্যশাসনের। পরেই এরা নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন।
বেদের মধ্যে সুদাস রাজার সঙ্গে বিখ্যাত দশ জন রাজার যুদ্ধ হয়েছিল। বিখ্যাত যুদ্ধ। ঐতিহাসিক যুদ্ধ, যার সত্যতা অস্বীকার করা কঠিন। এই যুদ্ধ দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ বলে পরিচিত। সুদাস ছিলেন পিজবনের পুত্র। আর দশজন রাজার মধ্যে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন হলেন যযাতির পাঁচ পুত্ৰ-পুরু, যদু, তুর্বসু, দ্রুহু্য এবং অনু। এদের সবাইকে এক সঙ্গে ভারতাঃ বলা হয়েছে অর্থাৎ ভরতবংশীয়দের গোষ্ঠী। মনে রাখতে হবে–এই ভরতগোষ্ঠীর সঙ্গে মহাভারতে বর্ণিত ভরতবংশীয়দের পার্থক্য আছে। পণ্ডিতেরা মনে করেন বিশ্বামিত্র আগে ছিলেন সুদাস রাজার পুরোহিত। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক সুদাস এক সময় বিশ্বামিত্রকে ছেড়ে দিয়ে বশিষ্ঠকে পুরোহিত হিসেবে বরণ করেন। ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ বিশ্বামিত্র ভরতগোষ্ঠী অর্থাৎ দশ রাজার জোটে যোগ দেন।
ভারি সুন্দর বর্ণনা আছে ঋগবেদে। মন্ত্রগুলি শুনলেই বোঝা যায়–দশ রাজার দল অর্থাৎ পুরু, যদু, দ্রুরা অন্যান্য রাজাদের সঙ্গে শত বিপাশার বেলাভূমিতে উপনীত হয়েছেন, আর বিশ্বামিত্র তাদের জয়ের জন্য ইন্দ্রের কাছে স্তব করছেন। কী অসাধারণ উপমাতে যে বিশ্বামিত্র এই দুই নদীর কবিকল্প স্থাপন করেছেন, তা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। কবি বলছেন– জলপ্রবাহবতী বিপাশা আর শুতুদ্রী! তোমরা কেমন পাহাড়ের কোল থেকে জন্ম নিয়ে সাগর-সঙ্গমের অভিলাষে লাগামছাড়া ঘোটকীর মতে, বৎসলেহনাভিলাষিণী গাভীর মতো ছুটে চলেছ- প্র পর্বতানামুশতী উপস্থাদশ্বে ইব বিষিতে হাসমানে।
অনেক মধুর বর্ণনার পর বিশ্বামিত্রের বর্ণনার উচ্ছ্বাস নেমে এসেছে–আমি দূর থেকে রথ-ঘোড়া সব নিয়ে এসেছি। আমার বোনের মতো দুই নদী আমার! তোমরা একটু নিচু হয়ে বও। তোমাদের স্রোতের জল যেন আমাদের রথের চাকার তলা দিয়ে যায়। আমরা যেন ঠিক পার হয়ে যেতে পারি নি যুনমধ্বং ভবতা সুপারা অধো অক্ষাঃ সিন্ধবঃ স্রোত্যাভিঃ। বিপাশা আর শুতুস্রী (শত) বললে শুনেছি গো শুনেছি। রথ-শকট নিয়ে দূর থেকে এসেছ তোমরা। তা বাবু আমরা নিচু হয়ে যাচ্ছি- মা যেমন তার বাচ্ছা শিশুটিকে দুধ খাওয়ানোর জন্য নিচু হয়, যুবতী যেমন প্রেমিককে আলিঙ্গন করার জন্য অবনত হয়, আমরাও তেমনি নিচু হয়ে যাচ্ছি–নি তে নংসৈ পীপ্যানেব যোবা মর্যাষেব কন্যা শশচৈ তে।
বিশ্বামিত্র দেখলেন বিপাশা-শতর স্রোতোধারা ক্ষীণ হয়ে গেছে, আর তাতে পার হয়ে। যাচ্ছে ভরতগোষ্ঠীর রাজারা। বিশ্বামিত্র বললেন- যেহেতু ভরতগোষ্ঠীর রাজারা তোমাদের ওপর দিয়ে পার হবে, যেহেতু তারা ইন্দ্রের দ্বারা প্রেরিত হয়ে পার হবার অনুমতি পেয়েছে তোমাদের কাছে যদঙ্গ বা ভারতা সন্তরেয়ু- তাই তোমরা দুই নদীই আমার স্তবের যোগ্য। ভরতবংশীয়রা যখন নদী পার হয়ে গেলেন, তখন ব্রাহ্মণরা তাদের স্তুতি করলেন অতারিষুৰ্ভরতা গব্যবঃ সমভক্ত বিপ্রঃ সুমতিং নদীনাম।
শোনা যায়–দশরাজার এই যুদ্ধে সুদাস মোটেই হারেননি। বিশ্বামিত্রের নদীস্তুতিতে শত-বিপাশা পার হতে পারলেও সুদাসের কাছে ভরতগোষ্ঠীয়রা হেরে যান–The Bharatas, Matsyas, Anus, Druhyus must have crossed the Vipasa and the Satadru in order to attack the Tritus. (সুদাস তৃষ্টু বংশের ছেলে) After the two rivers were crossed, a battle took place. পণ্ডিতেরা মনে করেন দশ-রাজার এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। সুদাসের বিরুদ্ধে তারা জিততে পারেননি। সুদাসের জন্য মঙ্গল-সূক্ত রচনা করেন স্বয়ং ঋষি বশিষ্ঠ। বারবার তিনি ঘোষণা করেন, দশ রাজার জোটকে কীভাবে সমূলে বিনাশ করেছিলেন সুদাস, বশিষ্ঠ বলেছেন- ওঁরা পারেননি। দশ জন যজ্ঞহীন রাজা (বশিষ্ঠ তাদের যজ্ঞ করেননি, অতএব যজ্ঞহীন) একসঙ্গে জোট বেঁধেও সুদাস রাজার কিছুই তে পারল না– দশ রাজানঃ সমিতা অজ্যবঃ সুদাসমিন্দ্রাবরুশা ন যুযুধুঃ। অন্যান্য ঋক্-মন্দ্রে দুস্থ্য এবং অনুর পুত্র এবং সেনারা সুদাসের হাতে কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে শায়িত হয়েছিলেন সে বর্ণনাও বশিষ্ঠের জবানিতে পাওয়া যায় নি গব্যবো’নবো বশ্চ যষ্ঠিঃ শতাঃ সুষুপুঃ ষট্ সহস্রাঃ।
