বলতে পারেন–এও এক ধরনের ইলেকশন’। ব্রাহ্মণ এবং অভিজাত সম্প্রদায় রাজা-নির্বাচনের ব্যাপারে যত বড় ভূমিকাই পালন করুন, তাঁদের কথা এবং বাদ-প্রতিবাদের থেকেও বড় হয়ে উঠল পৌরজন, জানপদ-জনের সমর্থন। পরবর্তী কালের বংশ-পরম্পরায় জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র এবং কনিষ্ঠ পাণ্ডুর রাজ্যপ্রাপ্তি নিয়ে যে গণ্ডগোলের সৃষ্টি হবে, সেখানে প্রামাণিকতা বা নজির হিসেবে খেয়াল রাখতে হবে এই ঘটনাটি। আরও খেয়াল রাখতে হবে যে, চন্দ্রবংশের পরম্পরায় রাজা নির্বাচন শুধুমাত্র সমাজমুখ্যদের তর্জনী সংকেতে অনুষ্ঠিত হত না, দরকার পড়লে সাধারণ মানুষও সেখানে উপযুক্ত ভূমিকা নিতেন নীতি-যুক্তির পথে থেকেই।
রাজা হিসেবে পুরুর নির্বাচনের পর পরই মহারাজ যযাতি মুনিব্রত ধারণ করে বনে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন–দত্তা চ পুরবে রাজ্যং বনবাসায় দীক্ষিতঃ। রাজধানী ছেড়ে ব্রাহ্মণ-সজ্জনের সঙ্গে যযাতি বনে প্রস্থান করবার সঙ্গে সঙ্গেই আমরাও কিন্তু এক মহান সঙ্কটের মধ্যে পড়ে গেলাম। একদিকে আছে এক ধরনের তাত্ত্বিক সঙ্কট, যা আমাদের পাঠকদের ধৈর্য ক্লিষ্ট করবে; অন্যদিকে আছে রাজনৈতিক সঙ্কট, যা আমাদের মহাভারত-পাঠের সহায় হবে। আমাদের তাত্বিক সঙ্কট মহারাজ যযাতিকে নিয়ে। যযাতি মুনিব্রত গ্রহণ করে তপস্যার বলে স্বর্গরাজ্য লাভ করেছিলেন। কিন্তু স্বর্গরাজ্যে প্রচুরতর ভোগ এবং তারপর বহুতর তত্ত্বজ্ঞানের পরেও কোনও এক সময় ইন্দ্রের সঙ্গে কথোপকথনকালে যযাতির কিছু অহঙ্কার প্রকাশ পায়। তিনি স্বর্গ থেকে পতিত হন। এই স্বর্গচ্যুতির পর যযাতির আবাস গড়ে ওঠে রাজর্ষি অষ্টকের সাধনভূমিতে। যযাতি এবং অষ্টকের মধ্যে ধর্ম-দর্শনের যে আলোচনা চলে, তার তাত্ত্বিক মূল্য অসামান্য। কিন্তু তবু আমরা তার মধ্যে যাচ্ছি না। কেননা তাতে মহাভারতকথার মূল পরম্পরা ব্যাহত হবে। আমরা বরং স্বর্গগত যযাতির সঙ্গে ইন্দ্রের যে কথোপকথন হয়েছিল, তার মধ্য থেকে একটি কি দুটি পংক্তি উদ্ধার করতে চাই। তাতেই আমাদের পূর্বকথিত রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল সূত্রগুলি পরিষ্কার হয়ে যাবার সম্ভাবনা।
পুরুর রাজ্যাভিষেক এবং যযাতির বনগমনের প্রসঙ্গ শেষ করেই মহাভারতের কথকঠাকুর বৈশম্পায়ন শ্রোতার আসনে বসা জনমেজয়কে বলেছিলেন–মহারাজ! মহারাজ পুরু থেকেই এই পৌরব-বংশ, যার শেষ অধস্তন পুরুষ হলেন আপনি–পুরো পৌরবো বংশো যত্র জাতোসি পার্থিব। আমাদের ধারণা রাজ্যশাসনের জন্য পুরু উত্তরাধিকার সূত্রে যে ভূখণ্ডটি পেয়েছিলেন তা হল সেই পূর্বতন ভূখণ্ড- যার নাম প্রতিষ্ঠানপুর। আগেই বলেছি প্রতিষ্ঠান হল সেই পৈঠান বা পিরান, যা ইলাহাবাদের কাছে গঙ্গা-যমুনার জল ধোয়া অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বর্গের ইন্দ্র যযাতিকে প্রশ্ন করেছিলেন- আপনি পুরুকে রাজ্য দিয়ে কী কী উপদেশ দিয়েছিলেন? উত্তর দেবার সময় যযাতি বলেছিলেন- আমি পুরুকে শেষ উপদেশ দেওয়ার সময় বলেছিলাম– পুরু! এই গঙ্গা এবং যমুনার মধ্যদেশে অবস্থিত সমস্ত ভূখণ্ডই তোমার–গঙ্গা-যমুনয়োর্মধ্যে কৃৎস্না’য়ং বিষয়স্তব। যযাতি আরও বলেছিলেন- আর তোমার ভাই-দাদারা হলেন তোমার রাজ্যের প্রান্তদেশের রাজা- ভ্রাতরোত্যাধিপাস্তব।
যাতি পুরু আরও যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন, তা যথার্থ হলেও এখানে তার অবতারণা করছি না। কারণ আপাতত আমরা এক রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে আছি। যযাতি যে ভূখণ্ডে রাজত্ব করছিলেন, পুরু সেই ভূখণ্ডই উত্তরাধিকারসূত্রে পান এবং যযাতির মতে সেখানে রাজা। হতে পারাটাই যথার্থ রাজা হতে পারা। নইলে যযাতি তার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে অভিশাপ দিয়েছিলেন–তুমি রাজা হতে পারবে না–অথচ দেখা যাবে তিনিও কোনও না কোনওভাবে রাজাই ছিলেন, যদিও কোনওভাবেই সেটা প্রতিষ্ঠানপুরের মূল ভূখণ্ডে নয়। যদু, তুর্ক, দ্রুহ্যু এবং অনু পুরুর রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন–যযাতির মতে সেটা ভারতবর্ষের প্রান্ত দেশ- ভ্রাতরো’ত্যাধিপাস্তব।
যদু, তুর্বসু, দ্রুহ্যু, কিংবা অনু কোথায় গিয়ে রাজত্ব স্থাপন করেছিলেন, তা হয়তো স্পষ্ট। করে বলা যাবে না; কিন্তু অস্পষ্ট হলেও তা বলার আগে আমরা ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের একটা প্রতিপাদ্য উল্লেখ করে নিতে চাই। রমেশচন্দ্র ইলাহাবাদের কাছের ওই ভূখণ্ডটিকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পরম্পরাগত আবাসভূমি বলে মানতে চাননি। তার ধারণা, চন্দ্রবংশের উত্তরপুরুষদের মধ্যে যারা অনেকেই অতি-পরবর্তী কালের, তারা এই জায়গাটায়। থাকতেন এবং পৌরাণিকেরাও অনেকে এই রাজবংশের সঙ্গে পরিচিত থাকার ফলে তারা। ইলাহাবাদের ওই অঞ্চলটিকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পূর্বতন আবাস বলে স্থির করেছেন। রমেশচন্দ্র মনে করেন, মহাভারতের যযাতির সঙ্গে একমাত্র সরস্বতী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলকেই সংশ্লিষ্ট বলে মেনে নেওয়া যায় এবং যযাতির প্রসঙ্গে সরস্বতী নদীর উল্লেখও মহাভারতে পাওয়া যাবে।
পুরু যেহেতু পৈতৃক রাজ্যই পেয়েছিলেন, অতএব তিনিও এই অঞ্চলেই রাজত্ব করতেন বলে ধরে নেওয়া যায়। রমেশচন্দ্রের এই ধারণার কারণ আছে। ঋগবেদের মধ্যে যযাতি এবং তার পিতা নহুষের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে এবং যযাতির চার ছেলে যদু, তুর্বসু, দ্রুহ্য, এবং অনু- এই চারজন রাজারও উল্লেখ ভালভাবে পাওয়া যাচ্ছে। পৈতৃক রাজ্য পুরুর হস্তগত হলে অন্যান্য ভাইরা যেহেতু প্রান্ত রাজগুলিতে চলে যান, তাতে যদুর স্থান হয় পশ্চিম দিকের প্রান্ত রাজ্যে। রমেশচন্দ্র মনে করেন- ঋগবেদে যদুকে যেহেতু সরযু নদীর তীরবর্তী অঞ্চল আক্রমণ করতে দেখা যাচ্ছে এবং যেহেতু সরযূ নদীর সঙ্গে কুভা, সিন্ধু, কুমু ইত্যাদি উত্তর পশ্চিমদেশীয় নদীর উল্লেখ আছে, অতএব যদু ছিলেন ওই অঞ্চলের রাজা।
