পুরুর এই স্বেচ্ছাকৃত উপভোগ নির্বাসনেই হয়তো জরা সংক্রমণের তাৎপর্য, যা যযাতি। সাময়িকভাবে পরিহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পৌরাণিক সংখ্যায় হাজার বছর অথবা অনেক সময় যখন কেটে গেল তখন যযাতির অন্তরে কষ্ট হল। পুরুকে ডেকে তিনি বললেন পুরু! তোমার কাছ থেকে যৌবন লাভ করে আমি যেমন ইচ্ছে তেমন ভোগ করেছি। সময়ও পেয়েছি অনেক, উৎসাহও কিছু কম ছিল না। কিন্তু শরীর-মনের অন্তঃস্থিত কামনা এমনই এক বস্তু, বাছা! যা কেবল বেড়েই চলে, কমে না। আগুনে ঘি দেওয়ার মতো মনের ইন্ধন জোগালেই কামনা বাড়ে-হবিধা কৃষ্ণবর্বে ভূয় এবাভিবর্ধতে। যতি এবার একটু আত্মস্থ হয়ে বললেন–আমি ভেবেছিলাম যথেষ্ট ভোগ করলে আমার আর কোনও ভোগতৃষ্ণা থাকবে না। কিন্তু দেখলাম সেটা মস্ত ভুল। এখনও আমার লালসার কোনও নিবৃত্তি নেই। আমি তাই ঠিক করেছি এবার বামপ্রস্থে গিয়ে পরম ঈশ্বরের উপাসনায় মনোনিবেশ করব। তুমি তোমার যৌবন গ্রহণ কর এবং এই রাজাও গ্রহণ কয়রাজদং গৃহাণ ত্বং… গৃহাশেদং স্বযৌবন।
যযাতি পুনরায় পলিতকেশ বৃদ্ধে পরিণত হলেন এবং কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে রাজ্যের রাজা হিসেবে অভিষেক করবেন বলে ঠিক করলেন। ঠিক এই সময়ে লক্ষ্য করে দেখুন-ব্রাহ্মণ সমাজের পক্ষ থেকে একটা প্রতিবাদ জানানো হল। তারা যযাতিকে বললেন–যদু আপনার পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র। শুধু তাই নয়, সে দেবযানীর পুত্র, স্বয়ং শুক্রাচার্যের নাতি। সেই যদুকে অতিক্রম করে আপনি কনিষ্ঠ পুরুকে রাজা করছেন, এটা কেমন করে সম্ভব-জ্যেষ্ঠং যদুমতিক্রম্য পুরোঃ রাজ্যং প্রযচ্ছসি?
আমি এর আগে তর্ক করে বলেছিলাম–শুক্রাচার্য যযাতিকে জরা-সংক্রমণের অনুমতি দিয়ে কোনওভাবে আশা করেছিলেন যে, যদু তার পিতার জরা গ্রহণ করতে স্বীকৃত হবেন এবং সেই সূত্রে রাজ্যের অধিকারও পাবেন। অন্যদিকে যযাতি এমনভাবেই কথাটা পেড়েছিলেন, যাতে সিদ্ধান্তটা যযাতিরই শর্তাধীন হয়ে গিয়েছিল। শুক্রাচার্যের হিসেব মেলেনি, কিন্তু তার বংশধারায় আসা দেবযানীর পুত্র যদু এবং তুর্বসু কেউই যখন রাজ্য পেলেন না, তখন ব্রাহ্মণরা খুব নৈর্ব্যক্তিক একটা ভাব দেখিয়ে প্রতিবাদ করলেন। অর্থাৎ তারা যেন শুধু দেবযানীর পুত্রদের। কথা বলছেন না। যদু, তুর্বসু, দ্রু, অনু–সবাই যখন এঁরা পুরুর জ্যেষ্ঠ, তবে কেন কনিষ্ঠ পুরু রাজা হবেন– এই কথাই যেন তারা বলছেন। কিন্তু আমরা জানি, বিশেষত ওই সামান্য কথাটির মধ্যেই সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে-কথং শুক্ৰস্য নারং দেবযান্যাঃ সুতং প্রভো-শুক্রাচার্যের নাতি এবং দেবযানীর পুত্র যদুকে অতিক্রম করে কেন আপনি পুরুকে রাজ্য দিচ্ছেন? এই কথাটা বলে ফেলার পরেই সাধারণ অন্বয়ে অন্যান্য বড় ভাইদের নাম এসেছে। কিন্তু প্রতিবাদটা রয়ে গেছে বহুবচনে-কেমন করে বড় ভাইদের টপকে একজন ছোট ভাই রাজ্য পায়–কথং জ্যেষ্ঠানতিক্রম্য কনীয়ান্ রাজ্যমহতি?
যযাতি বললেন–জ্যেষ্ঠ হলেই তাকে আমি রাজ্য দিতে পারি না। যদু আমার আদেশ-অনুরোধ পালন করেনি। যে পুত্র পিতার আদেশ পালন করে না, জ্যেষ্ঠ হলেও তাকে আমি রাজ্য দিতে পারি না–আমি কোনও একটি পুরাণে দেখেছি, যদিও এখন সেই পুরাণটির নাম মনে করতে পারছি না সেখানে যযাতি বলছেন- যে ছেলে বাপ-মায়ের কথাই শোনেনি সে লক্ষ লক্ষ প্রজার অনুরোধ শুনবে কী করে? যযাতি এইভাবে যদু, তুসু প্রমুখ। পুত্রের রাজ্যপ্রাপ্তির যুক্তি প্রত্যাখ্যান করলেন এবং পরিশেষে এ বিষয়ে স্বয়ং শুক্রাচার্যের পূর্বানুমতি এবং সম্মতির কথা জানিয়ে কনিষ্ঠ হলেও পুরুর রাজ্যপ্রাপ্তির কথা প্রতিস্থাপন করলেন– শুক্রেণ চ বরো দত্তঃ কাব্যেনোশনসা স্বয়ম্।
এখানে আরও একটা ঘটনা লক্ষণীয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র যদুর বিষয়ে যখন প্রতিবাদ এল যযাতির কাছে, তখন প্রতিবাদীদের সামাজিক অবস্থান উল্লেখ করা হচ্ছে মাত্র দুটি কথায়– ব্রাহ্মণপ্রমুখ বর্ণাঃ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ প্রভৃতি সমস্ত বর্ণের লোকেরাই যযাতির কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, যদিও ‘প্রমুখ’ শব্দটির দ্বারা প্রধানত ব্রাহ্মণদেরই বোঝায়, তাই আমরাও স্বতর্ক স্থাপনের জন্য তাই বুঝিয়েছি। এর পরে যযাতি যখন সবার সামনে নিজের যুক্তি বোঝাচ্ছেন, তখনই কিন্তু ওই সামান্য কথাটি ব্রাহ্মণ-প্রমুখ বর্ণাঃ যেন একটি বিশদাকার জন-সমুহের রূপ নিচ্ছে। যযাতি বলছেন-সবাই শুনুন, ব্রাহ্মণ প্রমুখ যত বর্ণ আছে সবাই মন দিয়ে শুনুন আমার কথা–ব্রাহ্মণপ্রমুখ বর্ণাঃ সর্বে শৃন্বন্তু মচঃ। এই যে ব্রাহ্মণপ্রমুখ বর্ণ থেকে–সবাই শুনুন এইখানে একটা জনসমর্থনের কামনা আছে অর্থাৎ শুধু ব্রাহ্মণের মতো বর্ণমুখ্যরাই নন, প্রার্থনাটা সবার কাছে, সাধারণ প্রজা জনগণের কাছে- যার শেষ পরিণতি যযাতির অনুনয়-বাক্যে–আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা পুরুকে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করুন–ভবতো’নুনয়ামেবং পূর্নংরাজ্যে ভিষিচ্যতাম্।
লক্ষ্য করুন, এই মুহূর্তে, মহাভারতের কবি আর কাউকে দিয়ে কথা বলাননি। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় প্রমুখ বর্ণ নয়, এবার কথা বলছেন প্রজারা প্রকৃতয় উচুঃ তাঁরা যযাতির কথা মেনে নিচ্ছেন। বাবা-মার কথা শুনছে এমন একটি প্রিয় পুত্রের কামনা তাদের নিজেদের ঘরেও রয়েছে। তারা বলছেন–হ্যাঁ হ্যাঁ এই পুরুকেই রাজ্য দেওয়া হোক, যে তোমার কথা শুনেছে– অর্থঃ পুরুরিদং রাজ্যং যঃ পুত্রঃ প্রিয়কৃত্তব। তাছাড়া মহামতি শুক্রাচার্য তো এই সম্মতি দিয়েই রেখেছেন, তারপরে আবার কথা কী? এই শেষ কথাটি ব্রাহ্মণপ্রমুখদের মুখ বন্ধ করার জন্যই। মহাভারতের কবি এবার আরও স্পষ্ট করে বললেন–যযাতিকে যারা পুরুর রাজ্যাভিষেকে সম্মতি দিলেন, তারা বর্ণশ্রেষ্ঠ কেউ নন, তারা সব পুরবাসী, জনপদবাসী সাধারণ মানুষ–পৌরজানদৈস্তুষ্টৈরিত্যুক্তো নাহুষস্তা।
