শুক্রাচার্যের অভিশাপে যযাতির শরীরে অকালে নেমে এল দুর্জয় জরা। অলৌকিক দৃষ্টিতে ব্রাহ্মণের অভিশাপে যযাতির বার্ধক্য ব্যাখ্যা করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। কিন্তু লৌকিক দৃষ্টিতে এই জরা-বস্তুটি যে কী–তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। আমরা অবশ্য এই ঘটনার মধ্যে সেই ব্রাহ্মণ-সমাজের অধিরোহণ দেখতে পাচ্ছি। পূর্বে পুরূরবার ক্ষেত্রে এবং নহুষের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ-সমাজ ক্ষত্রিয়ের অধিকার যেভাবে খর্ব করেছিলেন, হয়তো যযাতির ক্ষেত্রেও তাই হল। জরা বা বার্ধক্য রাজত্ব ছেড়ে যাবার প্রতীক। সেকালের রাজারা বৃদ্ধ বয়সে পুত্রকে রাজত্ব দিয়ে বানপ্রস্থে যেতেন। এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি আছে। এক্ষেত্রে যযাতিকে অকাল-বার্ধক্যের অভিশাপ দিয়ে অকালে রাজত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হল হয়তো। আমাদের ধারণা– একটি বৃদ্ধ লোকের জীবনে খাওয়া-দাওয়ার লঘুতা থেকে আরম্ভ করে ইন্দ্রিয় সংযমের যে স্বাভাবিক শাস্তি নেমে আসে সেই সমস্ত সংযম-নিয়মের বিধি-বাধন ‘আকালিকভাবেই যুবক যযাতির ওপর নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন শুক্রাচার্য। শর্মিষ্ঠার সঙ্গরঞ্জিত যযাতির জরার তাৎপর্য হয়তো এইখানেই। এর সঙ্গে ছিল রাজত্ব কেড়ে নেওয়ার বঞ্চনা।
যযাতির যৌবন ফিরে পাবার কথা অতিলৌকিক বিশ্বাসের মধ্যেই থাক। যৌবনের প্রতীক রাজত্বটুকুই যযাতি আরও বেশিদিন ভোগ করতে চেয়েছেন বিশ্বস্ত একটি পুত্রকে রাজ্যের আশ্বাস দিয়ে। জরা, বার্ধক্য–এসব অভিশাপের তাৎপর্য যাই হোক, যযাতি দেবযানীর ‘যৌবনটুকু নিজের স্বার্থ হিসেবে দেখিয়ে তার রাজত্ব রাখতে পেরেছিলেন আরও কিছুদিন এবং পরবর্তী রাজপরম্পরাও সৃষ্ট হয়েছে তারই অধীনে। ব্রাহ্মণরা শুক্রাচার্যের আজ্ঞাবাহী ছিলেন কি না জানি না, কিন্তু তাঁরা যে ব্রাহ্মণ শুক্রাচার্যের বংশধারায় আসা দেবযানীর প্রথম সন্তানটিকে রাজা হিসেবে চেয়েছিলেন, সে কথা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী আলোচনায়।
যযাতি রাজধানীতে ফিরে এসে তার প্রথম সন্তান যদুকে বললেন–শুক্রাচার্যের অভিশাপে আমার এই অবস্থা, চুল পেকে গেছে, শরীরের মাংস শিথিল হয়ে গেছে। আমার বার্ধক্য তুমি নাও, যৌবনসুখ অনুভব করি। হাজার বছর চলে গেলে আবার আমি তোমার জরা গ্রহণ করব, তুমি তখন যৌবন ফিরে পাবে, রাজা হবে। যদু বললেন-এখনই বার্ধক্য এলে ভালমন্দ খাওয়া-দাওয়া তো সব মাথায় উঠবে- জরায়াং বহববা দোষাঃ পানভোজনকারিতাঃ। শরীর ঝুলে যাবে, দাড়ি হবে সাদা, আমার জোয়ান বন্ধুরা এখন আমায় কী যা-তা সব বলবে বলতো-সহোপজীবিভিশ্চৈব পরিভূতঃ সযৌবনৈঃ। তুমি বাপু তোমার অন্য যেসব সুপুর ছেলে আছে, তাদের বলো তোমার জরা গ্রহণ করতে, আমি পারব না।
যযাতি জ্যেষ্ঠ পুত্রকে অভিশাপ দিলেন–তুমি আমার হৃদয় থেকে জন্মেও যখন আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করলে না, তখন জেনে রেখো, তোমার বংশে কেউ কোনওদিন রাজা হবে না–তদরাজ্যভাক্ তাত প্রজা তব ভবিষ্যতি। যযাতি দেবযানীর গর্ভজাত দ্বিতীয় পুত্র তুর্ককেও ওই একই কথা বললেন। উত্তরও এল একই রকম। যযাতি তাকে বংশলোপের অভিশাপের সঙ্গে অন্ত্যজ এবং ম্লেচ্ছদের রাজা হবার অভিশাপ দিলেন। শর্মিষ্ঠার প্রথম পুত্র দ্রুহ্যুকেও যযাতি জরা গ্রহণের অনুরোধ করলেন। তিনিও স্বীকৃত হলেন না। যযাতির অভিশাপ নেমে এল- যে দেশে হাতি-ঘোড়া-পালকির ব্যবহার নেই, শুধু ভেলা আর ডিঙি নৌকাই যে দেশের একমাত্র পরিবহন, সেই দেশে তুমি সন্তানদের সঙ্গে রাজা না হয়েই থাকবে। তোমার উপাধি হবে ‘ভোজ। চতুর্থ পুত্র অনু জরা নিতে অস্বীকার করায় তাকেও অভিশাপ শুনতে হল যযাতির কাছ থেকে।
এJ কনিষ্ঠ পুত্র পুরু অন্তত তাকে হতাশ করবেন না–মত্ত্বা পুরুমল ঘন–এই বিশ্বাসে যযাতি পুরুকে তার জরাগ্রহণের অনুরোধ জানালেন। সত্যিই যযাতির আশা সার্থক করে দিয়ে পুরু বললেন– আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব– যদাখ মাং মহারাজ তং করিষ্যামি তে বচঃ। আপনি আমার যৌবন গ্রহণ করুন, আমি আপনার বয়স, রূপ এবং পাপ- সবই গ্রহণ করছি। যযাতি পরম সুখী হয়ে তাকে বর দিলেন- তোমার রাজ্যে সমস্ত প্রজা তাদের অভীষ্ট লাভ করবে। আশীর্বাদের পর যযাতি শুক্রাচার্যকে স্মরণ করে আপন জরা কনিষ্ঠ পুত্র পুরুর মধ্যে সংক্রমিত করলেন।
পুরু বৃদ্ধ হলেন, যযাতি যুবক। আমরা বলি– যযাতি আরও কিছুদিন রাজত্ব করার সুযোগ পেলেন। বয়সোচিত ভোগ-উপভোগ– এসব তো দিন দিন বেড়েই চলল। এবং শুধু দেবযানীই নয়, স্বর্গের অপ্সরা বিশ্বচী থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য কিছু রমণীও এসে পড়লেন যযাতির ভোগের উপবৃত্তে। তবে এই যৌবনের সম্ভোগসর্বস্বতার মধ্যেও যযাতিকে আমরা রাজ্যশাসনে বড়ই তৎপর দেখতে পাচ্ছি। দেবতা থেকে দারিদ্রের সেবা, পিতৃযজ্ঞ থেকে অতিথিসেবা–এই সব জনতপণের বিষয় যদি সেই রাজশাসনের অন্তরঙ্গে থেকে থাকে তবে তার বহিরঙ্গে ছিল দস্যুদের নিগ্রহ এবং সামন্ত রাজাদের দমন তথা তুষ্টি। ভোগে এবং শাসনে যযাতির মর্যাদা দেবরাজ ইন্দ্রের মাহাত্ম স্পর্শ করল–যযাতিঃ পালয়ামাস সাক্ষাদিন্দ্র ইবাপর।
যযাতির এই চরম ভোগর মধ্যে একটা চরম কষ্টও ছিল- তৃপ্তঃ খিন্নস্ট পার্থিবঃ। কনিষ্ঠপুত্র পুরুকে তিনি রাজ্যের আশ্বাস দিয়ে রেখেছেন। যযাতির অকালবার্ধক্য মাথায় বহন করে যুবক বয়সী পুরু হয়তো রাজোচিত পান-ভোজনে বিরত ছিলেন, এবং এই কষ্ট তার জ্যেষ্ঠ পুত্র যদু স্বীকার করে নিতে চাননি। হয়তো বয়সসাচিত রমণীর সঙ্গসুখ যার অভাব ঘটবে বলে যযাতির দ্বিতীয় পুত্র তুর্বসু জরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, সেই কামভোগপ্রণাশিনী’ একটি অস্বাভাবিক অবস্থা পুরু হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে বরণ করেছিলেন পিতার জন্য। যযাতির তৃতীয় পুত্র দ্রুহ্যু বলেছিলেন–জরা গ্রহণ করলে হাতি-ঘোড়া-রথে চড়া দুষ্কর হয়ে পড়বে, দুষ্কর। হবে স্ত্রী সম্ভোগ, হয়তো এই যুবক বয়সেই পুরু স্বেচ্ছায় ভোগ করতেন না রাজোচিত পরিবহন বরারোহণ-হাতি, ঘোড়া, রথ অথবা স্ত্রী সম্ভোগন গজং ন রথং নাম্বং জীর্ণো ভুক্তো ন চ স্ক্রিয়ম্।
