যযাতি বললেন–তাহলে এমন হয় না মুনিবর। যে পুত্র আমাকে আমার যৌবন ফিরিয়ে দেবে, পুণ্যবান, কীর্তিমান আমার সেই পুত্রই ভবিষ্যতে লাভ করবে আমার রাজ্যের উত্তরাধিকার। আপনি অনুমতি দিন। শুক্রাচার্য স্বীকার করে নিলেন রাজার প্রার্থনা। বস্তুত রাজার এই প্রার্থনার মধ্যেই যযাতির রাজনৈতিক পরিশীলন লুকিয়ে ছিল। এতদিনে তিনি তার সব পুত্রকেই ভালভাবে চিনেছেন। তাদের ভাব-সাব, মতিগতি–সব কিছুর ব্যাপারেই তার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। দেবযানীর স্বার্থ চিন্তা করে শুক্রাচার্য তার জামাতাকে জরা-সংক্রমণের অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু রাজা আপন যৌবন ফিরে পাবার উপকার যে পুত্রের কাছে পাবেন, তইে রাজ্যের উত্তরাধিকার দিয়ে প্রত্যুপকার করতে চান রাজা। এখন পরে যদি প্রশ্ন আসে–তুমি দেবযানীর পুত্রদের কাউকে রাজ্য দাওনি কেন? যযাতি সেই প্রশ্নের মীমাংসার ভার নিজের হাতেই রেখে দিলেন। যে তার জরা গ্রহণে সম্মত হবে, রাজা তাকেই রাজ্য দেবেন। শুক্রাচার্যের সম্মতি সেখানে আগে থেকেই জানা রইল।
যযাতি শুক্রাচার্যের কাছে বিদায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানপুরের রাজধানীতে ফিরে এলেন অকাল-বার্ধক্য নিয়ে। স্বামীর ওপর রাগে দেবানী যযাতির যে ক্ষতিটুকু করলেন, তাতে যে তার নিজেরই বেশি ক্ষতি হল–সেই চেতনা তার ছিল না। দেবযানী ফিরলেন এক পককেশ শিথিলচর্ম বৃদ্ধ যযাতির সঙ্গে। বৃষপর্বার রাজোদ্যানের কূপগর্ত থেকে যে রমণীকে তিনি উদ্ধার করেছিলেন, সেই রমণী বাস্তবে অগ্নিপুঞ্জ ছাড়া কিছুই নয়। যযাতি পতঙ্গবৎ সেই আগুনে জ্বলে মরলেন। দেবযানী শুধু শর্মিষ্ঠাকে দাসী বানাননি, তিনি যযাতিকেও দাসে পরিণত করেছিলেন। দেবযানীকে বিবাহ করলে এই দাসত্ব যে আসবে–যযাতি সেই কথাই দেবযানীকে বারবার। বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন প্রথমে। ক্ষত্রিয় হয়ে ব্রাহ্মণকন্যাকে বিবাহ করলে, সেই ব্রাহ্মণকন্যার চির-স্ফীত ব্রাহ্মণ্যচেতনা যে তাকে পদে পদে জর্জরিত করবে, সে কথা যযাতি আগেই বুঝেছিলেন। কিন্তু এই কথোপকথনের মধ্যে শুক্রাচার্য এসে যাওয়ায় তিনি নিরুপায় হয়ে দেবযানীকে বহন করেছিলেন। অতি পরিচিত বিবাহ শব্দটা যে এমন গদ্যজাতীয় বহনে পরিণত হবে–এ কথা বোধ করি যযাতি বুঝেছিলেন। ভারি আশ্চর্য, দেবযানীর সঙ্গে যযাতির প্রথম বিবাহ প্রসঙ্গে যখন দেবযানী আর যযাতির উতোর-চাপান চলছে, তখন মহাভারতের কবিও ‘বি’ উপসর্গ বাদ দিয়ে শুধু বহন’ শব্দটাই বারবার প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ তিনিও বুঝেছেন–এটা যতখানি বিবাহ, তার চেয়ে বেশি বয়ে নিয়ে চলা।
যযাতি দেবযানীর চাপে বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলেন। শর্মিষ্ঠার সঙ্গে তিনিও যে পরিণত হয়েছিলেন দেবযানীর দাসে–একথার সত্যতা প্রতিপন্ন হয় শুক্রাচার্যের সঙ্গে যযাতির কথোপকথনে। শর্মিষ্ঠার সঙ্গে কেন তিনি মিলন সম্পূর্ণ করেছেন–এই কথা যযাতি যখন প্রাণপণে শুক্রাচার্যকে বোঝনোর চেষ্টা করেছেন, তখন শুক্রাচার্য যযাতিকে বলেছিলেন-তুমি কি আমাকে একবার জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলে না? তুমি কি জান না–তুমি আমার অধীন–নহং প্রত্যবেক্ষ্যস্তে মদধীনোসি পার্থিব। বিশাল ক্ষমতাশালী একটি মাত্র কন্যার পিতাদের আমরা একালেও দেখেছি। তাদের সকলের কথা বলছি না, কিন্তু সেই রকম অনেক পিতার মধ্যেই জামাতাকে গ্রাস করার যে প্রবৃত্তি থাকে, শুক্রাচার্যের মধ্যে সেই প্রবৃত্তি ছিল, অবশ্য তা ছিল দেবযানীর কারণেই। এই বিবাহের প্রাক্ বা প্রথম অবস্থায় দেবযানী বা শুক্রাচার্যের দিক থেকে যত স্তুতিবাক্য বা যত ভরসাই দেওয়া হোক, নিজের প্রখর রাজনৈতিক বুদ্ধিতে য্যাতি বুঝেছিলেন-তিনি কার্যত দাসে পরিণত হয়েছেন। এই দাসত্বের মুক্তি অন্যভাবে সম্ভব হয়নি, সেই মুক্তি ঘটেছে অন্যতরা এক দাসীর সঙ্গে গোপন মিলনে। যযাতির অন্তর থেকে হাহাকার বেরিয়ে এসেছে অশোকবনিকার অন্তরালে–আমি যত ভার জমিয়ে তুলেছি সকলি হয়েছে বোঝা।/এ বোঝ আমার নামাও বন্ধু, নামাও।
কিন্তু শুক্রাচার্য যত বড় ব্রাহ্মণই হোন, অথবা দেবযানী যত বড়ই ব্রাহ্মণকন্যা, তারা যাতির রাজনৈতিক বুদ্ধির কাছে হার মেনেছেন। যযাতি সেই প্রথম থেকেই বুঝেছেন যে তিনি এক অভিশাপ-প্রবণ ব্রাহ্মণ-ঋষির কন্যাকে বিবাহ করে দাসে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু সেই দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবার জন্য একদিকে যেমন তিনি শর্মিষ্ঠার সঙ্গে মিলিত হয়ে অন্তরের মুক্তি খুঁজেছেন, যদিও আমাদের মনে হয়–এ মিলন একান্তই ইচ্ছাকৃত, তেমনই অন্যদিকে শুক্রাচার্যের কথার পৃষ্ঠে অনুকূল কথা বলেই তিনি নিজের বংশধরকেও মুক্ত করেছেন শুক্রাচার্য এবং দেবযানীর ব্রাহ্মণ্যের কবল থেকে। নিজের অভিজ্ঞতায় যযাতি তার সন্তানদের নাড়িনক্ষত্র জানতেন। ফলে কে তার জরাগ্রহণে সম্মত হবেন–সে কথা তার পূর্বাহ্নেই জানা ছিল। কিন্তু শুক্রাচার্য এবং দেবযানীর সামনে–সাধারণ এবং নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেবযানীর পুত্রদেরও (জরা-গ্রহণের পরিবর্ত উপকার হিসাবে) রাজ্যপ্রাপ্তির সম্ভাবনা জিইয়ে রেখে এবং তাতে পূর্বাহ্নেই শুক্রাচার্যের অনুমতি গ্রহণ করে রেখে যযাতি তার সারা জীবনের রক্তচাপ থেকে উদ্ধার পেলেন, অপিচ রাজনৈতিকভাবে শুক্রাচার্য এবং দেবযানীকে হারিয়েও দিলেন।
০৪০. শুক্রাচার্যের অভিশাপ
৪০.
