কথাটা বলেই দেবযানী সেখান থেকে উঠে পড়লেন। দেবযানীর সুন্দর মুখমণ্ডল এক লহমায় যেন কালি হয়ে গেল। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুর ধারা। তিনি শুক্রাচার্যের বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বেগতিক দেখে উদ্বিগ্ন ভয়াকুল রাজা দেবযানীকে বোঝাতে বোঝতে তার পিছন পিছন চললেন। কিন্তু দেবযানী রাজার মধুর সান্ত্বনাবাক্যে একটুও বিগলিত হলেন না, ফিরেও এলেন না।
দেবযানী আগে এবং যযাতি পরে এসে উপস্থিত হলেন শুক্রাচার্যের সামনে। প্রণাম, অভিবাদন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবযানী নালিশ জানালেন পিতার কাছে–আজ অধর্ম ধর্মকে দূরে ঠেলে ফেলেছে, পিতা! নীচ উঠে এসেছে ওপরে। বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠা আজ আমাকে অতিক্রম করেছে। দেবযানী শর্মিষ্ঠার কথা বেশি বললেন না। কারণ, দোষ তার নিজের ঘরের মধ্যে। তিনি যযাতিকে দেখিয়ে বললেন–ইনি শর্মিষ্ঠার গর্ভে তিনটি পুত্রের জন্ম দিয়েছেন, আর আমি দুর্ভাগা, আমার গর্ভে দুটি। লোকে মহারাজ যযাতিকে ধর্মজ্ঞ বলে সম্মান করে। আর এই তার ধর্মের নমুনা। আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন এই রাজা–অতিক্রান্তশ্চ মর্যাদাং কাব্যৈতৎ কথয়ামি তে।
দেবযানীর কথার সারমর্ম–তার গর্ভে দুটি পুত্র, আর শর্মিষ্ঠার গর্ভে তিনটি পুত্র। আর দ্বিতীয় অনুযোগ–দেবযানীর সম্মান অতিক্রম। মজা হল–এই অনুযোগ যদি তিনি রাজার কাছে সোজাসুজি করতেন, তবে রাজার পক্ষে দুটির জায়গায় পাঁচটি সন্তান দিতেও অসুবিধে ছিল না। কিন্তু গোলমালটা নিশ্চয়ই এখানে নয়, আরও গভীরে। দেবযানীর সেই সাহংকৃত বোধ আমাকে অতিক্রম করা চলবে না। মহাভারতের টীকাকার আসল কথাটা ধরে দেবযানীর মনের ভাবটুকু বলে দিয়েছেন। দেবযানীর ভাব-আমি হলাম গিয়ে ব্রাহ্মণ ঋষি শুক্রাচার্যের মেয়ে। সেই বামুনের মেয়েকে অতিক্রম করে অসুরের মেয়ে শর্মিষ্ঠার ওপর এতটাই রাজার দরদ যে তার গর্ভে তৃতীয় একটি পুত্রের জনক হতেও তার বাধেনি ব্রাহ্মণদুহিতুঃ প্রাধান্যে কর্তব্যে অসুরদুহিতুঃ প্রাধান্যকরণা-মর্যাদামতিক্রান্ত। অর্থাৎ দেবযানীর শর্মিষ্ঠার সঙ্গে সমতাও নয়, তার চেয়ে অধিক প্রাধান্য চাই।
অসুরদুহিতা শর্মিষ্ঠার ওপর শুধু দরদ কেন, ভালবাসাও যে রাজার বেশি ছিল, সেটা বলাই বাহুল্য। দিনের পর দিন দেবযানীর সম্মান এবং মর্যাদা সামলাতে সামলাতে রাজা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। মহারাজ যযাতি যতই রাজার আধিপত্যে থাকুন, প্রথম থেকেই তিনি এই উচ্চবর্ণের ঋষিকন্যাটিকে ঘরে আনতে কুণ্ঠিত ছিলেন। তাও যদি বা দেবযানীর সাময়িক চাটুবাক্যে ভুলে তিনি বিবাহে সম্মত হয়েছিলেন, কিন্তু রাজার ঘরে এসে ইস্তক দেবযানী কখনই ভুলতে পারেননি যে, তিনি ব্রাহ্মণ শুক্রাচার্যের মেয়ে। দিন-রাত এই ব্রাহ্মণ্যের মূল্য দিতে দিতে মহারাজ যযাতি রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন অশোকবনের প্রান্তে, শর্মিষ্ঠার কাছে।
প্রথম দর্শনেই যাকে ভাল লেগেছিল, সেই শর্মিষ্ঠার কাছে তিনি মনের মুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। ফলত শর্মিষ্ঠার সঙ্গ তার কাছে দিন দিন কাম্য থেকে কাম্যতর হচ্ছিল। একাদিক্রমে তিনটি পুত্রের জন্ম শর্মিষ্ঠার সঙ্গে রাজার অধিক ঘনিষ্ঠতাই প্রমাণ করে। ভালবাসা তো আর বংশ-কুল মনে হয় না, আর তাই অসুরকন্যার সম্ভ্রমে, লালনে শুশ্রূষায় যযাতির ভালবাসা পুষ্টিলাভ করেছিল। এই ভালবাসার কথা মহাভারতের কবি অতি স্পষ্ট করে স্বকণ্ঠে না বললেও পরবর্তী কালের মহাকবিদের তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি। কালিদাসের মতো ঋষি মহর্ষি কষের মুখ দিয়ে শকুন্তলার প্রতি আশীর্বাদজ্ঞাপন করেছেন যাতেরিব শর্মিষ্ঠা ভর্তুবহুমতা ভব–তুমি তোমার স্বামীর কাছে এতটাই প্রার্থনীয়া হও, যেমনটি শর্মিষ্ঠা ছিলেন যযাতির কাছে।
দেবযানীর কাছে এই ভালবাসার মূল্য নেই। তিনি তার ব্রাহ্মণ্যে উৎসিক্ত হৃদয় দিয়ে ব্রাহ্মণ পিতার কাছে যযাতির বিচার চাইলেন, মর্যাদা অতিক্রমের বিচার। বিচার পেলেন। শুক্রাচার্য কার্যাকার্য বিবেচনা না করে, কন্যার ওপর সমস্ত প্রশ্রয় ঢেলে দিয়ে যাতিকে অভিশাপ দিলেন–তুমি ধর্মজ্ঞ হয়েও যে অধর্ম করেছ, তার ফলে বার্ধক্যের চিহ্ন জরা বিস্তার লাভ। করবে তোমার সমস্ত শরীরে–তস্মাজ্জরা ত্বামচিরাদ্ধষয়িষ্যতি দুর্জয়া। যযাতি অনেক বোঝনোর চেষ্টা করলেন শুক্রাচার্যকে। শর্মিষ্ঠার ঋতুকাল, তার পুত্রকামনা, তার দাসীত্ব, এবং সর্বোপরি যাচকের প্রতি করুণার ধর্ম–সব এক এক করে বোঝানোর চেষ্টা করেও বিফল হলেন যযাতি। শুক্রাচার্যের মতে যযাতি ধর্মের নামে যেমন যুক্তি দেখাচ্ছেন, সে সব আসলে চালাকি ছাড়া কিছুই নয় এবং এই চালাকির সঙ্গে তুলনা হয় শুধু চুরি করার অপরাধের মিথ্যাচারস্য ধর্মেষু চৌর্যং ভবতি নাহুষ।
যযাতির কোনও যুক্তি শুক্রাচার্যের কাছে টিকল না। শুক্রের অভিশাপে তৎক্ষণাৎ জরা তার অকাল-বার্ধক্য বয়ে নিয়ে এল। যযাতি দেখলেন–নিজের নয়, নিজের স্বার্থ নয়, একমাত্র দেবযানীর স্বার্থের কথা বললেই শুক্রাচার্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি হতে পারে। যযাতি শুক্রাচার্যকে বললেন-মুনিবর। আপনার কন্যা দেবযানীর সঙ্গে সম্ভোগ সুখের বাসনা এখনও শেষ হয়নি আমার। আপনি অনুগ্রহ করুন, যাতে এই সাঙ্ঘাতিক জরা আমার শরীরে প্রকট না। হয়। শুক্রাচার্য বললেন–জরা তোমার শরীরে আসবেই। তবে একটাই সুযোগ আছে–তুমি তোমার জরা অন্যের শরীরে সংক্রমণ করতে পারবে।
