তারপর বহুদিন চলে গেছে। বহু দিন। শর্মিষ্ঠার কথা দেবযানীর খেয়ালও হয়নি। এর মধ্যে দেবযানীর আরও একটি পুত্রও হয়ে গেছে। তার বড় ছেলের নাম যদু, ছোট ছেলের নাম তুর্বসু। সেদিন দেবযানী ছেলেদের বাড়িতে রেখে বেড়াতে বেরিয়েছেন রাজার সঙ্গে। কর্মক্লান্ত রাজার আজ সময় হয়েছে। দেবযানীর ইচ্ছে হল রাজার সঙ্গে নিভৃতে বিস্তালাপ করবেন। ঘুরতে ঘুরতে সেই অশোকবনের পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন দেবযানী। জায়গাটা এমনিতে নির্জন; অশোকবনিকার প্রান্তদেশে শর্মিষ্ঠার বাড়ি। বনের পথ ধরে একটু এগোতেই দেবযানী দেখলেন–তিনটি অল্পবয়সী বালক পরস্পর খেলা করছে। তাদের চেহারা ভারি মিষ্টি এবং তারা যেভাবে খেলা করছে, তাতে একবারও মনে হচ্ছে না যে, তারা এই জায়গায় অন্য সময় খেলে না। রাজোদ্যানের এই প্রান্তে বালকদের এই একান্ত বিশ্বস্ত এবং অভ্যস্ত খেলাধুলো দেবযানীকে একটু অবাকই করে দিল।
দেবযানী পাশে দাঁড়ানো যযাতিকে বললেন–কী সুন্দর দেখতে ছেলেগুলো? দেখ দেখ, কেমন দেবতার মতো সুন্দর! আচ্ছা, এরা কার ছেলে? মুখগুলো তো দেখে মনে হচ্ছে যেন তোমার মুখ বসানো-বসা রূপতশ্চৈব সদৃশা মে মতাস্তব। দেবযানী যযাতিকে কোনও কথা বলতে দিলেন না, কথা শুনতেও চাইলেন না। তিনি সোজাসুজি খেলায় মেতে ওঠা ছেলেগুলিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন-বাছারা! তোমাদের বাবার নাম কী? কোন বংশেই বা তোমাদের জন্ম? ছেলেরা তর্জনী তুলে নিশূপে দাঁড়ানো যযাতির দিকে প্রথমে দেখিয়ে দিল। বলল–এই আমাদের বাবা। তারপর দুরে দাঁড়ানো শর্মিষ্ঠার দিকে অঙ্গুলিসঙ্কেত করে ছেলেরা। বলল–আর ওই হল আমাদের মা।
চরম অস্বস্তি নিয়ে যযাতি দাঁড়িয়ে রইলেন এবং সেই অস্বস্তি দ্বিগুণ করে দিয়ে শর্মিষ্ঠার ছেলেরা সবাই মিলে তাদের পিতা যযাতিকে জড়িয়ে ধরতে চাইল-রাজানমুপচক্রঃ। দেবযানীর সামনে শর্মিষ্ঠার ছেলেরা তাকে এতই বিপদে ফেলল এবং এই বিপদ আরও বাড়বে–এই আশঙ্কায় যযাতি আর শর্মিষ্ঠার ছেলেদের তেমন আমল দিলেন নানাভ্যনন্দত তা রাজা দেবান্যাস্তদন্তিকে। প্রত্যালিঙ্গন তো করলেনই না, উপরন্তু ভাব দেখালেন যেন এই ছেলেগুলি তার ছেলেই নয়। শর্মিষ্ঠার পুত্রেরা পিতার কাছে কখনও এই ব্যবহার পায়নি। পিতার আকস্মিক এই পরিবর্তন দেখে ছেলেরা কাঁদতে কাঁদতে শর্মিষ্ঠার কাছে গেল। ছেলেদের কান্না শুনে রাজারও মন খারাপ হল, একটু লজ্জাও হল–সব্ৰীড় ইব পার্থিবঃ।
দেবযানী ক্ষণিকের মধ্যেই বুঝে গেলেন–অনেক নাটক হয়ে গেছে অশোক বনের অন্তরালে। একটি নয়, দুটি নয় শর্মিষ্ঠা যযাতির ঔরসে অন্তত তিনটি পুত্র লাভ করেছেন। দেবযানী ক্রোধে অধীর হয়ে শর্মিষ্ঠাকে বললেন–তুই আমারই অধীনে দাসীর কাজ করে আমারই সর্বনাশ করছিস। আমাকে কি তোর ভয় নেই একটুও? অবশ্য অন্যায় করতে তোর ভয় হবে কী করে? তুই অসুরঘরের মেয়ে। এখনও তোর অসুরের স্বভাব যায়নি তমেবাসুরধর্মং ত্বমাস্থিতা ন বিভেষি মে।
গালাগালি খেয়েও শর্মিষ্ঠা খুব বেশি অপ্রস্তুত হলেন না। তিনি বুঝলেন- যে কোনও সময় দেবযানীর মুখোমুখি দাঁড়াতেই হত। কেননা, যদি শুধু ঋতুরক্ষার ধর্মেই ঘটনাটা শেষ হত, তাহলে শর্মিষ্ঠার প্রথম পুত্রের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই রাজসংসর্গের অবসান ঘটত। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস–রাজা শর্মিষ্ঠাকে ভালবাসতেন এবং শর্মিষ্ঠাও রাজাকে ভালবাসতেন ততোধিক। উপরন্তু দেবযানীর সদাজাগ্রত রক্তচক্ষুর অন্তরালে যযাতি এবং শর্মিষ্ঠার এই যে ‘চৌর্যমিলন’ আরম্ভ হয়েছিল, তার সুখ এবং আনন্দ যে দেবযানীর শুদ্ধ দাম্পত্যের দৈনন্দিনতার চেয়ে অনেক অনেক বেশি, তার প্রমাণ দিয়ে রেখেছেন আলঙ্কারিকেরা। অশোকবনিকার কুঞ্জভবনে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে ‘চৌর্যসুরত-ব্যাপার-লীলাবিধির ব্রত-নিয়ম পালন করে যযাতি ইতিমধ্যে তিনটি সন্তানের জনক হয়েছেন। দ্রুহ্য, অনু এবং কনিষ্ঠ পুরু–শর্মিষ্ঠার গর্ভে এই তিন পুত্র। তারা কেউই এখন আর খুব ছেলেমানুষও নয়, প্রায় যুবক। প্রিয় পুত্রদের জনক কে–এ কথা আসবেই এবং সে প্রশ্ন অবধারিতভাবে দেবযানীর কাছ থেকেই আসবে– এ কথা শর্মিষ্ঠা জানতেন বলেই আজ তিনি স্পষ্টতই দেবযানীর মুখোমুখি হতে চাইলেন।
শর্মিষ্ঠা বললেন–আমি যে সেই ‘ঋষির কথা বলেছিলাম, সেটা তো ঠিকই আছে, আমি তো তাকে ঋষিই মনে করি–যদুক্তং ঋষিরিত্যব তৎ সত্যং চারুহাসিনি। যযাতির সম্বন্ধে দেবযানীর পূর্বকল্পিত সেই ঋষি-সম্ভ্রম শর্মিষ্ঠা আবারও ফিরিয়ে দিলেন। শর্মিষ্ঠা আরও বললেন-তোমাকে আমার অত ভয় পাবার কীই বা আছে বল? আমি তো অন্যায় কিছু করিনি। ধর্ম থেকেও চ্যুত হইনি একটুও। কারণ, আমার দাসীত্বের নিরিখে এটাই আমার ধর্ম। আমার মালিকানীর স্বামী, আমারও স্বামী। তুমি আমার পূজনীয়, মাননীয় যাই হও, কিন্তু স্বামী হিসেবে রাজর্ষি যাতি যে আমার কাছে তোমার থেকেও পূজনীয়, সেটা কি তুমি জান না–ত্বত্তোপি মে পুজতমো রাজর্ষিঃ কিং ন বেথ তৎ?
দেবযানী বুঝলেন–শর্মিষ্ঠার সঙ্গে আর একটি কথাও বলে লাভ নেই। তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল যযাতির ওপর। আর রাগ হলে তার একটাই কথা–আর এক মুহূর্তও এখানে থাকব না, ঠিক যেমন পূর্বে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার সময়েও তিনি পিতা শুক্রাচার্যকে একই কথা বলেছিলেন–এই নগরে আর থাকব না। দেবযানী যযাতিকে বললেন-মহারাজ! আপনি যা করেছেন তা আমার ভীষণ ভীষণ অপছন্দ, আজ থেকে আর আমি এখানে থাকব না–রাজন্ নাদ্যেহ বৎস্যামি বিপ্রিয়ং মে কৃতং ত্বয়া।
