উতঙ্ক পৌষ্য-পত্নীর কাছে গেলেন। প্রথমে তার সঙ্গে সাক্ষাতে বিলম্ব হলেও পৌষ্য-রাজার ক্ষত্রিয়া পত্নী উতঙ্কের কথা শোনামাত্র তার কানের কুণ্ডল দুটি খুলে তার হাতে দিলেন। কিন্তু কুণ্ডল দুটি দেওয়ার সময় পৌষ্য-পত্নী উতঙ্ককে সাবধান করে দিয়ে বললেন, দেখুন এই দুল-দুটির ওপর নাগরাজ তক্ষকের খুব লোভ আছে। কাজেই মহর্ষি বেদের গৃহে ফিরে যাওয়ার সময় আপনি সাবধানে যাবেন। উতঙ্ক বললেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, দেবী! নাগরাজ তক্ষক আমার কিছুই করতে পারবে না।
নাগরাজ তক্ষকের কথায় আমি পরে আসছি। তার আগে পৌষ্য রাজার সঙ্গে উতরে কিছু উতোর-চাপান আছে, সেটা সেরে নিই। রাজমহিষীর কাছ থেকে কুণ্ডল দুটি নিয়ে উতঙ্ক পৌষ্য রাজার কাছে এসে বললেন, আমি খুব খুশি হয়েছি পৌষ্য, কুণ্ডল দুটি আমি পেয়েছি। পৌষ্য বললেন, এতকাল পরে এমন সৎপাত্র পেলাম, এমন গুণবান অতিথি পেলাম, তো একটু অন্ন-জল মুখে দিয়ে যাবেন না। একটু বসুন আপনি। রাজার আগ্রহ দেখে উতঙ্ক বললেন, ঠিক আছে বসছি। কিন্তু আপনার ঘরে খাবার-দাবার যা কিছু যে অবস্থায় আছে, তেমনই দেবেন। আমার তাড়া আছে খুব শীঘ্রমিচ্ছামি যথোপপন্ন অন্তমূপস্কৃতং ভবতা। পৌষ্য বললেন, ঠিক আছে, তাই হবে যেমনটি আপনি চান। এই কথা বলে তার ঘরে অন্ন-পান যেমনটি যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই নিয়ে এলেন উতঙ্কের কাছে।
রাজামশাই বলে কথা। তিনি তো আর রান্নাঘরের খবর রাখেন না। ব্রাহ্মণ স্নাতক ঘরে উপস্থিত, তিনি তাড়াহুড়ো করছেন, অতএব বিনা দ্বিধায় ভাত-ডাল যেমনটি পেয়েছেন, তেমনটিই এক অনুপযুক্ত দাসীকে দিয়ে উপস্থিত করেছেন উতঙ্কের সামনে। কিছুই ভাল করে দেখেননি, আর উতষ্ক দেখতে বলেনওনি। ভাত ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল একেবারে এবং সেই ভাতের মধ্যে একটি চুলও পড়ে ছিল। রাজা পৌষ্য একটুও খেয়াল করেননি সেদিকে।
খাবারের পাত্রখানি দেখেই উতঙ্কের খুব খারাপ লাগল। চুল দেখে হয়তো ঘেন্নাও। রাগ করে বললেন, তুমি আমাকে এই রকম অপবিত্র খাবার খেতে দিলে? তুমি অন্ধ হবে জেনো অশুচ্যম্নং দদাসি, তস্মাদন্ধো ভবিষ্যসি। আসলে উতঙ্ক ভেবেছেন– রাজা ভাতের ওপর চুলটি দেখেও অন্ধের মতো তাই খেতে দিয়েছেন, অতএব অন্ধ হওয়ার অভিশাপ। রাজা ভাবলেন আচ্ছা বিপদ। উতঙ্ক নিজের তাড়াহুড়ো আছে বলে ভাত-ডাল যেমন রাঁধা আছে, তেমনই চাইলেন। আর এখন তাকেই অভিশাপ দিচ্ছেন? পৌষ্য রাজাও কিছু কম নন। তিনিও মহর্ষি বেদের শিষ্য। সৎ জীবন যাপন করেন, আপন কর্তব্যে স্থির। উতঙ্কের অন্যায় অভিশাপ শুনে তিনিও প্রতিশাপ উচ্চারণ করলেন উতঙ্কের উদ্দেশে আমার নির্দোষ অন্ন-পানে তুমিও যখন অন্যায়ভাবে দোষারোপ করছ, তখন তুমিও নির্বংশ হবে।
.
০৪.
চার কত সাধারণ ঘটনা থেকে কত অসাধারণ ঘটনা ঘটে গেল। উতঙ্কের ভাবটা আমরা বুঝি। তুমি খেতে বলছ আগ্রহ করে, কিন্তু আমারও তাড়া আছে। কিন্তু তাড়া আছে বলেই তুই চুল-পড়া ঠাণ্ডা ভাত অতিথিকে খেতে দিবি? পেটে সয় না বলে নেমন্তন্ন-বাড়িতে যদি বলি– ঠিক আছে, একটা রসগোল্লা দিন, তাহলে সেই একটাই দিবি? পাত্র ভরে না দিলে যে অবহেলার মতো মনে হয়। তুই পাত্র সাজিয়ে দে, আমিও একটাই তুলে নেব। তোরও ভদ্রতা থাকল, আমারও ভদ্রতা থাকল। উতঙ্কেরও এই দশা। যেমনটি আছে দিতে বলেছেন বলে, তেমনটিই দিতে হবে! এত দূর পথ বেয়ে এসেছেন, খিদের মুখে একটু গরম ভাত, ঝরঝরে পরিষ্কার করে খেতে দিয়ে পৌষ্য যদি বলতেন, সামান্য দেরি হল, ঠাকুর! সজ্জন অতিথি ব্রাহ্মণকে ঠাণ্ডা ভাত দিই কী করে তাহলে কি উতঙ্ক মেনে নিতেন না?
আবার রাজার দিক থেকেও ব্যাপারটা দেখুন। ব্রাহ্মণ-অতিথি তাড়াতাড়ি ফিরে যাবেন, কারণ মহর্ষি বেদের পত্নী উতঙ্কের ফিরে আসার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন আগেই। উতঙ্কও যথেষ্ট তাড়াহুড়ো করছেন এবং যেমন ঘরে আছে তেমন খাবার প্রস্তাব তিনিই দিয়েছেন। যেখানে শীঘ্রই প্রধান গুরুত্বের বিষয়, সেখানে দেরি করলেও তো অভিশাপ জোটার কথা। কিন্তু রাজার কপাল এমনই অভিশাপ জুটেই গেল। কিন্তু তিনি যেহেতু উতঙ্ক যেমন বলেছেন, তেমনই করেছেন তাই জোরটা তার দিক থেকে বেশি। সেইজন্য প্রতিশাপ দিতে তার দেরি হয়নি। উতষ্কও সেটা বুঝেছেন; আর বুঝেছেন বলেই তিনি রাজার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, আপনি যে উলটে আমাকে শাপ দিলেন, এটা বোধহয় ঠিক নয়। আপনি যে খাবারটা আমাকে দিলেন, একটু ভাল করে দেখুন সেটা। রাজা পৌষ্য দেখলেন এবং বুঝলেন। যে দাসী এই অন্ন নিয়ে এসেছিল, সে রাজবাড়িতে কাজের অবসরে চুল খুলে বসে ছিল। রাজার তাড়া দেখে খোলা চুলেই সে অন্ন নিয়ে ছুটেছিল। মাথার ঝাঁকুনি অথবা হাওয়ায় চুল উড়ে এসে পড়েছিল উতঙ্কের খাবারে। রাজা অন্ন দেখেই নিজের অন্যায় স্বীকার করে উতঙ্ককে খুশি করার চেষ্টা করলেন। বললেন, না জেনে অন্যায় করেছি, আপনি অভিশাপ-মুক্ত করুন আমাকে। আমি যেন অন্ধ না হই।
উতঙ্ক বললেন, আমি তো মিথ্যা কথা বলি না। তবে আপনি একবার অন্ধ হয়েই আবার চোখ ফিরে পাবেন। তবে আপনিও একটু ভাবুন–আপনি যে আমায় নির্বংশ হওয়ার অভিশাপ দিলেন- সেটাও আর খাটবে না তো? রাজা বললেন, আপনার করুণার কথা শুনে আমার ভাল লাগল। কিন্তু আমি আমার শাপ ফিরিয়ে নিতে পারব না। সে ক্ষমতাই আমার নেই। কারণ আমার রাগ এখনও যায়নি। উতষ্ক ভাবলেন-এ তো বেশ মজা! তিনি শাপটি প্রত্যাহার করে নিলেন, আর রাজার অভিশাপটা রয়েই গেল? রাজা পৌষ্য বললেন, দেখুন ঠাকুর! আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ, দয়ার শরীর। আপনাদের মুখের কথার ধার খুব বেশি, কিন্তু হৃদয়টা ননীর মতো। একেবারে গলে যায়- নবনীতং হৃদয়ং ব্রাহ্মণস্য বাঁচি ক্ষুরো নিহিতস্তীক্ষ্ণধারঃ। আর আমরা হলাম ক্ষত্রিয় আপনাদের উলটো জাত। আমাদের মুখের কথা খুব মিষ্টি একেবারে ননী ঝরছে মুখে, গলে গলে যাচ্ছে–ক্ষত্রিয়স্য বাঙু-নবনীত। কিন্তু হৃদয়টা ক্ষুরের মতো ধারালো, তীক্ষ্ণ-কঠিন।
