ব্যাপারটা এই নিরিখে দেখলে বোঝা যাবে যে, সখীর স্বামী আর দাসীর স্বামী একই হতেন। দাসীরা যেহেতু নিজেরা বিবাহ করার অধিকার বা সুবিধা কোনওটাই পেতেন না, কাজেই দাসীদের যৌবন সফল করতে হত তাদের মালিকানীর স্বামীদের মাধ্যমেই। মালিকানীরাও এতে আপত্তির কিছু দেখতেন না, বরং স্বামীরা অতিরিক্ত ভোগপরায়ণ হলে,এই ব্যবস্থায় মালিকানীদের সুবিধেই হত। দেবযানীর ব্যাপারটা আলাদা। তিনি শর্মিষ্ঠার ওপর এতটাই রেগে ছিলেন যে কোনওভাবে শর্মিষ্ঠার সুখ হোক, এ তিনি চাইতেন না। উপরন্তু দাসীদের যেহেতু রাজভাৰ্যাত্ব স্বীকৃত সত্য ছিল, অতএব জেনেবুঝেই শুক্রাচার্য যযাতিকে শর্মিষ্ঠার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিলেন।
আজকে শর্মিষ্ঠা রাজার বিবাহিতা পত্নী এবং পত্নীর দাসীর মধ্যে সমতার যুক্তি এনে যযাতিকে একেবারে বিচলিত করে দিলেন। বিচলিত না বলে বিগলিতই বলা উচিত। কেননা যযাতি বললেন- যে প্রার্থনা করছে, তাকেই দান করব- এ হল আমার ব্রত। তুমি আমার সঙ্গ কামনা করছ, সেটা কীভাবে সম্ভব তুমিই বলো- তঞ্চ যাচসি মাং কামং হি কিং করণি তে।
.
৩৯.
মহারাজ যযাতি শর্মিষ্ঠার আশা পূরণ করার জন্য সেই মুহূর্তে মনে মনে দেবযানীকে অতিক্রম করলেন। অতিক্রম করার কারণও ছিল। যযাতির হৃদয় সামান্য বিগলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শর্মিষ্ঠা নিজের দাসীত্বের যন্ত্রণাটুকু বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলেন। শর্মিষ্ঠা বলেছিলেন মহারাজ। আপনি তো জানেন–দাস-দাসী, পুত্র এবং স্ত্রীলোক–এরা নিজের চেষ্টায় যে অর্থ উপার্জন করে, সেই অর্থ পর্যন্ত তার নিজের নয়, সে অর্থও তার মালিকের–য় এবাধনা রাজন্ ভার্যা দাসস্তথা সুতঃ।
শর্মিষ্ঠার হাহাকারে সেকালের স্ত্রীলোক এবং ক্রীতদাসের করুণ অবস্থাটা বোঝা যায়। বোঝ যায়, এই যুগে স্ত্রীলোক এবং ক্রীতদাসের কোনও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। পুত্র-সন্তানেরা যে অর্থ উপার্জন করত, সে অর্থেরও মালিক হতেন তার পিতা, ঠিক যেমন একটি স্ত্রীর উপার্জন চলে যেত তার স্বামীর হাতে এবং ক্রীতদাসের উপার্জন তার প্রভুর হাতে। শর্মিষ্ঠা বললেন–আমি তো দেবযানীর দাসী আর অন্যদিকে দেবযানী হলেন আপনার অধীনা। কাজেই মহারাজ! দেবযানী যেমন আপনার ভোগ্যা, তেমনই তার দাসীও আপনারই ভোগ্যাসা চাহঞ্চ ত্বয়া রাজন্ ভজনীয়াং ভজস্ব মাম।
শর্মিষ্ঠার কথা মহারাজ যযাতির কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হল। যযাতি শর্মিষ্ঠার সঙ্গে মিলিত হলেন। মনে মনে এই মিলন তার কাম্য ছিল। হয়তো যেদিন তিনি শর্মিষ্ঠাকে দেখেছিলেন, সেদিন থেকেই এই মিলন তার কাম্য ছিল। দেবযানী এবং শুক্রাচার্যের সাবধানবাণীতে এতদিন যে মিলন বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ছিল, আজ শর্মিষ্ঠার যুক্তিতে এবং যযাতির মনের অনুকূলতায় সেই মিলন বাঁধভাঙা নদীর মতো আছড়ে পড়ল অশোক-বনের উপান্ত-শয্যায়। মিলন সম্পূর্ণ হলে দুজনেই পরস্পরকে সানন্দে কৃতজ্ঞতা জানালেন, তারপর যে যেখানে ছিলেন চলে গেলেন সেইখানে–অনন্যান্যঞ্চাভিসম্পূজ্য জগ্মতুস্তৌ যথাগতম্।
শর্মিষ্ঠা চারুহাসিনী যযাতির ঔরসে প্রথম পুত্র লাভ করলেন যথাসময়ে এবং তৎক্ষণাৎ সে খবর দেবযানীর কাছে পৌঁছল। স্বামী-সুখে, পুত্ৰসুখে যার কথা প্রায় খেয়ালই ছিল না, দেব্যানী সেই শর্মিষ্ঠার ক্ষুদ্র গৃহে নেমে এলেন সশঙ্কিত চিত্তে, নিজের গরজে চলে এলেন; এলেনও বড় তাড়াহুড়ো করে। ঘরে ঢুকেই তার প্রশ্ন–এ সব কী শুনছি পাপের কথা, শরীর পুড়ছে বুঝি? কার সঙ্গে রঙ্গ করে এই পাপ জোটালি কোথা থেকে–কিমিদং বৃজিনং সুস্র কৃতং বৈ কামলুব্ধয়া।
শর্মিষ্ঠা বললেন কিসের পাপ! এক ধার্মিক বেদজ্ঞ ঋষি এসেছিলেন আমার কাছে। তিনি বর দিতে চাইলে আমি তার সঙ্গে মিলন প্রার্থনা করি। সেই ঋষি-ঔরসেই আমার এই পুত্রের জন্ম। এর মধ্যে কাম-চরিতার্থতারই বা কী আছে, অন্যায়ই বা কী আছে?
শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে তার কথাই ফিরিয়ে দিয়েছেন। দেবযানীই একসময় নিজের বিয়ের স্বার্থে মহারাজ যযাতিকে ঋষি অথবা ঋষিপুত্র প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন। পিতা বৃষপর্বার সেই উদ্যানবাটিকার মধ্যে দেবযানী এবং যযাতির সম্পূর্ণ কথোপকথনের সাক্ষী ছিলেন নির্বাক শর্মিষ্ঠা। আজকে সুযোগ পেয়ে সেই কথাটাই তিনি অন্যভাবে শুনিয়ে দিলেন দেবানীকে। কোনও মিথ্যা নেই এর মধ্যে–তুমি যাকে ঋষি ভেবেছ আমিও তাকে ঋষি ভেবেছি—এই বিচার।
শর্মিষ্ঠার কথা শুনে দেবযানী বললেন–তা বেশ, তা বেশ–শোভনং ভীরু যদ্যেব–যদি এইরকমই হয়ে থাকে, তাহলে কিছুই বলার নেই আমার। তবে কিনা ব্রাহ্মণ-ঋষির কথা বলছিস, তা তার নাম, গোত্র, বংশের কথা বল না একটু, যদি চিনতে পারি। শর্মিষ্ঠা সলজ্জে বললেন–তখন কি আর ওই সব কথা মনে থাকে নাকি? কী তার সূয্যিপানা চেহারা। কী তার তেজ। অমন তেজি পুরুষ দেখে নায়, গোত্র-ওসব সাধারণ কথা আর জিজ্ঞাসা করার শক্তি হল না আমার–তং দৃষ্টা মম সংগ্রইং শক্তি নাসীছুচিস্মিতে।
দেবযানী বললেন–যাগ যে যাক, সে ঠিক আছে বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ বলে কথা। তুই যদি একজন ব্রাহ্মণ ঋষির কাছ থেকে সন্তান লাভ করে থাকি, তাহলে জেনে রাখিস-কোনও রাগ নেই আমারন মনুর্বিদ্যতে মম।
অনেক দিন পর দেবযানীর সঙ্গে শর্মিষ্ঠার দেখা হল। রাগ নিয়ে এসেছিলেন দেবযানী, রাগও গলে জল হয়ে গেল। এতদিন পর দেখা, দুজনে পূর্বধিত্ব ফিরে পেলেন যেন। আলাপে, হাসিতে ঠাট্টায় বেশ খানিকক্ষণ কেটেও গেল–অনন্যান্যমেবকা তু সম্প্রহস্য চ তে মিথঃ। দেবযানী শর্মিষ্ঠার কথা সত্য মনে করেই চলে গেলেন, কথাটার দ্ব্যর্থচিন্তা তার মনেও এল না।
