হয়তো এই কল্যাণের মাহাত্ম থেকেই স্ত্রীলোকের দিক থেকে ঋতুকালমাত্রেই যে কোনও পুরুষের কাছে পুত্রলাভের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করাটা অস্বাভাবিক ছিল না। মহাভারত এবং পুরাণে এমন বহু উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেখানে রমণী ঋতুর পর্যায় সফল করার জন্য পুরুষের সঙ্গ কামনা করছে। ঋতুরক্ষার তাগিদটা যেহেতু প্রায় ধর্মীয় সংস্কারের মতো হয়ে গিয়েছিল, তাই একজন বুদ্ধিমতী রমণীর পক্ষে এই সময়টাই ছিল অভীষ্টতম পুরুষের সঙ্গে সঙ্গত হওয়ার প্রকৃষ্টতম উপায়। উপায় না বলে তাই এটাকে কৌশল বলাই ভাল, যদিও শর্মিষ্ঠার আমরণ দাসীত্বের নিরিখে শর্মিষ্ঠার দিক থেকে এটাকে আমরা সুযোগ নেওয়া বলব, কৌশল বলব না।
নির্জন স্থানে আপন অশোক-কুঞ্জে রাজাকে পেয়ে শর্মিষ্ঠা বললেন আমার রূপ নিয়ে আপনার কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়, রাজা! আমার আভিজাত্য এবং চরিত্রও আপনার অজানা নয়- রূপাভিজন-শীলৈ হিঁ ত্বং রাজন্ বে মাং সদা। আমার এখন ধর্মসঙ্কট উপস্থিত। আপনার কাছে আমার সানুনয় প্রার্থনা– আমি পুষ্পবতী, আপনি আমার ঋতুরক্ষা করুন।
যযাতির মনের মধ্য থেকে এতকালের জমে থাকা উচ্ছ্বাস এক মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে এল। যযাতি বললেন- তোমার সুন্দর স্বভাবের কথাও জানি, তোমার বংশ এবং মর্যাদার কথাও আমার যথেষ্ট জানা। আর রূপের কথা বলছ? তোমার গায়ে যদি একটা উঁচ বিধিয়ে ছুঁচের আগায় যদি এতটুকু সামান্য অংশ খুঁচিয়ে তুলে আনি, তবে সেই অংশটুকুকেও কোনওভাবে খারাপ বলা যাবে না, আলাদা করে তাকে সুন্দর বলতে হবে, তোমার রূপ এতটাই– রূপঞ্চ তেন পশ্যামি সূচ্যগ্রমপি নিন্দিত।
বোঝা যায়, শর্মিষ্ঠার রূপ এবং অভিজাত্য নিয়ে রাজার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই; রাজার চিন্তা অন্য জায়গায়। শর্মিষ্ঠার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি দেবযানীর কথা ভাবছেন। শর্মিষ্ঠার রূপ-গুণের প্রশংসা করতে করতেই রাজা বলে ফেললেন–সবই বুঝি, শর্মিষ্ঠা। কিন্তু দেবযানীকে বিয়ে করার সময় শুক্রাচার্য বলে দিয়েছিলেন এই বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠাকে তুমি যেন কখনও তোমার শয্যাসঙ্গিনী কোরো না। এখন সেই কথার কী করব?
শর্মিষ্ঠা রাজার মুখে নিজের রূপ-লাবণ্যের প্রশংসা শুনে বুঝলেন–রাজার অর্ধেক হৃদয় তিনি পেয়েই গেছেন। তার সামনে বড় বাধা ওই শুক্রাচার্যের একখানি কথা। শর্মিষ্ঠা ভরসা। পেয়ে শাস্ত্রবিধি ছেড়ে লোকাঁচারের বিধি আঁকড়ে ধরলেন। কারণ নীতিশাস্ত্রে বলে– শাস্ত্রবাক্যে কুশল হওয়া সত্ত্বেও যে লোকাঁচার জানে না, সে মূর্খ। শর্মিষ্ঠা বললেন– আপনি এখনও সেই কথা চিন্তা করছেন, মহারাজ! কেন, লোকে ঠাট্টা করার সময়ও তো মিথ্যা-কথা বলে, সে মিথ্যায় পাপ নেই। পছন্দসই রমণীর রূপ-গুণের প্রশংসা করেন পঞ্চমুখে, কতবার বলেন– ভালবাসি। তার মধ্যেও মিথ্যে কথা থাকে। বিয়ের সময় তো লাখ কথা না হলে বিয়ে হয় না, তার মধ্যেও মিথ্যে থাকে। তাছাড়া ধরুন, নিজের প্রাণ নিয়ে টানাটানি হল, অথবা বাড়িতে সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে, তখন যদি মিথ্যে বললে কাজ হয়, তো সবাই মিথ্যেই বলে। আসলে মহারাজ! পাঁচটা জায়গা। পাঁচ জায়গায় মিথ্যে বললে দোষ নেই কোনও পরিহাস, প্রেম, বিয়ে আর সর্বনাশ অথবা প্রাণসংশয় উপস্থিত হলে লোকে যে মিথ্যে কথা বলে তাতে কোনও পাপ লাগে না–পঞ্চানৃতান্যাহুরপাতকানি।
যযাতির গলার স্বর নিচু হল। বললেন–আমি রাজা বটে। রাজারা যা করবেন, প্রজাদের কাছে সেইটাই উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। আজকে আমি যদি এই কারণে মিথ্যার আশ্রয় নিই, তবে আমার প্রজারাও কাল থেকে মিথ্যার দোষ বুঝবে না। তাই বলছিলাম–মিথ্যে কথাটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না আমার পক্ষে।
শর্মিষ্ঠা এবার মোম যুক্তি দিলেন। রাজার পছন্দ এবং সংশয়ের অনেক ওপরে সেই যুক্তি। শর্মিষ্ঠা বললেন নিজের স্বামী এবং সখীর স্বামী– দুজনেই সমান। দুই সখীর বিয়েও সমান। অতএব আমার সখী যাঁকে স্বামিত্বে বরণ করেছে, আমিও তাকে স্বামী হিসেবে বরণ করতে পারি– সমং বিবাহমিত্যা সখ্যা মেসি বৃতঃ পতিঃ।
শর্মিষ্ঠার এই কথাটার মধ্যে একটু বুঝে নেবার ব্যাপার আছে সখীর স্বামীই আমার স্বামী এমন যুক্তি অর্থের সংশয় ঘটায়। এমনটি হলে যে কোনও রমণীর স্বামী, তার বন্ধু বা সখীর। স্বামী বলে পরিগণিত হতে পারতেন। আসল কথাটা অন্য জায়গায়। শর্মিষ্ঠা নিজেকে দেবযানীর দাসী বলে পরিচয় দিতে ভালবাসেন না। দেবযানী এবং শর্মিষ্ঠার মধ্যে যখন ভাব-ভালবাসা ছিল, তখন এরা পরস্পরের সখীই ছিলেন। এমনকি শর্মিষ্ঠার সঙ্গে দেবযানীর যখন চরম ঝগড়া হয়ে গেছে, তখনও কিন্তু রাজার কাছে পরিচয় দেবার সময় দেবযানী বলেছিলেন- এ আমার সখীও বটে, দাসীও বটে- ইয়ঞ্চ মে সখী দাসী। তাছাড়া দেবযানী যখন দুই হাজার দাসীর সঙ্গে সেই উদ্যানবাটিকায় ক্রীড়া-বিনোদন করছিলেন, তখন কিন্তু দাসীদের সখী বলেই অভিহিত করেছেন কবি– তাভিঃ সখীভিঃ সহিতা সর্বাভিমুদিতা ভূশম।
এই কথাগুলি থেকে পরিষ্কারভাবে শর্মিষ্ঠার যুক্তি ব্যাখ্যা করা যায়। সখী বলতে শর্মিষ্ঠা দাসীই বুঝিয়েছেন। তখনকার দিনে রাজারাজড়ার বিয়ের সময় বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে যে দাসী বা দাসীরা আসতেন, তারাও বিবাহিতা স্ত্রীর মতোই ভোগ্যা হতেন। পরবর্তী সময়ে আমরা দেবব- ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডুর মাতা অম্বিকা এবং অম্বালিকার দাসীর গর্ভে ব্যাসের ঔরসে বিদুরের জন্ম। আবার গান্ধারীর সঙ্গে যে দাসী এসেছিলেন গান্ধারের রাজবাড়ি থেকে তিনিও ধৃতরাষ্ট্রের ভোগ্যা ছিলেন। সেই দাসীর গর্ভে যুযুৎসুর জন্ম।
