অশোকণিকার অন্তৰ্গতে দাঁড়িয়ে শর্মিষ্ঠা কেবলই মনে মনে আকুলিত হন, বিকুলিত হন। দেবযানীর ওপর তার ঈর্ষা হয়। তার বিয়ে, দাম্পত্যসুখ, পুত্রলাভ- সবই তাকে কাতর করে তোল। দাসীত্বের শৃঙ্খলে তার শরীর-যৌবন বাঁধা পড়েছে। তিনি মনে মনে শুধু মুক্তির উপায় খোঁজেন। কী করব, কী করেই বা সেই বারে শৃঙ্খল অতিক্রম করে স্বামী-পুত্র লাভ করা যায় এই ভাবনা শর্মিষ্ঠার কষ্ট বাড়িয়ে তুলল চতুগুণ-কিং প্রাপ্তং কিং নু কর্তব্যং কিং বা কৃত্বা কৃতং ভবেৎ।
চিন্তা করতে করতে মনের মধ্যে যে আকুলতা দেখা দেয়, সেই আকুলতাই যৌবনবতীর মনে সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়। সিদ্ধান্ত তৈরি হয় মনের অনুকূলে। যৌবনবতী ভাবে- দাসী তো দাসী। সে তো একটা কথার জালে আটকা পড়েইছি। তাই বলে কি সব বৃথা। আমি কি মানুষ নই। কথা দিয়েছিলাম- দেবযানী যেখানে যাবে, সেখানেই যাব। তা বেশ তো, এসেছি কথা রেখেছি। কিন্তু এমন কথা তো বলিনি যে, বসন্তের ফুল ফুটলে দেখব না, বাতাস দিলে গায়ে মাখব না। আর এদিকে তার স্বামী-সুখে, সংসার-সুখে ছেলে পর্যন্ত হয়ে গেল, আর আমার স্বামী নেই, সংসার নেই, জীবন-যৌবন, রূপ সব বৃথা গেল- দেবযানী প্রজাতাসৌ বৃথাহং প্রাপ্তযৌবনা।
এইসব যুক্তি-তর্ক থেকেই শর্মিষ্ঠার মনে সিদ্ধান্তের জন্ম। তিনি ভাবলেন- দেবযানী যদি নিজের স্বামী নিজে ঠিক করতে পারে, তবে আমিও বা নয় কেন। সে যেমন রাজা যযাতিকে স্বামী হিসেবে বরণ করেছে, আমিও তাকেই স্বামী হিসেবে বরণ করব যথা তয়া বৃতা ভর্তা তথৈবাহং বৃণোমি তে। আমি যদি তার কাছে একটি পুত্র চাই তবে তিনি নিশ্চয় আমাকে বিফল করবেন না– ইতি মে নিশ্চিতা মতিঃ।
রাজার ব্যাপারে শর্মিষ্ঠা এত নিশ্চিত কেন, তা আমরা বুঝি। সেই উদ্যানবাটিকায় রাজা দেবযানীকে শুধু শর্মিষ্ঠার কথাই জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আর শুধু কথা কেন, শর্মিষ্ঠাকে দেখা অবধি মহারাজ যযাতির মুগ্ধতা দেবযানীরও চক্ষু এড়ায়নি। সন্দিহান ছিলেন বলেই দেবযানীর পিতা শুক্রাচার্য যযাতিকে অত সাবধান করে দিয়েছেন– আপনি এঁকে পুজো করতেও পারেন। মহারাজ! কিন্তু শয্যায় আহবান করবেন না যেন। তারপর এই যযাতির রাজপ্রাসাদে এসেও রাজা যেমন করে অশন-বসনের ব্যবস্থা করেছেন, তাতেও শর্মিষ্ঠার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, রাজা তাকে বিফল করবেন না নিশ্চয় ইতি মে নিশ্চিতা মতিঃ। শর্মিষ্ঠার এখন শুধু একটাই চিন্তা– রাজা যদি কখনও একবার ওই নির্জন অশোকঘনের দিকে আসেন, তবে শর্মিষ্ঠা তার মনের কথা বলবেন– অপীদানীং স ধর্মাত্মা ইয়ান্মে দর্শনং রহঃ।
মহাভারতের কবি যুবক-যুবতীর ওপর সরল বিশ্বাসে মন্তব্য করেছেন–তারপর রাজাও একদিন নিজের রাজভবন থেকে বেরিয়ে ঈশ্বরেচ্ছায় ওই অশোকবনের পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন তস্মিন কালে যদৃচ্ছয়া। সোজা কথায় বলি,- ঈশ্বরেচ্ছা যতই বলবতী হোক, রাজার নিজের ইচ্ছে কিছু কম ছিল না। আমাদের দৃঢ় অনুমান- ওই একদিন নয়, ঈশ্বরেচ্ছায় তিনি প্রায়ই আসতেন অশোকবনের বিজন প্রান্তে। মুগ্ধ হৃদয় জুড়াতে। কথা কিছুই হত না। কিন্তু বহু পূর্বে সেই উদ্যানবাটিকার মধ্যে দুই উদ্ভিগ্ন হৃদয় যুবক-যুবতীর মধ্যে যে নির্বাক দৃষ্টিবিনিময় হয়েছিল, তাতে অশোকবনিকার প্রান্তভূমিতে একজন অপেক্ষা করে বসে থাকলে অন্যজন সেখানে দর্শন দিতে বাধ্য। তাছাড়া দেখা দিতে এলে দেখাটাও হয়ে যায় একই সঙ্গে। ধারণা করতে পারি সেই নির্বাকৃ দৃষ্টি কথনের দিন এখনও হয়তো শেষ হয়নি, কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম। আজ শর্মিষ্ঠা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তিনি মনের কথা। বলবেন, অতএব ঈশ্বরেচ্ছাতেই হোক অথবা স্বেচ্ছায় মহারাজ যযাতি অশোকবনের উপাত্তে এসে উপস্থিত, যেখানে শর্মিষ্ঠা দুয়ার খুলে বসে আছেন আত্মদানের বাসনা নিয়ে।
যযাতি এসেছেন এবং একা এসেছেন। ঈশ্বরেচ্ছায় সঙ্গে পাত্রমিত্র কেউ নেই। রাজাকে দেখে শর্মিষ্ঠা ধীর-মধুর হেসে এগিয়ে এলেন রাজার কাছে হাত জোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে প্রত্যুগম্যাঞ্জলিং কৃত্বা শর্মিষ্ঠা চারুহাসিনী। শর্মিষ্ঠা বললেন- বলার মধ্যে ব্যঙ্গ ছিল- শর্মিষ্ঠা বললেন- ভগবান সোম বা ইন্দ্র, বিষ্ণু বা যমের গৃহে অবস্থানরতা একটি রমণীকে যেমন অন্য কোনও পুরুষ দেখতে পায় না, আপনার গৃহের সুরক্ষাও তেমনই- তব বা নাহু গৃহে কঃ স্বিয়ং দ্রষ্ট্রমহতি? ভাবটা এই– এমন নির্জন স্থানে আমাকে রেখেছেন, মহারাজ! যেখানে কোনও পুরুষের সুদৃষ্টি কি কুদৃষ্টি, কোনওটাই আমার ওপর পড়েনি। আর ঠিক সেই কারণেই একটি স্ত্রীলোকের সম্পূর্ণ শুদ্ধতা নিয়ে আপনার কাছে আমি যাচনা করতে পারি। যাচনা করতে পারি আমার স্ত্রীধর্ম রক্ষার জন্য।
শর্মিষ্ঠা পুষ্পবতী হয়েছেন। সেকালের দিনে পুষ্পবতী রমণী যথার্থ সময়ে পুত্রলাভের জন্য যে কোনও পুরুষের সঙ্গে সঙ্গত হতে পারত। এই নিয়ম ছিল প্রায় ধর্মীয়। বৈদিক যুগ থেকে আরম্ভ করে মহাভারত পুরাণের যুগ পর্যন্ত ভারতীয় রমণীর কাছে বহু পুত্রের জননী হওয়াটা ছিল প্রায় আদর্শের মতো হয়তো স্থানান্তর থেকে আর্য পুরুষদের সঙ্গে আসা স্ত্রীলোকের সংখ্যা নগণ্য ছিল এবং হয়তো যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে যেকোনও উপায়ে বীর পুত্র লাভ করাটা তাদের কাছে পরম ইঙ্গিত ছিল। বেদের মধ্যে আর্য-রমণীদের পুত্র-লাভের আকাঙ্ক্ষা বারবার শোনা গেছে। রমণীর কাছে বীরসূ, বীরমাতা বীরপ্রজা হওয়াটা যেমন গর্বের ছিল, তেমনই পুত্রজন্মের অর্থই ছিল পরম কল্যাণ য বৈ পুরুষস্য বিত্তং তদ্ ভদ্রং, গৃহা ভদ্রং প্রজা ভদ্র।
