বস্তুত কেউ কারও পাপ অপনোদন করতে পারে না। কিন্তু তথাকথিত অন্যায়ী মানুষের পাশে যদি কোনও বড় মানুষ দাঁড়িয়ে যান, তবে তার অন্যায় লঘু হয়ে যায়। তথাকথিত পাপী এইরকম কোনও পারস্পরিক অনুরাগযুক্ত যুবক-যুবতীর পাশে দাঁড়িয়ে কোনও শুক্রাচার্য যদি পিতার ভূমিকা পালন করেন তবে সমাজ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও কিছু করতে পারে। শুক্রাচার্য সেখানে অভয় দেন- অধর্ম যদি কিছু হয়, তবে তা থেকে তোমাকে বের করে নিয়ে আসার ভার আমার– অধমত্ত্বাং বিমুঞ্চামি শণু ত্বং বরমীলিত।
শুক্রাচার্যের অনুমতিতে এবং সাহসে যাতির হৃদয় কিছু শান্ত হল। কিন্তু এই সাহস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাচার্য আরও একটি নির্দেশ দিলেন। তিনি দীর্ঘদর্শী ঋষি। তিনি জানেনদেবযানী আপন ক্রোধে শর্মিষ্ঠাকে দাসী হিসেবে চেয়েছিলেন। তাও না হয় ঠিক ছিল। কিন্তু স্বামীর বাড়িতেও শর্মিষ্ঠাকে দাসী হিসেবে চরাতে নিয়ে যাবে- এই দম্ভ দেবযানীকে বিপন্ন করবে। শর্মিষ্ঠা দেবযানীর থেকে কম সুন্দরী নন, তার ওপরে রাজার মেয়ে। রাজবাড়ির মর্যাদা এবং বিদগ্ধতা তার শরীরে এবং মনে প্রধান আকর্ষণচিহ্নের মতো সতত আলম্বিত। ফলে রাজা যদি দেবযানীকে অতিক্রম করে শর্মিষ্ঠার প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন, সেটা কিছুই আশ্চর্যের হবে না। দীর্ঘদশী শুক্রাচার্য তাই যযাতিকে একটু সাবধান করে বললেন- এই যে এই মেয়েটিকে দেখছ, এ হল দানবরাজ বৃষপর্বার মেয়ে কুমারী শর্মিষ্ঠা ইয়ঞ্চাপি কুমারী তে শর্মিষ্ঠা বার্ষপর্বণী। শর্মিষ্ঠাকে তুমি পূজনীয়ভাবে প্রতিপালন করবে। কিন্তু কখনও যেন তাকে আপন শয্যায় স্থান দিয়ো না- সম্পূজ্যা সততং রাজন মা চৈনাং শয়নে বয়েঃ। কথাটা যযাতি শুনলেন, শর্মিষ্ঠাও শুনলেন।
সংস্কৃতে কথাটা যেভাবে আছে, সেটাকে সোজাসুজি বাংলা অনুবাদ না করলেও বোঝা যায় শুক্রাচার্য অত্যন্ত চাচাছোলা মানুষ। দেবযানীকে রাজা বিয়ে করলেও তার কাছে যে শর্মিষ্ঠার আকর্ষণ যে কোনও সময় বেশি হয়ে উঠতে পারে- এই বাস্তব সত্যটা শুক্রাচার্য বোঝেন বলেই বড্ড কাটাকাটা কতগুলি শব্দ ব্যবহার করেছেন। সে যাই হোক, শুক্রাচার্যের উপস্থিতিতে শাস্ত্রোক্ত নিয়মে মহারাজ যযাতির সঙ্গে শুক্রকন্যা দেবযানীর বিয়ে হয়ে গেল। সুন্দরী দেবযানীর সঙ্গে দুই হাজার দাসী আর বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠা প্রতিষ্ঠানপুরে মহারাজ যযাতির। রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন।
যযাতির রাজভবন দেবরাজ ইন্দ্রের বৈজয়ন্ত প্রাসাদের মতো মহেন্দ্রপুরসন্নিভ। বিশাল বিশাল মহালের পর রাজার অন্তঃপুর। যযাতি সেই অন্তঃপুরে দেবযানীকে যথাযোগ্য মর্যাদায় উপবেশন করালেন। সমস্যা হল-শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে। তাকে অন্তঃপুরে স্থান দিলে, তার মর্যাদা। বাড়ে বই কমে না। দেবযানী তাকে দাসীর মতো খাটালেও, অন্তঃপুরে থাকলে অন্তঃপুরচারিণী। রাজমহিষীদের সঙ্গে তার সমতা আসে। অতএব শর্মিষ্ঠাকে যদি রাজভবনের বাইরে কোথাও একটা ঘর-টর তুলে থাকতে দেওয়া হয়, তবে তার রাজমর্যাদা সামান্যও অবশিষ্ট থাকে না। এই পরিকল্পনাই দেবযানীর মনমত হল। রাজা তখন রাজ্যোদ্যানের প্রান্তভাগে যে অশোকবন আছে, সেই বনের কাছে একটা নতুন বাড়ি তৈরি করে শর্মিষ্ঠাকে থাকতে দিলেন–অশোকবণিকাভ্যাসে গৃহং কৃত্বা ন্যবেষয়ৎ।
শর্মিষ্ঠার অসুবিধে কিছু রইল না। তার জন্য বরাদ্দ এক হাজার দাসী তারই সেবায় নিযুক্ত হল। মহারাজ যযাতি অন্ন, বস্ত্র পানীয়ের ঢালাও ব্যবস্থা করে দিলেন শর্মিষ্ঠার জন্য। এই ব্যবস্থার মধ্যে শুধু কর্তব্যের শুষ্কতা ছিল না। কারণ, কবি টিপ্পনি কেটেছেন–সুসকৃতা– অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, পানীয়ের আয়োজনে আদর ছিল যথেষ্ট বাসোভিরশ্নপানৈশ্চ সংবিভজ্য সুসৎকৃতাম্। এই সাদর আয়োজন শুধু দেবযানীর দাসী বলেই শর্মিষ্ঠার লভ্য হল, নাকি সেই উদ্যানবাটিকার মধ্যে দাসীত্বের পিঞ্জরে বাঁধা কোনও এক রাজনন্দিনীর করুণ আনত দৃষ্টিই এর জন্য দায়ী তার বিচার করতে পারে শুধু সহৃদয়ের হৃদয়।
সব ব্যবস্থা শেষ হলে মহারাজ যযাতির সঙ্গে দেবযানীর দাম্পত্য বিহার আরম্ভ হল। রসে-রমণে অনেক কাল কেটে গেল এবং দেবযানী একটি পুত্রও লাভ করলেন। অশোকবনে নির্জনে থাকা শর্মিষ্ঠার কাছে খবর গেল- দেবযানীর পুত্র হয়েছে। তার মনটা ভারি খারাপ হল। তাকে যে এখন দিনরাত দেবযানীর ফাইফরমাশ খাটতে হচ্ছে, তাও নয়; দিনরাত যে তার পা টিপে দিতে হচ্ছে, তাও নয়। অথচ রাজ-অন্তঃপুরের বাইরে, পুষ্পবনের নির্জন অন্তরালে শর্মিষ্ঠার এই বন্দিদশা তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে। কোনও কাজ নেই, কর্ম নেই, কষ্ট নেই, সুখ নেই, কিছুই নেই। অথচ অশোকবনের প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর গোপন গতি আছে শরৎ-বসন্তের সঙ্গে আকাশ বাতাস সেই গতিময়তার ইঙ্গিত বয়ে আনে শর্মিষ্ঠার অন্তরে। আর আছে শর্মিষ্ঠার শরীর। বহিঃপ্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই শরীর এমনই এক সম্পূর্ণতায় উত্তীর্ণ হল যে, বসন্তের জাগরণে অশোক ফুল ফুটলে সে শরীর বলে–আমিও পুষ্পবতী; বসন্তের মৃদু-মন্দ হাওয়ায় সে শরীর আপনি আন্দোলিত হয়, পুষ্পের অন্তর্গত রেণুকণায় শিহরণ জাগে। শর্মিষ্ঠা সম্পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত হলেন– দদর্শ যৌবনং প্রাপ্তা ঋতুং সা চাচিস্তয়ৎ।
