শুক্রাচার্য সব বুঝলেন। আগেই বলেছি–তিনি মহাজ্ঞানী ঋষি। শর্মিষ্ঠার সঙ্গে বিবাদের সময়েও তিনি দেবযানীর দোষের কথা প্রথমে উল্লেখ করেছিলেন। পরে অবশ্য কন্যার প্রতি স্নেহের মোহগ্রস্ততায় তাঁর কথাই মেনে নেন। এখানেও দেখছি, দুর্গত অবস্থায় রাজার হস্তাবলম্বন-দানের ঘটনার মধ্যে দেবযানী যখন বিবাহের ধর্মীয় তাৎপর্য আবিষ্কার করলেন, তখন শুক্রাচার্য খুব কায়দা করে বললেন-দেখ বাছা! ধর্ম এক জিনিস, আর ভালবাসা আরেক জিনিস। অর্থাৎ এই ব্যক্তির প্রতি তোমার ভালবাসা জন্মেছে, বেশ কথা। সেটাই বলো। এখানে আবার ধর্মের প্রলেপ লাগাতে চাইছ কেন? তর্ক করলে বলা যায়–তুমি কুয়োর মধ্যে পড়ে ছিলে, রাজা তোমায় দয়া করে বাঁচিয়েছেন। এখানে বিপৎত্রাণই ধর্ম। কিন্তু সেই হাত ধরার ব্যাপারটাকে তুমি যদি এখন তোমার ঈঙ্গিত কাজে ব্যবহার করে রাজাকে ফাঁদে ফেল, সেটা মোটেই ধর্ম নয়। শুক্রাচার্য তাই খুব মিষ্টি করে দেবযানীর কথা উড়িয়ে দিয়ে বললেন–ধর্মের কথা আলাদা, প্রণয়ের কথা আলাদা, ও দুটোকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলো না, বাপু। তুমি তো আমার কাছে আগে কিছু বলোনি, আমার মতামতও চাওনি। তার আগেই তুমি রাজাকে বরণ করে বসে আছ–অন্যো ধর্মঃ প্রিয়নন্যা বৃত্তে নাইষঃ পতিঃ।
শুক্রাচার্য মহারাজ যযাতিকে ধর্মবিষয়ে অন্যতম প্রমণ বলে মনে করেন। পূর্বে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে দেবযানীর বিবাদের সময়ে তিনি দেবরাজ ইন্দ্র এবং অসুররাজ বৃষপর্বার সঙ্গে মর্ত্য রাজা যযাতিকেও সমান মূল্য দিয়েছিলেন। ফলে যযাতির সামনে তিনি দেবযানীর ধর্মধ্বজিতার মূল্য দিলেন না। ধর্মের বড়াইকে বাড়তে না দিয়ে তিনি বরং উলটে দেবযানীর পূর্ব তর্কযুক্তিতে জল ঢেলে দিলেন। দেবযানী তো মহারাজ যযাতিকে কোনও এক সুদূর ঋষিসম্বন্ধে একেবারে ঋষি অথবা ঋষিপুত্র বলে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। যেন কচের কথা কিছুই খাটল না, কচের অভিশাপ মিথ্যে করে দিয়ে তিনি যেন ঋষিপুত্রকেই বরণ করে ফেলেছেন-এমনই এক সাহংকৃত ভাব ছিল দেবযানীর।
কিন্তু শুক্রাচার্য বেশ কায়দা করে বললেন–তা বাপু! নিজে দেখে শুনে যযাতিকে তুমি স্বামীত্বে বরণ করেছ, বেশ করেছ। তোমার তো বাপু কোনও ঋষি অথবা ঋষিপুত্রের সঙ্গে বিয়েও হবে না–একথা তো কচ আগেই বলে দিয়েছে–কচশাপায়া পূর্বং নান্যভবিতুম অহতি। অর্থাৎ ঋষি, ঋষিপুত্রের বাহানা দেখিয়ে তুমি নিজেকে ভোলাতে পারো, কিন্তু আমাকে ভুলিও না। যাতি পরিষ্কার এক ক্ষত্রিয় রাজা। তুমি তাকেই স্বামী হিসেবে বরণ করেছ। এ যাত্রায় আর ঋষি অথবা কোনও ঋষিপুত্র তোমার স্বামী হিসেবে দেখা দেবেন না। সোজা কথা হল, তুমি পছন্দ করেছ, বিয়ে করো; কিন্তু ধর্ম, ঋষিপুত্র–ওইসব হেঁদো যুক্তি দিয়ে মহামতি শুক্রাচার্যকে যে কাবু করা যায় না, সেটা তিনি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন। তবে হ্যাঁ, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেবযানীর প্রতি স্নেহের যুক্তিটাও মেনে নিলেন। অর্থাৎ দেবযানীর প্রণয় যেমন ধর্মাধর্ম অতিক্রম করে উৎসারিত হয়েছে, তেমনই দেবানীর প্রতি শুক্রাচার্যের স্নেহও ধর্মাধর্ম অতিক্রম করে স্বতই উৎসারিত হল। সাগ্রহে তিনি যযাতিকে বললেন–আমার পরম স্নেহের পাত্রী এই আমার কন্যা দেবযানী। সে তোমাকে স্বামীরূপে বরণ করেছে; আমিও সাগ্রহে এঁকে তোমার হাতে সমর্পণ করলাম। তুমি তোমার মহিষী হিসেবে এঁকে গ্রহণ করো–গৃহাণেমাং ময়া দত্তাং মহিষীং নহুষাত্মজ।
.
৩৮.
ভার্গব শুক্র দেবযানীকে ক্ষত্রিয় যযাতির হাতে সমর্পণ করতে চাইলে যযাতি সসংকোচে বললেন আমার দিক থেকে কোনও অধর্মের আশঙ্কা নেই তো, মুনিবর? আমি যে এই জেনেশুনে বর্ণসংকর ঘটাচ্ছি, তাতে কি ভীষণ অন্যায় হয়ে যাবে না– অধর্মো ন শৃশেদেষ মহান্ মামিহ ভার্গব? শুক্রাচার্য অভয় দিয়ে বললেন–অধর্ম যদি ঘটেও তবে সে অধর্ম থেকে আমি তোমায় মুক্ত করব। শুক্রাচার্য জানতেন তার মেয়ে সমস্ত অহংকার সত্ত্বেও যদি কারও প্রতি অনুরাগিণী হয়ে থাকে, তবে তিনি এই রাজা যযাতি। দেবযানী যেমন, তাতে মর্ত্যভূমির এই রাজার থেকে ভাল পাত্র তার জুটবে না। তাই রাজাকে তিনি প্রশ্রয় দিয়ে বললেন- এই বিয়েতে বর্ণসংকর ঘটলেও তুমি বিষণ্ণ হয়ো না রাজা! আমি তোমার সমস্ত পাপ অপনোদন করব- অস্মিন্ বিবাহে মা গ্লাসীরহং পাপং নুদামি তে।
যদি বলেন কোন এক্তিয়ারে শুক্রাচার্য বললেন কথাটা। তার কি এত ক্ষমতা, তিনি শাস্ত্রযুক্তি উলটে দিতে পারেন? আমাদের তাহলে সেই পুরনো কথাটাই বলতে হয় শক্তিমান, মর্যাদাসম্পন্ন পুরুষ সব পারেন। তাদের জন্যই সমাজে নতুন ভাবনার আমদানি হয়। প্রাচীন শাস্ত্রযুক্তির এদো পুকুর থেকে সমাজ উঠে আসে নতুন আলোয়, নতুন সিন্ধুপারে। ভগবদ্গীতায় ভগবান নামে চিহ্নিত সেই পুরুষটি সাংঘাতিক একটা কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন–দেখ অর্জুন! বড় মানুষেরা যা করেন, সাধারণ লোকে তাই করে-য যদ আচরতি শ্রেষ্ঠত্তদেবেতরে জনাঃ। বড় মানুষ যদি কোনও নতুন কাজ করে ফরমান জারি করে বলেন–এইটাই প্রমাণ, তবে.লোকে সেটাই মেনে নেয়–স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ততে।
ভগবদ্গীতায় প্রসঙ্গ ছিল অন্য এবং সেখানে বড় মানুষেরা সমাজ এবং শাস্ত্র-বিগর্হিত কাজগুলি যাতে না করেন, তারই নির্দেশ আছে। আপাতদৃষ্টিতে কথাটা ঠিক, কারণ কথা সমাজ-সচল প্রথার বাইরে গিয়ে বড় মানুষেরা যা করবেন, সাধারণে তার অনুবর্তন করবেই। একই সঙ্গে এও ঠিক যে, বড় মানুষ বলেই, তারা সমাজের উর্ধ্বে উঠে বৈপ্লবিক পথ দেখাতে পারেন। তা না হলে আমাদের দেশে বেদের পর উপনিষদ আসত না, বুদ্ধ-মহাবীর আসতেন না, চৈতন্যদেব আসতেন না- রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দও আসতেন না। এই যে শুক্রাচার্য বললেন- দেবযানী তোমাকে ভালবেসে নিজের পছন্দে বরণ করে নিয়েছে, তুমিও এর সাহচর্যে অপার আনন্দ অনুভব করো- এই কথাটার মধ্যেই বড় মানুষের প্রশ্রয় আছে। ভাবটা এই, হোক বর্ণসংকরের অধর্ম, সে আমি বুঝব; তোমার পাপ অপনোদন করব আমি– অহং পাপং নুদামি তে।
