যযাতি নহুষের পুত্র। তিনি রাজা। কিন্তু দেবযানী তাকে ঋষি অথবা ঋষিপুত্র বলে প্রমাণ করে ছাড়বেন। আমরা বুঝি-দেবযানীর মনে ক্রিয়া করছে কচের সেই অভিশাপ–কোনও ঋষি বা ঋষিপুত্র তোমার পাণিগ্রহণ করবেন না। দেবযানী তাই যেন-তেন-প্রকারেণ যযাতিকে ঋষি অথবা ঋষিপুত্র বলেই প্রমাণ করতে চান। তার যুক্তিটা এইরকম–চন্দ্রবংশের প্রথম পুরুষ চন্দ্র মহর্ষি অত্রির পুত্র। আবার চন্দ্রপুত্র বুধ চন্দ্রের ঔরসজাত হলেও দেবগুরু ব্রাহ্মণ বৃহস্পতির সঙ্গেও তার পিতৃসম্বন্ধ আছে। বুধ ইলাকে বিবাহ করবার সময় ছল করে নিজেকে ব্রাহ্মণের পুত্র বলে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন-পিতা মে ব্রাহ্মণাধিপঃ–এবং তা দিয়েছিলেন বৃহস্পতির পুত্রত্ব তিনি অস্বীকার করেন না বলেই। এইভাবে মূল বংশলতিকা থেকে যদি আরম্ভ করা যায়, তবে মহারাজ যযাতিও একভাবে ঋষির বংশধরই বটে, এমনকি ঋষিপুত্রও বলা যায় টেনেটুনে।
কিন্তু দেবযানী যযাতির ঋষিত্ব কিংবা ঋষিপুত্রত্ব প্রমাণ করে যতই আপনাতে আপনি সন্তুষ্ট হোন, যযাতি টললেন না একটুও। তিনি চতুর্বর্ণের উত্তরোত্তর নিকৃষ্টতা দেখিয়ে নিজেকে বিবাহের অনুপযুক্ত বলে স্থাপন করলেন। দেবযানী এবার যযাতির প্রতি শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। তিনি বললেন–ওসব বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্মের কথা না হয় বুঝলাম, কিন্তু মশাই! পাণিধর্মের বেলায় কী হবে? কোনও কন্যার পাণিগ্রহণ করে তাকে আবার প্রত্যাখ্যান করার মতো অভদ্রতা এ পর্যন্ত কোনও পুরুষ মানুষ করেননি- পাণিধর্মো নাহয়ং ন পুঃভিঃ সেবিতঃ পুরা। তুমি যে একবার আমায় সেই হাত ধরে উঠিয়েছিলে কুয়ো থেকে, সেই তো পাণিগ্রহণ হয়ে গেছে। আর আমিও সেই কারণেই তোমাকে স্বামী হিসেবে বরণ করেছি। তুমিই বল–তোমার মতো একজন ঋষিপুত্র যদি কোনও ভদ্র ঘরের মেয়ের হস্ত স্পর্শ করে থাকে, তবে সেই রমণী কী করে আবার অন্য পুরুষের হাত ধরবেকথং নু মে মনস্বিন্যাঃ পাণিমন্যঃ পুমান্ স্পৃশেৎ?
য্যাতি তবু মানলেন না। যদিও পূর্বে হস্তস্পর্শ করার ফলে এবং এখন সেই হস্তস্পর্শের আকস্মিকতাই বৈবাহিক নিয়মের দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করায় তিনি যথেষ্ট অপ্রতিভ হলেন। আবারও প্রশ্ন তুললেন, সেই ব্রাহ্মণ্যের প্রশ্ন। ব্রাহ্মণরা যে কত বড় শ্রেষ্ঠ আসনে বসে আছেন, ক্রুদ্ধ হলে অভিশাপ দিয়ে তারা যে কত ক্ষতি করতে পারেন–এই সব নানা অজুহাতে যযাতি হস্তস্পর্শের পূর্ব অভিজ্ঞতাটুকুও যেন এড়িয়ে যেতে চাইলেন। বেশি বিনয় এবং নিকৃষ্টতা দেখালে দেবযানীও যদি তাকে শেষ পর্যন্ত নিকৃষ্ট ভেবে পাণিগ্রহণের নাগপাশ থেকে মুক্তি দেন–এই ভরসায় যযাতি ব্রাহ্মণের স্তুতি করলেন অনেক। তারপর বললেন–তুমি যাই বল, দেবযানী! তোমার পিতা যদি আমার হাতে তোমাকে সমর্পণ না করেন, তবে আমার পক্ষে তোমাকে বিবাহ করা সম্ভব নয়, দেবযানী– অতো দত্তাঞ্চ পিত্রা ত্বাং ভদ্রে ন বিবহাম্যহম্। যযাতির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল- অল্প বয়সী দেবযানী যাই বলুন, অসুরগুরু শুক্রাচার্যের মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রাহ্মণ কিছুতেই ক্ষত্রিয় রাজার হাতে নিজের মেয়ে দেবেন না।
কথাটা যযাতি একভাবে ঠিক বললেও, মেয়ের কাছে শুক্রাচার্য যে একেবারে নিস্তেজ ক্রীড়নকে পরিণত হন– সেকথা বুঝি যযাতি জানতেন না। দেবযানী মুহর্তের মধ্যে যযাতির কথাটা লুফে নিয়ে বললেন বেশ তো মহারাজ! আমি তো তোমাকে আমার স্বামী হিসেবে বরণ করেইছি। এখন আমার পিতাই না হয় আমাকে তোমার হাতে সম্প্রদান করবেন। কথাটা তো জলের মতো পরিষ্কার। তুমি তো আর আমাকে জোর করে বিয়ে করতে চাওনি। আমি নিজেই আমাকে তোমার হাতে সঁপে দিয়েছি। তুমি একজন আত্মসমর্পিতা রমণীকে গ্রহণ করে ধন্য করেছ মাত্র। এতে নিশ্চয়ই তোমার কোনও ভয় থাকতে পারে না অযাচতো ভয়ং নাস্তি দত্তাঞ্চ প্রতিগৃহ্নতঃ।
দেবযানী যযাতির সঙ্গে কথা শেষ করেই ধাত্রীকে পাঠালেন শুক্রাচার্যের কাছে। বললেন–তুমি শিগগির যাও। আমার পিতাকে নিয়ে এসো এখানে। তাকে কিন্তু এ কথাও জানিও যে, আমি নহষপুত্র যযাতিকে স্বামী হিসেবে বরণ করেছি–স্বয়ংবরে বৃতং শীঘ্রং নিবেদয় চ নাহুষ। ধাত্রী গিয়ে সমস্ত বৃত্তান্ত দেবযানীর মনমতো করেই শুক্রাচার্যকে জানাল। অসুরগুরু শুক্রাচার্যও সঙ্গে সঙ্গে এসে রাজা যযাতিকে দর্শন দিলেন। যযাতি শুক্রাচার্যের চরণ বন্দনা করে হাত জোড় করে অবনত শিরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
দেবযানী বললেন–পিতা! এই সেই রাজা, যিনি সেই মজা কুয়োর মধ্যে থেকে টেনে তুলবার সময় হাত ধরেছিলেন আমার–দুর্গমে পাণিগ্রহী। আপনি আমাকে এঁর হাতেই সম্প্রদান করুন। কারণ, ওই রকম করে হাত ধরার পর আমি কোনও পুরুষকে আর স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারব না-নমস্তে দেহি মাম্ অস্মৈ লোকে নান্যং পতিং বৃণে।
আগেও আমরা দেখেছি–যেখানে যে কথাটি দরকার, সেটা খুবই সুন্দর করে সাজিয়ে দিতে পারেন দেবযানী। বিবাহের সংজ্ঞা এবং সম্পূর্ণতা কালে কালে পরিবর্তিত হয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন পাণিস্পর্শমাত্রেই বিবাহ সম্পূর্ণ হত। কোনওকালে পিতা কর্তৃক। কন্যাসম্প্রদানের মাধ্যমেই বিবাহ সম্পূর্ণ হত। পরবর্তীকালে সপ্তপদীগমন না হলে বিবাহ অসম্পূর্ণ থেকে যেত। সময়ের পরিণতিতে এমনও হয়েছে যে, বিয়ের দিন কন্যা-সম্প্রদান অথবা সপ্তপদীগমন–এসবের কোনও মূল্য হবে না, যদি কুশণ্ডিকা না হয়। এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, দেব্যানীর সময়ে কোনও রমণীর হস্তস্পর্শের মূল্য ছিল সাংঘাতিক এবং শুধুমাত্র এই কারণ দেখিয়েই বৈবাহিক বিধির অলঙ্ঘনীয়তা প্রমাণ করা যেত। দেবযানীর বুদ্ধিমত্তাও এইখানেই যে, তিনি যযাতির পাণিগ্রহণের তাৎপর্য বিবাহের অনিবার্যতায় পরিণত করতে পেরেছেন।
