সামাজিক অবস্থান সংক্রান্ত এই মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলির সঙ্গে দেবযানীর কথার খুব বেশি তফাত নেই। তবে দেবযানীর দিক থেকে আকস্মিক প্রণয়ের আকুতিটুকু এমন উদভ্রান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, শুধু ক্ষত্রিয়ই নয়, মহারাজ যযাতি যদি বৈশ্য কিংবা শূদ্রও হতেন, তাহলেও বোধহয় দেবযানীর আপত্তি থাকত না। শাস্ত্র-প্রসিদ্ধি অনুসারে পরম পুরুষের মুখ, বাহু, উরু এবং পা থেকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য এবং শূদ্রের সৃষ্টি। শাস্ত্রের কথা অন্য স্থানে যতই বৈষম্য বয়ে নিয়ে আসুক, মহারাজ যযাতির কাছে এই বর্ণবৈষম্যের অন্য এক মাত্রা আছে। তিনি বলেছেন–যদিও একই ঈশ্বর-শরীর থেকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য এবং শূদ্রের সৃষ্টি হয়েছে, তাই বৈষম্যের কথাটা তত বড় না হলেও প্রত্যেক বর্ণের ধর্ম, আচার এবং শুচিতার বোধ ভিন্ন ভিন্ন, যদিও শুচিতার নিরিখে ব্রাহ্মণই সর্বশ্রেষ্ঠ–পৃথধর্মাঃ পৃথক্শৌচাস্তেষান্তু ব্রাহ্মণো বরঃ। কাজেই এদিক দিয়ে দেখতে গেলে ব্রাহ্মণের সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের বিবাহ সম্বন্ধ সমীচীন নয় মোটেই।
আগেই বলেছি–যযাতির কথার একটা অন্য মাত্রা আছে এবং সেটা বাস্তব সত্য। ভারতে ধর্ম, আচার এবং শুচিতার বোধ এতটাই দৃঢ়মূল যে, এগুলি শুধু ব্রাহ্মণই নয়, বৈশ্য, শূদ্র সমস্ত জাতির মধ্যেই এই বোধ কোনও না কোনওভাবে দৃঢ়প্রাথিত। সন্দেহ নেই, ব্রাহ্মণ্যবাদই এই শৌচ-আচার প্রতিষ্ঠার জন্য মূলত দায়ী, কিন্তু এই শুচিতা এবং আচার পালন অন্য বর্ণের মধ্যে এমনভাবেই সংক্রমিত হয়েছে যে, কখনও সেই শৌচ-আচার খোদ ব্রাহ্মণকেও ছাড়িয়ে গেছে। দু-একটি উদাহরণ দিই।
মনে আছে–ছোটবেলায় আমি এক বৈশ্য সাহার বাড়িতে খেতে বসেছি। বৈশ্যবাড়িতে এই খাওয়া-দাওয়া সমাজ তখন ভাল চোখে দেখত না, কিন্তু আমার পিতৃদেব শুদ্ধ বৈষ্ণব ছিলেন বলে তিনি এসব কিছুই মানতেন না। সে যাই হোক–খাবার সময় যে ব্যাপারটা আমাদের সবার চোখে পড়ল, তা হল–থালা, গেলাস আর পাঁচ-ছটি বাটির চমক। কাঁসা-পেতলের থালা-বাটি, কিন্তু মাজা-ঘষায় সে সব বাসনপত্রের রং ছিল নির্ভেজাল সোনার মতো। সোজা কথায় হাজার আচার-নিয়ম পালন করা বামুন বাড়িতে কোনওদিন আমরা অত মার্জিত থালা-বাটি দেখিনি। আমার মা বললেন– হ্যাঁ গা বউ! তোমাদের বাসনপত্র এমন সুন্দর থাকে কী করে? গৃহকত্রী বিনয় করে বললেন–সবই আপনাদের কাছেই শেখা, মা। বলা বাহুল্য, আমি সেই ছোট বয়সেও বুঝেছিলাম–সেই বৈশ্য-সাহাদের আচার-নিয়ম বামুনবাড়ির থেকে অনেক বেশি কঠোর। শৌচ-আচার-নিষ্ঠাও অনেক বেশি এবং শুধু তাই নয়, আলাদা।
পরবর্তীকালে এমনই এক বৈশ্য-সাহা পাত্রের সঙ্গে একটি বামুন বাড়ির মেয়ের বিয়ে হল। সন্দেহ নেই, সেই ভালবাসার বিয়ে এবং সৌভাগ্যবশত পাত্র-কন্যার পিতারা সে বিয়ে মেনে নিলেন। নতুন সংসার আরম্ভ হল। প্রথমদিকে বৈশ্যা শাশুড়িমাতা নতুন বউকে একটু সমঝেই চলতেন। পরে দেখলেন–নিয়ম, কানুন আচার-নিষ্ঠায় ব্রাহ্মণ-কন্যা অনেক শিথিল। সাহা-বাড়ির শাশুড়ি তার থেকে অনেক বেশি কট্টর, অনেক কিছুই তিনি বেশি মানেন। শাশুড়ি একদিন বলেই ফেললেন–হ্যাঁগা! তুমি বামুনবাড়ির মেয়ে! আর তোমার এই ব্যাভার? আচার-নিয়ম তুমি যে কিছুই মান না। একদিন দুদিন কথা শুনতে শুনতে বধূ জবাব দিল–আমাদের অত মানতে হয় না, এসব আমাদের রক্তে আছে। কথায় কথায় কথা বাড়ল, সংসার ভেঙে দু-খণ্ড হল।
শুধু এই আচার-নিয়মই নয়, বর্ণচতুষ্টয়ের প্রত্যেকের মধ্যে ধর্মবোধ, সংস্কৃতি এবং স্বভাবও এত পৃথক যে, এঁদের মধ্যে বৈবাহিক সম্বন্ধ হলে কিছু না কিছু বিরোধ একভাবে ফুটে ওঠেই। আবারও বলি–হয়তো ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ব্রাহ্মণের উচ্চতার অভিমানই এই বিরোধের মূল কারণ। তবে জাতি হিসেবে অন্য বর্ণেরও নিজস্ব অভিমান এবং স্বাতন্ত্রও কিছু কিছু আছে। সৌভাগ্যের বিষয় সমাজ এখন পালটাচ্ছে। উচ্চবর্ণ নিজেদের সংকীর্ণতা বুঝতে শিখছে এবং নিম্নবর্ণের মধ্যেও সেই বিশ্বাস গাঢ় হচ্ছে যে, তারাও পারেন, সব পারেন। সমাজের মধ্যবিন্দুতে সমস্ত বর্ণই একাকার হোক–এই কামনার পরেও মহারাজ যযাতির কথাটা আমাদের বুঝতে হবে তৎকালীন সমাজের বৈষম্যের নিরিখেই।
যযাতির বক্তব্য-ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ে যতই মেলামেশা আর বৈবাহিক সম্বন্ধ থোক, ব্রাহ্মণের শৌচ, আচার, নিষ্ঠা ক্ষত্রিয়ের সঙ্গে একমত নয়। একই শরীরের অন্তর্গত হলেও হাত, পা মুখের কাজ যেমন আলাদা, তেমনই একজন যেখানে যাগ-যজ্ঞ, ব্ৰতহোম নিয়ে দিন কাটাচ্ছে, অন্যজন সেখানে অমাত্য-সচিবের মন্ত্রণা, পররাষ্ট্রনীতি, শুকনীতি, দূত-নিয়োগ–এইসব নানান রাষ্ট্রীয় ভাবনায় ব্যস্ত। চতুর্বর্গের মধ্যে মোক্ষধর্ম যেখানে ব্রাহ্মণের পরম অনুসন্ধানের বিষয়, রাজাদের সেখানে শাস্ত্রের নিয়মেই মোক্ষের অভিসন্ধি থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। কারণ রাজা যদি মুক্তিচিন্তায় বিভোর হন তবে রাজ্য লাটে উঠবে।
ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের ক্রিয়াকর্মের এই ভিন্নতাই তাঁদের আচার-নিষ্ঠা এবং স্বভাবেও ভিন্নতা এনেছে। বৈবাহিক জীবনে এই ভিন্নতা যদি পদে পদে বিরোধের সৃষ্টি করে–সেই ভয়েই যযাতি বললেন–এই বিবাহ হতে পারে না, দেবযানী! ধর্ম এবং শুচিতার বিধানে ব্রাহ্মণরা আমাদের থেকে অনেক বড়। দেবযানী বললেন- কেন যে তুমি এমন ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের বিষম আচরণ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ? তোমাকে আমি আমার সমান বর্ণ বলে মনে করি। ঋষি বল আর ঋষিপুত্ৰই বল, তুমি আমার কাছে তাই। তুমি আমার প্রিয়তম। আমাকে দয়া করে তুমি বিবাহ করো–ঋষিশ্চাঋষিপুত্ৰ নহুষাঙ্গ বহস্ব মাম্।
