কিন্তু হায়! বিদায় চাইলেই কি বিদায় পাওয়া যায়? মুক্তি চাইলেই কি মুক্তি পাওয়া যায়? যযাতি ধরা দিতে এসে আরেকবাঁধনে জড়িয়ে গেলেন। ব্রাহ্মণ-কন্যা দেবযানীর পদপ্রান্তে যে সুন্দরী অধোবদনে বসে ছিল, নিশূপে যে দেবযানীর পাদসংবাহন করছিল, যযাতি তাকে দেখেই বেশি মুগ্ধ হলেন। কিন্তু সে কথা দেবযানীর সামনে তো আর বলা যায় না। অন্যদিকে দেবযানী রাজার কথা শোনার জন্য এতটাই ব্যগ্রভাব দেখিয়েছেন যে, যযাতি এখন পালাতে পারলে বাঁচেন। রাজার কথার মধ্যেও যেন সামান্য বিরক্তি ফুটে উঠেছে অনেক প্রশ্ন হয়েছে বহুধাপ্যনুযুক্তোস্মি– এবার চলি। কিন্তু চলা আর হল না। যে রমণী পুরুষ শিকার করার জন্য হাজারো দাসী নিয়ে উদ্যানবাটিকায় বসে আছে, তার হাত থেকে পালানো কি অতই সোজা?
.
৩৭.
দেবযানীর কাছে এসে দানবনন্দিনী শর্মিষ্ঠাকে বেশি পছন্দ হয়ে গেল যযাতির। তার সম্বন্ধে সবিশেষ জানা হল না, শুধু দাসীবৃত্তির নিগড়ে আবদ্ধ এক সুন্দরী রমণীর বারুদ্ধ নিষ্পলক দৃষ্টি যযাতিকে মোহিত করল। দেবযানীর নানা প্রশ্ন আর তার ভাল লাগছে না। তিনি এখনই বিদায় নিতে চান। কিন্তু রাজপরিচয় প্রদানের শেষে যযাতির দিক থেকে এবার চলি’–এই অনুমতি-যাচনাটুকুও শেষ হল না। কোনও ভণিতা নেই, কোনও প্রস্তাবনা নেই, দেবযানী প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন- এই দুই হাজার রমণী আর আমার এই দাসী শর্মিষ্ঠার সঙ্গে –দাস্যা শর্মিষ্ঠয়া সহ আজ থেকে আমি তোমার অধীন হলাম, রাজা। আজ থেকে তুমি আমার সখা, তুমি আমার স্বামী হবে। তোমার মঙ্গল হোক–তদধীনাস্মি ভদ্রং তে সখা ভর্তা চ মে ভব।
বুঝি আকাশের নীল থেকে ঘন বজ্রপাতও এত আকস্মিক নয়। ভাবনার বিষয় হল–যে। রমণী মজা কুয়োর মধ্যে পড়ে গিয়েও নিজের অহংকার ত্যাগ করেননি, যে রমণী বিপন্ন অবস্থাতেও বিপৎ-ত্রাতার কুল-পরিচয় জিজ্ঞাসা করেননি, যে রমণী অতি স্বল্প কথায় নিজের ব্যক্তিত্ব বিস্তার করে আত্মমর্যাদা বজায় রাখেন-এই কি সেই রমণী? এক লহমার মধ্যে মহারাজ যযাতির কাছে তিনি বিবাহের প্রস্তাব করে বসলেন!
যযাতি রাজা। রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে লোকচরিত্রও তার নখদর্পণে। তার ওপরে আছে রাজোচিত স্বভাবসিদ্ধি। অন্য পক্ষের কথা শুনে মনের মধ্যে যে ভাব হয়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে না রাজার মুখমণ্ডলে। তাকে যত্ন করে শিখতে হয়–কী করে মনের ভাব গোপন করতে হয়, কী করে প্রতিক্রিয়া দমন করতে হয়। এমনকি হাত, মুখ, চোখ–কোথাও যাতে কোনও বিকার ধরা না পড়ে–তার জন্য তাকে সযত্নে বিকার-প্রশমনের পাঠ নিতে হয় ছোটবেলা থেকে। এসব কথা প্রাচীন রাজধর্মের নীতিতেই পাওয়া যাবে।
মহারাজ যযাতিকে আমরা তাই একটুও চমকিত দেখছি না। তাছাড়া এত সহজে যদি এক রমণী স্বল্প-পরিচিত একটি পুরুষের কণ্ঠলগ্না হতে পারেন, তার প্রতি আর যাই হোক যযাতির মতো বিদগ্ধ নরপতির প্রেম হয় না। এক মুহূর্তের মধ্যে দেবযানী তার পূর্ব-বিদগ্ধতা, মর্যাদা এবং গাম্ভীর্য ত্যাগ করে যযাতির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। এই অতিরিক্ত তাড়াহুড়োর পিছনে কারণ একটাই। কচের অভিশাপ ছিল–কোনও ঋষিপুত্র তার পাণিপ্রার্থী হবেন না। অতএব ক্ষত্রিয়ই যদি বিয়ে করতে হয়, তবে ক্ষত্রিয়ের মতো ক্ষত্রিয় হলেন মহারাজ যযাতি। তার পিতা শুক্রাচার্য পর্যন্ত তাকে চেনেন এবং মর্ত্যভূমিতে তাকে প্রমাণস্বরূপ বলে মনে করেন। দেবযানী ভবিষ্যতে আর কোনও আশঙ্কা রাখতে রাজি নন।
দ্বিতীয় কারণও একটা আছে। তবে সেটাকে কারণ না বলে স্বভাব বলাই ভাল। কচের উদাহরণ থেকে যা বোঝা যায়, মহারাজ যযাতির উদাহরণ থেকেও তাই বোঝা যায়। দেবযানী পুরুষের সাহচর্যে এলেই প্রেমে পড়ে যান। প্রথম দিকে একটা সুনিপুণ ইচ্ছাকৃত গাম্ভীর্য এবং অহংকার তার চারদিকে ঘনিয়ে থাকে যেন, কিন্তু সেই গাম্ভীর্য এবং অহংকার পুরুষের সামান্য সান্নিধ্যমাত্রেই ভেঙেচুরে যায়। দেবযানীর এই দুর্বলতা কচও বুঝেছিলেন এবং রাজা হওয়ার দরুন যযাতির কাছে তা আরও তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে গেছে। মহারাজ যযাতিকে মানসিকভাবে আমরা ভীষণ প্রস্তুত দেখছি।
যে মুহূর্তে দেবযানী রাজার কাছে বিবাহের প্রস্তাব জানালেন, সেই মুহূর্তেই আমরা যযাতিকে ঝটিতি উত্তর দিতে দেখছি। দুহাজার দাসী আর শর্মিষ্ঠার সঙ্গে দেবযানীর এই আত্মসমর্পণ যতই আকস্মিক হোক, যযাতি সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর জানিয়ে বললেন–আমি তোমায় বিয়ে করতে পারি না, দেবযানী। তোমার ব্রাহ্মণ পিতা নিশ্চয়ই একজন নিকৃষ্ট বর্ণের ক্ষত্রিয় রাজার সঙ্গে তোমার বিবাহ-সম্বন্ধ করবেন না। দেবযানী লজ্জা ত্যাগ করে বললেন এও কি একটা কথা হল? তুমি তো ভালই জান–বামুনদের সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের দিন-রাত ওঠা-বসা, বিয়ে-থাও এই দুই জাতের মধ্যে যথেষ্ট হয়। ক্ষত্রিয় মেয়ের সঙ্গে ব্রাহ্মণের বিয়ে, অথবা বামুনের মেয়ের সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের বিয়ে–এরকম বর্ণসংকর সমাজে ভূরি ভূরি আছে– সংসৃষ্টং ব্ৰহ্মণা ক্ষত্রং ক্ষত্রেণ ব্ৰহ্ম সংহিত।
কথাটা যে দেবযানী খুব মিথ্যা বলেছেন, তা নয়। মহাভারতের পূর্বে লেখা ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিতে ক্ষত্রিয়ের থেকে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সূচিত হলেও বহু জায়গায় এই দুই জাতির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সাদরে উল্লিখিত হয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণ একদিকে বলেছে-ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় হলেন সমাজের সবচেয়ে শক্তিমান ধারা-ব্রহ্ম চ ক্ষত্রং চাশান্ত উভে বীর্যে, –অন্যদিকে ঐতরেয় ব্ৰহ্মণ বলেছে–ব্রাহ্মণ্য শক্তির মধ্যেই ক্ষাত্র শক্তির প্রতিষ্ঠা, আবার ক্ষাত্র শক্তির মধ্যেই ব্রাহ্মণ্যের প্রতিষ্ঠা-ব্রহ্মণি খলু বৈ ক্ষত্ৰং প্রতিষ্ঠিত, ক্ষত্রে ব্রহ্ম। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ প্রায় কবিতার মতো করে ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়ের পারস্পরিক মেশামিশি ব্যাখ্যা করেছে। বলেছে–স্বর্গ আর মর্তের যে সম্পর্ক, ঋমন্ত্র আর সামগানের মধ্যে যে সম্পর্ক, ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়ের মধ্যেও সেই সম্পর্ক–দৌরহং পৃথিবী ত্বং সামাহং ঋক্ ত্বং বেহ সংবহাবহৈ।
