দেবযানী এবং শর্মিষ্ঠার দুই হাজার দাসী নানা বিনোদন প্রক্রিয়ায় চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা মহারাজ যযাতিকে আগে দেখতে পান। চপল চটুল রমণী-সমাজের মাঝখানে বিখ্যাত এক পুরুষ এসে পড়ায় নিমেষে দাসীদের মুখ বন্ধ হল। লজ্জায় তাদের মাথা নত হল। যযাতি একটু অবাক হলেন। দুটি মাত্র রমণী। একজন উচ্চাসনে, একজন নীচাসনে। অথচ তাদের পরিচর্যা করছে দুই হাজার দাসী। আগের বার যযাতি যখন দেবযানীকে দেখেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন অসহায়। শুক্রাচার্যের মেয়ে বলে তিনি তার পরিচয় পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু তিনি দেবযানীর নাম জানতেন না। সেদিন একটি পরিচারিকাও যার ধারে কাছে ছিল না, আজকে তিনি কোন মন্ত্রবলে হাজার হাজার দাসী নিয়ে রাজকন্যার মতো বসে আছেন। আরও আশ্চর্য, যে অপ্রতিম সুন্দরী এই বিপ্রকন্যার সেবা করছে, তার চেহারাটাও তো মোটেই দাসীর মতো নয়।
কৌতূহলী রাজা দু’জনকে উদ্দেশ করেই বললেন– আপনাদের পরিচয় জানতে ইচ্ছা করি। আপনাদের নাম-গোত্র জানাবেন কি গোত্রে চ নমনী চৈব দ্বয়োঃ পৃচ্ছাম্যহং শুভে। সেকালের দিনে নামের সঙ্গে গোত্র জানানোর রীতি ছিল। তবে এই মুহূর্তে যযাতি যে নামের সঙ্গে গোত্রও জানতে চাইলেন, তার কারণ খুব স্পষ্ট। যযাতি দেবযানীকে যথেষ্টই চিনতে পেরেছেন, কিন্তু অন্যতরা তাকে আরও বেশি মোহিত করছে। এই রমণী আদৌ ক্ষত্রিয়ের বিবাহযোগ্যা কি না– এই তর্ক হঠাৎই রাজার মন জুড়ে বসেছে। আমরা কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকেও দুষ্যন্তকে এই তর্কে নিযুক্ত দেখেছি। কথাশ্রমের ব্রাহ্মণ্য পরিবেশে উপস্থিত হয়ে শকুন্তলাও ব্রাহ্মণকন্যা কি না- এই চিন্তায় দুষ্যন্তকে আমরা আকুলিত দেখেছি। আসলে, কন্যা ব্রাহ্মণী হলে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব করা কঠিন ছিল, কারণ তাতে বর্ণের অনুক্রম নষ্ট হয়।
এখানে দেবযানীকে যযাতি ব্রাহ্মণকন্যা বলে চিনতেনই, কিন্তু হাত ধরে তাকে তোলবার সময়েই তিনি বুঝেছেন– রমণী মনে বড় দুর্বল। কিন্তু আজ শর্মিষ্ঠাকে দেখে তিনি মোহিত হয়েছেন। তিনিও দেবযানীর সমগোত্রীয় ব্রাহ্মণী কি না, রাজা সেটা যাচাই করে নিতে চান। যথাতির জিজ্ঞাসা দু’জনের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হলেও উত্তর দিলেন দেবযানী। তিনি মালকিন, দাসীভূতা শর্মিষ্ঠার কথা বলারই অধিকার নেই সেখানে। দেবযানী বেশি কিছু বলতে চাইলেন না, জবাবটাও দিলেন শর্মিষ্ঠাকে তাচ্ছিল্য করে। দেবযানী বললেন আমার কাছেই শুনুন, রাজা! আমি শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী।
দেবযানীর রাজ-সম্বোধনেই বোঝা যায়, তিনি রাজাকে চিনেছেন। এবার শর্মিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে বললেন- এ আমার সখীও বটে, দাসীও বটে- ইয়ঞ্চ মে সখী দাসী। কিন্তু সখীত্বের থেকেও শর্মিষ্ঠাকে যে তিনি দাসী বলতেই বেশি পছন্দ করেন, সেটা বোঝানোর জন্য বেশ জোর দিয়ে বললেন- ও হল দানবরাজ বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠা। আমি যেখানে থাকব সেখানেই ওকে থাকতে হবে, যেখানে যাব, সেখানেই ওকে যেতে হবে-ইয়ঞ্চ মে সখী দাসী যত্রাহং তত্র গামিনী। মহারাজ যযাতি রাজ্য চালান, তিনি ধুরন্ধর রাজা। কথাটা শুনেই বুঝলেন- কোথায় যেন একটা গণ্ডগোল আছে। তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন– অসুরেন্দ্র বৃষপর্বার এমন সুন্দরী কন্যাটি কেমন করে আপনার সখীও হলেন আবার দাসীও হলেন- এটা শোনার জন্য আমার বড় কৌতূহল হচ্ছে– কথং নু তে সখী দাসী কন্যেয়ং বরবর্ণিনী।
সারা ভারত জুড়ে মহাভারতের যে বিভিন্ন সংস্করণ আছে, তার কয়েকটিতে যযাতির এই প্রশ্নের পর আরও কয়েকটি অতিরিক্ত শ্লোক দেখা যায়। সেই শ্লোকগুলির মধ্যে যযাতির মুখে শর্মিষ্ঠার চরম প্রশংসা শোনা যায়। এমনকি দেবযানীর রূপের তুলনায় শর্মিষ্ঠা যে শতগুণ সুন্দরী এবং পূর্বজন্মের অনেক পাপ ছিল বলেই যে শর্মিষ্ঠাকে দেবযানীর দাসীত্ব বরণ করতে হয়েছে– এ সব কথা অনেকটাই বলা আছে। তবে এই শ্লোকগুলি আমাদের কাছে খুব সমীচীন মনে হয় না। তার কারণ যযাতি বিদগ্ধ রাজা। তিনি এত রুচিহীনভাবে দেবযানীর সামনেই শর্মিষ্ঠাকে এমন অসভ্যভাবে প্রশংসা করতে পারেন না। বরং রাজা কৌতূহল দেখাবেন এবং দেবযানী সেই কৌতূহল সবিস্তারে মেটাবেন না– এইরকম কথোপকথনই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়।
বরং বলা যায়–রাজার যে শর্মিষ্ঠাকে ভাল লেগেছে- একথা রাজার কৌতূহল দেখেই বেশ বুঝতে পারলেন দেব্যানী। কোনও বিস্তারিত বিবরণের মধ্যে তিনি গেলেন না। শর্মিষ্ঠাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন– সবই কপাল, রাজা। সবই কপাল। ললাটের লিখন, তাই ও আমার দাসী হয়েছে, এ বিষয়ে বেশি কথা বলে লাভ কী– বিধানবিহিতং মত্বা মা বিচিত্রাঃ কথাঃ কৃথাঃ।
সঙ্গে সঙ্গে দেবযানী অন্য কথায় টান দিলেন। আমাদের ধারণা সব জেনেশুনেও দেবযানী সাভিনয়ে বললেন- বরং আপনার কথা বলুন, আপনাকে দেখে তো রাজা বলে মনে হচ্ছে। কথাও তো বলছেন উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণের মতো। বেদও আপনার জানা আছে মনে হয়। তা আপনার কী নাম? কারই বা পুত্র আপনি? কোথা থেকেই বা এসেছেন কো নাম ত্বং কুতশ্চাসি কন্স্য পুত্র শংস মে।
মহারাজ যযাতিও বুঝলেন– দেবযানী শর্মিষ্ঠার বিষয়ে বেশি কথা বলবেন না। তিনি তাই সাধারণভাবে জবাব দিলেন–তা ঠিকই বলেছেন আপনি। আমার ব্রহ্মচর্যের সময় থেকেই চতুর্বেদ আমার কানে এসেছে। আমি রাজাই বটে, আমার নাম যযাতি। দেবযানী এবার বুঝতে চাইলেন রাজা তাঁর জন্যই এখানে আবার এসেছেন কি না। বললেন–আপনি কী কারণে এই বনস্থলীতে এসেছেন? এই সরোবর থেকে লীলাপদ্ম আহরণ করার জন্য? নাকি মৃগয়া করার জন্য? যযাতি খটখট করে জবাব দিলেন– না, ভদ্রে! আমি মৃগয়া করতে এসে জলের খোঁজে এসেছিলাম এই উদ্যানভূমির মধ্যে। সে যাই হোক। অনেক কথা হল, এবার আপনি বিদায় দিন আমাকে বদ্ধপ্যনুযুক্তোস্মি তদনুজ্ঞাতুমহসি।
