দেবযানী এখন বড় আনন্দে আছেন। শুক্রাচার্যের আশ্রমে তিনি পূর্বে যেভাবে ছিলেন, এখন আর তিনি সেইভাবে থাকেন না। বনের ফুল তুলে নিজের আভরণ রচনা করা, পয়স্বিনী হোমধেনুটির পরিচর্যা করা, কিংবা উদাস কোনও মুহূর্তে বেণুমতীর তীরে বসে কোনও এক ব্রাহ্মণ-বয়স্যের স্মৃতিমুখে অলস অবসর যাপন– এ সব দেবযানীর পোয় না। তিনি এখন। রাজকীয় মর্যাদায় থাকেন। দানবরাজ বৃষপর্বা হাজারের ওপর আরও এক হাজার দাসী দিয়েছেন। এক হাজার দাসী শর্মিষ্ঠার সঙ্গে দেবযানীর শর্ত অনুযায়ী। আরেক হাজার দাসী তিনি দিয়েছেন শর্মিষ্ঠাকে, যাতে তার নিজের মেয়ের কষ্ট না হয়। দাসীবৃত্তি করতে গিয়ে শর্মিষ্ঠা যাতে অন্য দাসীদের ভিড়ে মিশে না যান, তাই দেবযানীর বুদ্ধিকে হারিয়ে দিয়ে বৃষপর্বা। আরও এক হাজার দাসী দিয়েছেন শুধু শর্মিষ্ঠার মর্যাদারক্ষার জন্য। দেবযানী না চাইলেও, যেহেতু এটা কোনও শর্তের মধ্যে ছিল না, তাই শর্মিষ্ঠা তাঁর পূর্বপরিচারিকাদের নিয়ে খানিকটা রাজমর্যাদাই ভোগ করেন বলা যায়। তবু শর্মিষ্ঠার তুলনায় দেবযানীর মর্যাদা এখন অনেক বেশি। তিনি দুই হাজার দাসীর পরিচর্যা-সুখে এখন বনস্থলীর সেই কুসুমিত কুঞ্জ-শয্যা, বেণুমতীর তীরে সেই লতাবিতান, অথবা বৃহস্পতিপুত্র কচের পরিবার-সুখ–সব ভুলে গেছেন।
অশেষ রাজকীয় সুখের মধ্যে অন্যতর মধুর এক সুখের আবেশ দেবযানীর অন্তর্গত হৃদয়ের মধ্যে খেলা করে। সেই যে একরাজা এসেছিলেন উদ্যানবাটিকায়। দেবযানীর তারক্ত অঙ্গুলিগুলির প্রশংসা করেছিলেন তিনি। তিনি তার অঙ্গুলিস্পর্শ করে কূপের গভীর থেকে তুলে এনেছিলেন। একবারও কি মনে হয় না- ভালই করেছিলেন শর্মিষ্ঠা। তাকে কুপগর্তে নিক্ষেপ করে ভালই করেছিলেন তিনি। নইলে পাণিপীড়ন করে তাকে তুলতেন না সেই রাজা। আমাদের ধারণা, সেই দিন থেকে প্রায় প্রতিদিন দেবযানী রাজকন্যার মর্যাদায় বসে থাকতেন সেই উদ্যানবাটিকায়। আঙ্গিরস কক্ষ তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন– কোনও ঋষিপুত্র তাকে বিবাহ করবেন না। বয়েই গেছে দেবযানীর ঋষিপুত্র বিবাহ করতে। তিনি এখন রাজেন্দ্রাণীর মতো সর্বত্র বিচরণ করেন, আর ফিরে ফিরে আসেন সেই উদ্যানবাটিকায়। যদি আরও একবার। রাজার তেষ্টা পায়। তিনি যদি আবারও পথশ্রান্ত হয়ে জল খেতে আসেন।
দেবযানী তাই দুই হাজার দাসীর মেলায় আজও এসে বসে আছেন উদ্যানবাটিকায়-বনং তদেব নির্যাতা ক্রীড়ার্থং বরবর্ণিনী। তিনি ইচ্ছে করেই এমন এক উচ্চাসনে বসে থাকেন যাতে রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠাকে নীচাসনে বসে তার পদসেবা করতে হয়। কারণ, শর্মিষ্ঠা যে তাকে এক সময় তার পিতার আসন নিয়ে কথা শুনিয়েছিলেন। এমনিতে দুই হাজার দাসী নিত্যদিনের ব্যবহারে দেবযানীর সঙ্গে সখীর মতোই আচরণ করে। তারা কেউ আজ গান করছে, কেউ নাচছে, কেউ ফুলের মধু খাচ্ছে, কেউ বা উদ্যানবাটিকার বৃক্ষ-লতার ফল চিবোচ্ছে আলস্যভরে। দেবযানী গান শুনছেন, বাজনা শুনছেন, নাচ দেখছেন আবার কখনও বা শর্মিষ্ঠার দেওয়া পানপাত্রে মধুমদ্য পান করছেন। মধুর আবেশ থেকে শর্মিষ্ঠাও বাদ যাচ্ছেন না। মধুমদ্যের ভাগ তিনিও কিছু পাচ্ছেন।
পাঠক! সেই রাজার কথা স্মরণে আসে তো? সেই রাজা, যিনি দেবযানীর ‘পাণিস্তানখালিঃ স্পর্শ করে সবলে উঠিয়ে এনেছিলেন দেবযানীকে, কূপগর্ত থেকে। সেই রাজা, যিনি মৃগয়ার পরিশ্রমে অবসন্ন হয়ে তৃষ্ণার জল পাবার জন্য উদ্যানবাটিকায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই রাজা, যিনি দেবযানীকে উদ্ধার করার পর প্রায় বিনা বাক্যে বিদায় নিয়ে রাজধানীতে চলে এসেছিলেন। আমরা বলেছিলাম- রাজা পতঙ্গবৎ দেবযানীর রূপবহ্নিতে শুধু পাখা পুড়িয়ে চলে গেছেন। আমরা বলেছিলাম। তিনি আবার আসবেন পতঙ্গবৎ বহ্নিমুখং বিবিক্ষুঃ। আগুনে পুড়ে মরতে কত সুখ, তা পতঙ্গ ভিন্ন আর কে বা জানে! মনুষ্য-পতঙ্গ যযাতির আবারও অকারণ সখ হল মৃগয়া করার। তিনি পাত্রমিত্র সঙ্গে নিয়ে আবারও মৃগয়ায় বেরলেন।
মহাভারতের কবি মন্তব্য করেছেন অনেক দিন পর দেবযানী আবারও একদিন সেই উদ্যানবাটিকায় ক্রীড়া করতে গেছেন। আর নাহুষ যাতি আবারও একদিন মৃগয়া করতে করতে পিপাসার্ত পরিশ্রান্ত হয়ে সেই বনের মধ্যে উদ্যানবাটিকায় এসে উপস্থিত হলেন তমেব দেশং সংপ্রাপ্তো জলার্থী শ্রমকর্ষিতঃ। মনুষ্যচরিত্র যাঁরা অবগত আছেন, তারা অবশ্যই বুঝবেন–এই চরম সমাপতন প্রায় অসম্ভব। মহাভারতের কবি মহারাজ যযাতিকে একটি রমণীর মোহে লালায়িত দেখাতে চাননি। কিন্তু আমরা জানি দেবযানী স্বেচ্ছায় প্রায়ই উপস্থিত হতেন সেই উদ্যানবাটিকায়। কারণ, যদি তিনি আসেন। আর মহারাজ যযাতির মৃগয়ার পথগুলিও এতটাই ধরাবাঁধা ছকে বাঁধা হওয়ার কথা নয় যে, ঠিক ওইখানেই এসে তিনি হারিয়ে যাবেন, পাত্রমিত্ররা আর তাকে খুঁজে পাবে না এবং তাকে শ্রান্ত পিপাসার্ত হয়ে ঠিক ওই বনেই প্রবেশ করতে হবে- জলার্থী শ্রমকর্ষিতঃ। আমরা জানি– যযাতির মনেও সেই তারক্ত নখালির হাতছানি ছিল- যদি তিনি সেখানে থাকেন। পতঙ্গ আগুন দেখতে পেল। আগুনের পুঞ্জ একটি নয়, দুটি।
মহারাজ যযাতি মৃগয়ায় শ্রান্ত হয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন। উম্মুক্ত বনস্থলীর মধ্যে বৃক্ষলতার অন্তরালে দাঁড়িয়ে তিনি দেখতে পেলেন– উদ্যানবাটিকায় যেন উৎসব লেগেছে। কত শত রমণী, কেউ গান গাইছে, কেউ বাজনা বাজাচ্ছে, কেউ নাচছে গায়স্ত্যো’থ প্রনৃত্যত্যো বাদয়ন্ত্যো’থ ভারত। আরও দেখলেন একটি রমণী সর্বাঙ্গে আভরণ পরে উচ্চাসনে বসে আছেন। রত্নখচিত আসনে সহাস্যে বসে তিনি অবসর বিনোদন করছেন। অন্যতরা এক রমণী, যাঁকে দেখলেই বোঝা যায় তিনি সাধারণ নন, তিনি কিঞ্চিৎ নীচাসনে বসে উচ্চতরার পা টিপে দিচ্ছেন। অতুল তার রূপরাশি, সমস্ত রমণীর মধ্যে তিনিই প্রধানা হবার উপযুক্ত। তবু তার হেমভূষিত আসনখানি, নীচস্থ এবং তিনি উচ্চাসনস্থ রমণীর পা টিপে দিচ্ছেন–দদর্শ পাদৌ বিয়াঃ সংবহন্তীমনিন্দিতাম্।
