উতঙ্ক রাজি হলেন না। গুরুপত্নীর বান্ধবীরাও সলজ্জ্বে চলে গেল। মহর্ষি বেদ ফিরে এলেন প্রবাস থেকে। বাড়িতে এসে সব কথা শুনে উতঙ্কের ওপর ভারি খুশি হলেন তিনি। ঋতু-রক্ষার ছুতোয় উতঙ্ক যে তার প্রিয়া পত্নীকে লঙ্ঘন করেননি– এই স্বস্তিটুকু তাকে আরও সুখী করে তুলল। উতষ্ককে তিনি সমস্ত বিদ্যার অধিকার দিয়ে বাড়ি যেতে বললেন।
বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি পাওয়াটা যে কোনও ক্লিষ্ট ছাত্রের পক্ষে অত্যন্ত আনন্দের কথা। কিন্তু যাওয়ার আগে উতঙ্কের মনে হল যে, তিনি গুরুর কাছে পেয়েছেন অনেক, দেননি কিছুই। একে তো মহর্ষি বেদ শিষ্যদের পরিশ্রম বেশি করান না, অন্যদিকে তার সন্তুষ্টি বিধান করায় উতঙ্ককে তিনি অন্যদের থেকে তাড়াতাড়ি বিদ্যায় অধিকার দিয়েছেন। সব কিছু মিলে উতঙ্কের মনে হল–প্রতিদান না হোক, অন্তত কৃতজ্ঞতা হিসেবে। তার কিছু গুরুদক্ষিণা দেওয়া উচিত গুরুকে। উতঙ্ক বললেন, আপনি যদি অনুমতি করেন, তবে আমি আপনাকে কিছু গুরুদক্ষিণা দিয়ে ধন্য হই।
মহর্ষি বেদ এতই খুশি ছিলেন উতঙ্কের ওপর যে, একবারও তিনি চাননি যে, তার শিষ্য কোনওভাবে গুরুদক্ষিণার জন্য কোথাও বিড়ম্বনা লাভ করেন। কারণ সেকালে অনেক গুরুই বিদ্যাদানের শেষ কল্পে এমন সব অকল্পনীয় গুরুদক্ষিণা চাইতেন যে, শিষ্যদের পক্ষে তা জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। বস্তুত যে ছাত্র গুরুগৃহে স্নাতক পর্যায়ে উত্তীর্ণ হল অথবা কঠিন কোনও বিদ্যা লাভ করল গুরুর কাছ থেকে, তার দক্ষিণা দেওয়ার ক্ষমতা ছাত্রদের হত না। তাদের টাকা-পয়সা, ঐশ্বর্য-বিত্ত এমন কিছু থাকত না যে, তাই দিয়ে গুরুদক্ষিণা মেটানো যায়। স্নাতক বা বিদ্যাবান ছাত্রেরা গুরুদক্ষিণার জন্য প্রায় সব সময়েই রাজা বা অন্যান্য বিত্তশালী লোকের দ্বারস্থ হতেন এবং বিত্তশালী লোকেরা যেহেতু প্রায় সব সময়েই বিদ্যোৎসাহী হতেন, অতএব উপায় থাকলে গুরুদক্ষিশার ব্যাপারে তারা কখনও নিরাশ করতেন না। আমরা রঘুবংশের রঘু, হরিশ্চন্দ্র এবং আরও অনেক রাজার নাম করতে পারি, যাঁরা গুরুদক্ষিণার ব্যাপারে অশেষ উদারতা দেখিয়েছেন। সেই তুলনায় মহর্ষি বেদের দক্ষিণা-কামিতা সামান্যই।
উতঙ্কের মুখে গুরুদক্ষিণার প্রস্তাব শুনে মহর্ষি বেদ প্রথমে বলেছিলেন, বৎস উতঙ্ক! আরও কিছুদিন থাকো এখানে, পরে যা হোক বলব। কিছু দিন গেল। উতঙ্ক আবার বললেন, আপনি আদেশ করুন। কী প্রিয়কার্য করব আপনার জন্য। বেদ একটু রেগেই গেলেন। বললেন, সেদিন থেকে বার বার তুমি এই ‘গুরুদক্ষিণা-গুরুদক্ষিণা করে আমায় বিরক্ত করছ। তুমি তোমার গুরুপত্নীকে জিজ্ঞাসা করে তিনি যা বলবেন, তাই এনে দাও– এষা য ব্রবীতি তদুপহরস্ব ইতি।
ব্রাহ্মণ-গুরু মহর্ষি বেদের কথা ভেবে আশ্চর্য হই। নিজেকে গুরুগৃহে কষ্ট করতে হয়েছে বলে কোনওদিন তিনি কোনও শিষ্যকে গুরুসেবার কষ্ট দেননি। অন্যদিকে আপন পরিবারের জন্য তার কত মমতা। দরিদ্র ব্রাহ্মণ স্ত্রীর সাধ-আহ্লাদ কোনওদিন পূরণ করতে পারেননি। শিষ্য পড়িয়ে আর সাংসারিক দু-এক বারের যজমানিতে তার এমন কিছু সাচ্ছল্যের উদয় হত না, যা দিয়ে তিনি পত্নীর জাগতিক সাধ আহ্লাদ পুরণ করবেন। তাই আজকে উতঙ্ক বারবার গুরুদক্ষিণা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে, সেই সুযোগে তিনি স্বাধিকার ত্যাগ করে আপন প্রিয়া পত্নীর কাছেই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন তদগচ্ছ এনাং প্রবিশ্য উপাধ্যায়ানীং পৃচ্ছ।
দরিদ্র ব্রাহ্মণের পত্নীর স্বপ্নই বা কতটুকু? তিনি বললেন, পৌষ্য রাজার ক্ষত্রিয়া পত্নী কানে যে কুণ্ডল-দুটি পরে থাকেন, সেই কুণ্ডল-দুটি তুমি রাজার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এস। উতঙ্ক চললেন পৌষ্য রাজার কাছে। মনে রাখবেন—এই পৌষ্য রাজা কিন্তু সম্পর্কে উতঙ্কের গুরুভাই। কারণ মহর্ষি বেদের অন্য দুই শিষ্য হলেন পৌষ্য এবং জনমেজয়। হয়তো পৌষ্য রাজা কোনওদিন সস্ত্রীক এসেছিলেন গুরুদর্শন করতে, আর বেদপত্নী হয়তো সেই অবসরে রাজরানির রত্নখচিত কানের দুল-দুটি দেখেছিলেন, বড় ভাল লেগেছিল, কানের দুটি কুণ্ডল মাত্র এক রমণীকে এত রমনীয় করে তোলে! গরিব ব্রাহ্মণীর সেই থেকে বড় শখ ছিল– এমন দুটি কুণ্ডল যদি তিনি পেতেন? ব্রাহ্মণ-গুরু মহর্ষি বেদকে এ কথা তিনি কোনওদিন বলতে পারেননি। বলা কি যায়? যাঁর সম্বল একটি দুগ্ধবতী গাভী আর কতগুলি শিষ্য, তিনি কোথা থেকে এই সোনার কুণ্ডল এনে দেবেন তাকে? কিন্তু বেদ বোধহয় এই শখের কথা জানতেন এবং জানতেন বলেই উতঙ্কের কাছে নিজে কিচ্ছুটি না চেয়ে প্রিয়া পত্নীর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
পৌষ্য রাজার বাড়ির পথ খুব সুখের হয়নি উতঙ্কের কাছে। যাই হোক নানা ঝামেলা পুইয়ে শেষ পর্যন্ত রাজার বাড়ি পৌঁছলেন তিনি। পৌষ্য ব্রাহ্মণ স্নাতক দেখামাত্রই দান দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। উতঙ্ক বললেন, আপনার স্ত্রী যে কুণ্ডল দুটি পরেন, আমি সেই দুটি চাই গুরুদক্ষিণার জন্য। পৌষ্য বললেন, তাহলে আমি কেন, আপনি আমার স্ত্রীর কাছেই কুণ্ডল দুটি প্রার্থনা করুন–প্রবিশ্যান্তঃপুরং ক্ষত্রিয়া যাচ্যতা। যাঁরা ভাবেন সেকালে স্ত্রীলোকের কোনও অধিকারই ছিল না, তাদের জানাই অন্তত স্ত্রীলোকের গয়না-গাটির ওপরে তার নিজস্ব আইনসঙ্গত অধিকার ছিল। একে বলা হত স্ত্রী-ধন। মনুসংহিতাই বলুন অথবা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র–এঁরা কেউই পুরুষকে স্ত্রীধন ব্যবহারের অনুমতি দেননি। রাজা পৌষ্য বুঝিয়ে দিয়েছেন- পত্নীর কানের দুল দান করার অধিকার তার নেই। তিনি নিজেও সে কথা স্ত্রীকে বলতে পারবেন না। কাজেই স্ত্রীর কানের দুল নিতে হলে উতঙ্ককে তার কাছেই যাচনা করে নিতে হবে।
