দানবরাজ নিজের কন্যাকে চিনতেন। তিনি জানতেন– শর্মিষ্ঠা পিতার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নেবেন এবং নিজকৃত অন্যায়ের জন্য তিনি অন্তত পিতাকে বিপদে ফেলবেন না। শর্মিষ্ঠা দেবযানী নন। শর্মিষ্ঠার ধাত্রী বৃষপর্বার বক্তব্য নিবেদন করার জন্য রাজনন্দিনীর ভবনে এসে উপস্থিত হলেন। যত সময় ধরে দেবযানী, শুক্রাচার্য এবং বৃষপর্বার কথোপকথন চলেছে, তাতে রাজনন্দিনীর ঘরে সব খবরই পৌঁছে যাবার কথা। কাজেই ধাত্রী এসে যখন বলল- শর্মিষ্ঠা। তোমাকে যেতে হবে সেই উদ্যানবাটিকায় তখনই দেখছি, শর্মিষ্ঠা মানসিকভাবে অনেক প্রস্তুত। তিনি এক দণ্ডের মধ্যেই যেন কৈশোরগন্ধী ষোলো বৎসর বয়সের চাপল্য কাটিয়ে অনেক বড় হয়ে গেছেন। ধাত্রী বলল- চলো শর্মিষ্ঠা! পিতা এবং আত্মীয়-স্বজনের সুখ সম্পাদন করো- উত্তিষ্ঠ ভদ্রে শর্মিষ্ঠ জ্ঞাতীনাং সুখাবহ।
বৃষপর্বা ধাত্রীকে যাই বলুন, রাজবাড়ির ধাত্রী, বহুঙ্কাল ধরে সে শর্মিষ্ঠার দেখাশোনা করছে। সে পরিষ্কার জানাল– দেবযানী। দেবযানীর প্ররোচনায় শুক্রাচার্য আজ তার দানবশিষ্যদের ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। অতএব দেবযানী যা চায় তাই তোমাকে করতে হবে। শর্মিষ্ঠা জবাব দিলেন দেবযানী যা চায়, আমি তাই করব। এমনকি শুক্রাচার্যও যদি দেবযানীর জন্য আমায় কিছু করতে বলেন, তাও আমি করব। তবু যেন আমার দোষে শুক্রাচার্য এবং দেবযানী এই রাজ্য ছেড়ে চলে না যান– মদদোষান্মাগমঞ্জুক্রো দেবযানী চ মকৃতে।
রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠা এক হাজার দাসী সঙ্গে নিয়ে পালকি চড়ে নগর থেকে বেরলেন। উপস্থিত হলেন দেবযানীর সামনে, সেই উদ্যানবাটিকায়, যেখানে তিনি চরম অপমান করেছিলেন দেবযানীকে। সবিনয়ে বললেন- দেবযানী! এই হাজার দাসীর সঙ্গে আমি তোমার পরিচারিকা দাসী হলাম– অহং দাসীসহস্রেণ দাসী তে পরিচারিকা। তোমার পিতা যেখানে তোমাকে পাত্রস্থ করবেন, সেখানেও আমি তোমার পেছন পেছন দাসী হয়েই যাব।
দেবযানী ভাবতেও পারেননি অত তাড়াতাড়ি শর্মিষ্ঠা আত্মনিবেদন করবেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন- শর্মিষ্ঠা এসে তাঁর পিতা বৃষপর্বার কাছে অনুযোগ করবেন। ক্রোধে দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে তিনি বৃষপর্বার কাছে আর্তি জানিয়ে বলবেন– এ তুমি কী করলে, পিতা? কেন তুমি এমন কথা দিলে? আর দেবযানী সেই করুণ কান্না শুনে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন, আর অপেক্ষা করবেন শেষ সিদ্ধান্তের জন্য। বৃষপর্বা যদি শর্মিষ্ঠাকে রাজি করাতে না পারেন, তবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পিতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্য ছেড়ে চলে যাবেন।
কিন্তু না, এসব কিছুই হয়নি। শর্মিষ্ঠা এসে পিতার সঙ্গে কথা বলেননি। তিনি যে মুহূর্তে বুঝেছেন- শুক্রাচার্য চলে গেলে দানব-রাজ্যের রাজনৈতিক বিপন্নতা তৈরি হবে এবং তাতে তার পিতা বিপন্ন হবেন, সেই মুহূর্তেই শর্মিষ্ঠা, রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠা দেবযানীর কাছে আত্মনিবেদন করেছেন। যার ওপর খুব রাগ করে বসে আছি, সে যদি একটুও রাগ না করে ঠাণ্ডা মাথায়, যা বলি তাই মেনে নেয়, তবে তার ওপরে আরও রাগ হয়। দেবযানীরও তাই হল। তিনি যখন দেখলেন শর্মিষ্ঠা বিনা দ্বিধায়, একটিও কথা না বলে হাজার দাসীর সঙ্গে তার দাসী হতে এসেছেন, তখন তার মুখ দিয়ে নির্গত হল সেই প্রাচীন আক্রোশ কেন? এখন কেন? তুই না বলেছিলি– আমি স্তাবক যাচক, পরজীবীর মেয়ে, আর তুই নিজে হলি বস্তুত, বহুপ্রার্থিত রাজার মেয়ে, তা এত বড় মানুষের মেয়ে হয়ে তুই আমার দাসী হবি কী করে–য়মানস্য দুহিতা কথং দাসী ভবিষ্যসি?
রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠা রাজকীয় ভঙ্গিতে জবাব দিলেন দেবযানী! আমার বাপ-ভাই-বন্ধুরা আমারই জন্য বিপন্ন বোধ করছেন, যেভাবেই হোক, বিপন্ন আত্মীয়-স্বজনকে বিপন্মুক্ত করাই আমার কাজ। আর ঠিক সেইজন্যই তোমার পিতা তোমায় যেখানে পাত্রস্থ করবেন, আমি সেখানেই তোমার অনুবর্তন করব- অতত্ত্বানুযাস্যামি যত্ৰ দাস্যতি তে পিতা।
দেবযানী বুঝলেন না তিনি হেরে গেলেন। শর্মিষ্ঠা পিতার গৌরবে দেবযানীকে এক সময় অপমান করেছিলেন, এখন আবার দেবযানীর দাসীত্ব স্বীকার করে পিতারই গৌরব রক্ষা করলেন। তার সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেও বৃষপর্বা দেবযানীকে যেভাবে কথা দিয়েছিলেন, শর্মিষ্ঠা সেই কথার মর্যাদা রক্ষা করলেন অক্ষরে অক্ষরে। কিন্তু দেবযানীর পিতা শুক্রাচার্য দেবযানীকে হাজার বুঝিয়েও স্বমত প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাকে নিরুপায় অবস্থায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেবযানীর কথা মেনে নিতে হয়েছে। তিনি পিতার সঙ্গে বৃষপর্বার সম্পর্কের কোনও মূল্য দেননি। অন্যদিকে শুক্রাচার্যও কন্যার প্রতি স্নেহবশত নির্বিচারে কন্যার বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেছেন। কাজেই অসুরগুরু শুক্রাচার্য এবং ঋষিকন্যা দেবযানী দু’জনেই বুঝি হেরে গেলেন রাজকীয় মর্যাদা এবং পরম আত্মনিবেদনের গাম্ভীর্যে। শর্মিষ্ঠার নির্বিরোধ শীতল মন্তব্যে প্রত্যুত্তরহীন দেবযানী শেষ পর্যন্ত আত্মখ্যাপন করে বলেছেন- এইবার আমি সন্তুষ্ট হয়েছি পিতা, এইবার আমি নগরে প্রবেশ করব– প্রবিশামি পুরং তাত তুষ্টাস্মি দ্বিজসত্তম। দানবরা সসম্মানে শুক্রাচার্য এবং দেবযানীকে নগরে প্রবেশ করাল, পিছন পিছন হাজার দাসীর সঙ্গে দেবযানীর অনুগামিনী হলেন রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠা।
