বৃষপর্বা কচি খোকাটি নন। তিনি অসুররাজ। শুক্রাচার্যের টিপ্পনি তিনি বেশ বুঝতে পারছেন। কিন্তু নিজের মেয়ের বয়সী এক বালিকার কাছে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে–এই ভাবনা তাকে হয়তো লজ্জিত করেছে। কিন্তু অসুরগুরু শুক্রাচার্যের কাছে যদি তাকে হাত জোড় করতে হয়, তবে তাতে তার কোনও সঙ্কোচ দ্বিধা কিছুই নেই। তাই পুনরায় দেবযানীর প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে তিনি বললেন-অসুর-দানবদের বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি যা আছে, গরু, ঘোড়া, হস্তি যা আছে, আপনি সব কিছুরই অধীশ্বর। সব কিছুই আপনার-তস্য ত্বং মম চেশরঃ। সব শুনে শুক্রাচার্য শেষ সিদ্ধান্ত দিলেন–আমি যদি সব কিছুরই প্রভু হই, তবে এই সামান্য কাজটা তোমরা করছ না কেন? তোমরা দেবযানীকে খুশি করো, সব ঝামেলা তাহলে মিটে যায়–তস্যেশ্বরোম্মি যদ্যে দেবযানী প্রসাদ্যতা। অর্থাৎ শুক্রাচার্য মেয়ের ব্যাপারে একেবারে আধুনিক পিতামাতার মতো অন্ধ। একমাত্র মেয়েকে তিনি কিছুতেই চটাবেন না। প্রথম দিকে তিনি প্রাচীন পিতাটির মতো দেবযানীর দোষ নির্ণয় করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সমস্যার শেষ পর্বে ঘটনার নিয়ন্ত্রণ তিনি দেবযানীর হাতেই ছেড়ে দিলেন অবুঝ মেহান্ধ পিতামাতার মতো। তার বক্তব্য–দেবযানী যা চায়, আমিও তাই চাই। অথচ মনে মনে জানি–তা হয়তো তিনি সম্পূর্ণ চান না।
.
৩৬.
দানবরাজ বৃষপর্বা শুক্রাচার্যের মতো মহগুরুকে কিছুতেই হারাতে চাইলেন না। শুক্রের কথা তিনি মেনে নিলেন। কথা দিলেন তিনি যে কোনও মূল্যে তার মেয়ে দেবযানীকে তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন। শুক্রাচার্য তবু বৃষপর্বার সম্মান বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন। সত্যিই তো, একজন প্রবলপরাক্রম রাজা শুধু শুক্রাচার্যের কথা ভেবে একটি অল্পবয়সী বালিকার কাছে করুণা ভিক্ষা চাইছেন- এ কথা ভাবতে শুক্রাচার্যের মায়া হচ্ছিল। শুক্র তাই বৃষপর্বার ভবন ছেড়ে আগেভাগেই দেবযানীর কাছে এসে বললেন-দেখ মা! তুমি তো জিজ্ঞাসা করেছিলে– আমি স্তাবক অথবা যাচক কিনা? দেখ, এই এক্ষুনি বৃষপর্বা তার প্রভু বলে আমাকে মেনে নিয়েছেন। বলেছেন– আমিই তার রাজ্য এবং ধনসম্পত্তির প্রভু। দেবযানী বললেন, বিশ্বাস করি না তোমার কথা। রাজা বৃষপর্বা স্বয়ং এসে নিজের মুখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলুন এই কথা। নইলে বিশ্বাস করি না তোমার বক্তব্য। নাভিজানামি তত্তে’হং রাজা তু বদ স্বয়ম্।
আসলে দেবযানী শর্মিষ্ঠার কথা ভুলতে পারেননি। শর্মিষ্ঠা তাকে স্তাবকের কন্যা বলেছেন। আজকে তিনি দেখবেন- কে কাকে স্তুতি করে? দেবযানীকে তুষ্ট না করলে তার পিতা অসুররাজ বৃষপর্বার রাজ্য ছেড়ে চলে যাবেন–এই ভয় দেখানো যে শুধু মৌখিক আড়ম্বর নয়, এটা শর্মিষ্ঠাকে দেখতে হবে– কীভাবে দানবরাজ শর্মিষ্ঠার অভিমান মিথ্যা করে দিয়ে। দেবযানীর স্তুতি রচনা করেন। দেবযানী তাই পিতাকে বলেই দিলেন– তুমি বললে হবে না, পিতা! শর্মিষ্ঠার বাবা এসে বলুন যে, তুমিই তার সব কিছুর মালিক– রাজা তু বদ স্বয়ম্।
শুক্রাচার্য দানবরাজকে তার নিরুপায় অবস্থার কথা জানিয়ে দিলেন। বলে দিলেন– একবার তোমাকে যেতেই হবে দেবযানীর কাছে। বৃষপর্বা আর দেরি করলেন না। আত্মীয়-স্বজন সঙ্গে নিয়ে বৃষপর্বা উপস্থিত হলেন সেই উদ্যানবাটিকায়, যেখানে অনেক নাটক পূর্বাহ্নেই ঘটে গেছে। দানবরাজা সটান এসে নিজের মেয়ের সমবয়সী গুরুপুত্রীর পায়ে লুটিয়ে পড়লেন পপাত ভুবি পাদয়োঃ। বললেন- তুমি রাগ কোরো না দেবযানী! তুমি যা চাও, তা যদি দেওয়া অসম্ভবও হয়, তবু তুমি বললে আমি সেটা দেওয়ার চেষ্টা করব। দেবযানী বিনা দ্বিধায় এক মুহূর্তের মধ্যে জবাব দিলেন- আজ থেকে শর্মিষ্ঠাকে আমি দাসী হিসেবে পেতে চাই। শর্মিষ্ঠার সঙ্গে থাকবে আরও এক হাজার দাসী, যারা শর্মিষ্ঠার সঙ্গেই আমার দাসীত্ব করবে– দাসীং কন্যাসহষেণ শর্মিষ্ঠামভিকাময়ে।
দেবযানী যে শর্মিষ্ঠাকে দাসী হিসেবে দেখতে চাইলেন– এ ঘটনার কারণ খুব স্পষ্ট। কিন্তু শর্মিষ্ঠার সঙ্গে যে আরও এক হাজার দাসী চাইলেন, তার দুটি কারণ আছে। এক নম্বর কারণ, দেবযানী ব্রাহ্মণ-ঘরের অনাড়ম্বর জীবন কাটিয়ে নিজেকে আর কোনওভাবেই হীন অবস্থায় রাখতে চান না। ব্রাহ্মণ-ঋষির দারিদ্রের মাহাত্মের থেকেও রাজকীয় আড়ম্বর তার কাছে বড় হয়ে উঠল। শর্মিষ্ঠা তাকে বলেছিলেন-ভিখারির আবার রাগ- রিক্তা ক্ষুভ্যসি ভিক্ষুকি। আজকে রাজবাড়ির হাজার দাসীর সঙ্গে শর্মিষ্ঠা যখন দেবযানীর দাসীগিরি করবেন, তখন দেবযানী থাকবেন রাজকন্যার প্রতিষ্ঠায়। দেবযানীর তাই শর্মিষ্ঠা ছাড়াও আরও দাসী দরকার। দ্বিতীয় কারণ, হাজার দাসীর সঙ্গে শর্মিষ্ঠা যখন তার দাসীত্ব বরণ করবেন, তখন শর্মিষ্ঠাকে বুঝতে হবে যে অন্য দাসীদের থেকে তিনি আলাদা কেউ নন। দাসী হলেও একাকিত্বের মধ্যে শর্মিষ্ঠা যদি বা কখনও তার পূর্বের রাজকীয়তা স্মরণ করতে পারতেন, হাজার দাসীর সঙ্গে শয়নে, ভোজনে, অপমানে শর্মিষ্ঠা একাকার হয়ে যাবেন; এই জন্যই দেবযানীর আরও হাজার দাসী চাই।
শুধু দাসীত্বের শাস্তি দিয়েই ক্রোধ প্রশমন হয়নি দেবযানীর। বৃষপর্বাকে তিনি বলেছেন শুধু এখনই নয়, আমার যখন বিয়ে হয়ে যাবে, তখন পিতা আমাকে যে পাত্রে দান করবেন, শর্মিষ্ঠা আমার পিছন পিছন আমার স্বামীর বাড়িতেও দাসী হয়ে যাবে– অনু মাং তত্র গচ্ছেৎ সা যত্ৰ দাস্যতি মে পিতা। দেবযানীর মুখ দিয়ে কথা বেরবার সঙ্গে সঙ্গেই দানবরাজ শর্মিষ্ঠার। ধাত্রীকে আদেশ দিলেন শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে আসবার জন্য। বলে দিলেন দেবযানী যা চায়, তাই করতে বলো শর্মিষ্ঠাকে।
