দেবযানীর কথায় শিক্ষক শুক্রাচার্য, গুরু শুক্রাচার্য উত্তেজিত হলেন। ভাবলেন–সত্যিই দানবরা এইরকম চিন্তা করে না তো? তাকে দানবরা রাজার তল্পিবাহক ভেবে বসেনি তো? সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাচার্য দানবরাজ বৃষপর্বার সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে সিংহাসনে বসা দানবরাজকে উদ্দেশ করে বললেন–পাপের ফল খুব তাড়াতাড়ি হয় না, মহারাজ! একটু সময় লাগে। ধরুন, এই মুহূর্তে আপনি খুব গুরুপাক দ্রব্য খেলেন, খুব ভালও লাগল খেতে, কিন্তু গুরু ভোজনের ফলটা কি এখনই পাবেন? না, তার ফল পাবেন কাল, পাপ জিনিসটাও ওইরকম। এখনই করলে এখনই তার ফল দেখা যায় না। পাপের ফল ফলতে একটু সময় নেয়– ফলত্যের ধ্রুবং পাপং গুরুভুক্তমিবোদরে। সোজা কথায়–আপনি যদি অন্যায়টা করেন, তার ফল আপনি যদি বা এড়িয়েও যেতে পারেন তবু সে ফল ফলতে পারে গিয়ে আপনার ছেলে বা নাতির সময়ে-পুত্ৰেষু বা নষু বা ন চেদাত্মনি পশ্যতি।
কথাটা শুনতে প্রায় মরে পুত্র জনকের পাপে এর মতো হল। আমাদের শাস্ত্রে পিতার পাপ পুত্রকে ভোগ করতে হয় না–এমন নীতি অবশ্যই আছে। কিন্তু বংশ বংশ ধরে পাপ-পুণ্য ভোগের নীতি আরেকভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। ধরুন পুণ্যের ফলে আপনার অনেক ঐশ্বর্য, অনেক টাকা হল। সেই ঐশ্বর্য সব সময় উপার্জনকারী ব্যক্তির প্রভাগেই ক্ষয় হয় না। উত্তরাধিকারী পুরুষেরা, অন্তত দু-এক পুরুষ পূর্বসঞ্চিত অর্থ বা ঐশ্বর্যের ফলভোগী হন। একইভাবে পাপের ফলে রোগ-শোক, বধ-বন্ধনাদি দণ্ডও শুধু পাপকারী ব্যক্তির শাস্তিতেই শেষ হয় না, কখনও বা তার প্রক্রিয়া চলতে থাকে আরও দু-এক পুরুষ ধরে।
শুক্রাচার্য এখানে দানবরাজ বৃষপর্বার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তার ওপরেই রাগ দেখাচ্ছেন বটে, কিন্তু অন্তরে তিনি জানেন–বৃষপর্বার কোনও দোষ নেই। দোষ করেছেন তার মেয়ে শর্মিষ্ঠা। এই রাগের সময়েও তিনি যে পাপের কথা বলছেন, সেই পাপাচারণের দায়ভাগিনীও শর্মিষ্ঠাই। ঠিক সেই জন্যই তার আক্রমণের ভাষাটা এইরকম-তুমি ফল না পেলেও তোমার ছেলে বা নাতি সেই ফল পাবে। বৃষপর্বাকে বিনা কারণে গালাগালি দেওয়ার সময় শুক্রাচার্যের সঙ্কোচ হচ্ছে। সেই জন্য শর্মিষ্ঠার অন্যায়ের কথা বলার আগে তিনি বৃষপর্বাকেও একটু জড়িয়ে নিলেন পূর্বতন এক অপরাধের বাঁধনে।
শুক্র বললেন–মহর্ষি অঙ্গিরার বংশজ কচ আমার বাড়িতে গুরুসেবায় নিরত ছিল। সে তোমাদের কোনও ক্ষতি করেনি। অথচ তোমরা তাকে সুখে থাকতে দাওনি, বার বার আঘাত করেছ তাকে। এখন আবার তোমার মেয়ে আমার সরল মেয়েটিকে যা নয় তাই বলেছে। তারপর যা করেছে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। অপ্রস্তুত অবস্থায় তার সঙ্গে প্রতারণা করে শর্মিষ্ঠা তাকে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়েছে–বিপ্রকৃত্য চ সংরম্ভাৎ কৃপে ক্ষিপ্ত মনস্বিনী। যে সব ঘটনা ঘটে গেল, তাতে আমার মেয়ে যে আর এখানে থাকবে, তা আমার মনে হয় না। আর আমার মেয়েই যদি না থাকে, তবে তাকে ছাড়া আমার পক্ষেই বা এখানে কী করে থাকা সম্ভব–সা ন কম্বেত বাসায় তয়াহং রহিতঃ কথম্? অতএব তোমার রাজ্য ছেড়ে আমি চলেই যাব–ত্যজামি বিষয়ং নৃপ।
শুক্রাচার্যের কথার মধ্যেই একটা ফাঁক আছে এবং সে ফাঁকটা তিনি ইচ্ছে করেই রেখেছেন। শুক্রাচার্য একবারও নিজের রাগের কথা বলছেন না। বার বার বলছেন–দেবানী অসন্তুষ্ট, আমার এখানে কিছু করার নেই। দেবযানীকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু শুক্রাচার্য একটু সান্ত্বনাও দেন বৃষপর্বাকে–আমি চলে গেলে তুমি কষ্ট পেয়ো না, বৃষপর্বা। অথবা আমার ওপর রাগ করো না যেন–মা শোচ বৃষপর্বা ত্বং মা ধ্যস্ব বিশাশতে। শুক্রাচার্যের কথা থেকে তার মনের ভাবটা স্পষ্ট বোঝা যায়। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন–তোমরা দেবযানীকে যেভাবে হোক ভোলাও এবং তাহলে আমার কোনও সমস্যাই থাকে না।
দানবরাজ শুক্রাচার্যকে বললেন– আমি যদি সত্যি সত্যিই আঙ্গিরস কচকে হত্যা করিয়ে থাকি অথবা যদি শর্মিষ্ঠাকে দিয়ে দেবযানীকে কটু কথা বলিয়ে থাকি, তাহলে যেন আমার সবরকম অসদগতি হয়। শুক্রাচার্য বললেন, আমি কি মিথ্যা কথা বলছি, দৈত্যরাজ? তুমি নিজের দোষটা দেখছ না এবং এখনও আমাকে তুমি উপেক্ষাই করে চলেছ। কথাটার অর্থ, এখনও তুমি শর্মিষ্ঠাকে শাসন করছ না কিন্তু। বৃষপর্বা বললেন–আপনি মিথ্যা বলছেন না, এ কথা নিশ্চিত-নাধর্মং ন মৃষাবাদং ত্বয়ি জানামি ভার্গব। কিন্তু আপনি এ কী করছেন? আপনি সন্তুষ্ট হন অন্তত। আপনি যদি আমার রাজ্য ছেড়ে চলে যান, তবে আমাকে তো সমুদ্রে ডুবে মরতে হবে; এছাড়া আমার আর কী উপায় থাকবে বলুন–সমুদ্রং সংবেক্ষ্যামো নানদস্তি পরায়ণ।
শুক্রাচার্য বললেন–তুমি সমুদ্রেই প্রবেশ কর কিংবা যেদিকে ইচ্ছা যাও, দেবযানীর কষ্ট আমি কিছুতেই সহ্য করব না। শুক্রাচার্য এবার আসল কথাটা পাড়লেন। অর্থাৎ আমার কথা ছাড়, তোমরা দেবযানীকে যদি তুষ্ট করতে পার, তবে সব ঠিক আছে। মে আমার প্রাণের থেকেও প্রিয় তোমরা তাকে তুষ্ট করো–প্রসাদ্যতাং দেবযানী জীবিতং যত্র সে স্থিত। দেবযানীর কথা বলেই শুক্র আবারও বুঝিয়ে দিলেন যে তার নিজের কোনও রাগ নেই বৃষপর্বার ওপর। তিনি তার ঘরে থাকতেই চান। কথাটা ঘুরিয়ে বললেন শুক্রাচার্য। বললেন–দেবগুরু বৃহস্পতি যেমন সদা সর্বদা ইন্দ্রের ভাল চান, তেমনই আমিও তোমাদের ভাল চাই–যোগক্ষেমকরস্তেহমিন্দ্রস্যেব বৃহস্পতিঃ। কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই এখন গণ্ডগোল হয়ে গেছে। তোমরা যে করে হোক দেবযানীকে প্রসন্ন করো।
