শুক্রাচার্যের মননশীল উপদেশে দেবযানীর খুব লাভ হয়নি। হয়নি তার কারণও আছে এবং সে কারণ বুঝতে গেলে দানবরাজ বৃষপর্বা এবং শুক্রাচার্যের সম্বন্ধ তথা তাঁদের সামাজিক, সাংসারিক অবস্থাটাও বুঝতে হবে। শুক্রাচার্য তার নিজের আশ্রমেই থাকেন, দানবরাজ বৃষপর্বা তাঁকে চুড়ান্ত সম্মান দেন এবং আদরও করেন। তিনি জ্ঞানী, তিনি ঋষি, সর্বোপরি তিনি সঞ্জীবনী বিদ্যা জানেন, যা আর কেউ জানেন না। অসুর-দানবদের ভাগ্যেই যে তিনি তাঁদের পক্ষে আছেন–এ কথা দানববাজ বৃষপর্বার অজানা নয়। এবং এইজনা বৃষপর্বা তাঁকে যথেষ্ট মাথায় তুলেও রাখেন। কিন্তু হাজার হলেও বৃষপর্বা রাজা। তিনি সুপ রাজসিংহাসনে বসে থাকেন, অন্য সভাসদরা সেখানে বসেন রাজার থেকে নীচাসনে। এমনকি অসুরগুরু শুক্রাচার্যের আসনও স্বভাবতই রাজাসনের নীচে। রাজগুরু হিসেবে রাজাকে যদি আদেশ, উপদেশ, এমনকি শাসনও করতে হয়, তবে তা নীচাসনে বসেই করতে হয় শুক্রাচার্যকে। কারণ রাজা রাষ্ট্রের প্রতীক, রাজদণ্ডের প্রণেতা তিনিই।
রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠার কাছে রাজার এই উচ্চ সিংহাসন, তার ব্যক্তিত্ব, তাঁর কর্তৃত্ব এবং সর্বোপরি তার সর্বাধিনায়কত্বই বড় হয়ে উঠেছে। দানবরাজ বৃৰপৰা যে অসু-দানবদের কারণেই শুক্রাচার্যের গুরুত্ব মেনে নিয়েছেন এবং সেই জন্যই যে তিনি শুক্রাচার্যকে দানে-মানে তুই রাখেন-এ কথা শর্মিষ্ঠা বোঝেন না। রাজকৃত ভরণ-পোষণ যে শুক্রাচার্য দয়া করে দীকার করেছেন, এই বোধ তার বালিকা-হৃদয়ে কাজ করে না। বালিকা তার পিতার মাজগৌরবে এই কথাই শুধু উপলব্ধি করে যে, তার পিতা শুক্রাচার্যের ভরণ-পোষণ করেন এবং শুক্রাচার্যকে বসতে হয় রাজার আসনতলে। বালিকা যা দেখে, তার মধ্যে যে বাস্তবের সত্যটুকু নেই, রাজকীয় মর্যাদা এবং মুগ্ধতা শর্মিষ্ঠাকে সে কথা ভাল করে বুঝতে দেয় না।
আর এইটাই ঠিক পছন্দ হয় না দেবযানীর। তিনি আবার তার পিতা শুক্রাচার্যের গুরুত্ব সম্বন্ধে এতটাই সচেতন, যে সমবয়সী শর্মিষ্ঠাকে তিনি মোটেই বন্ধু বলে মনে করেন না। শর্মিষ্ঠার পিতা আমার পিতার শিষ্য, অতএব সম্বন্ধগত নিয়মে শর্মিষ্ঠা আমার শিষ্যায়–এই দৃঢ় ধারণায় দেবযানীর মন ব্যাপ্ত। এই রোপিত অহংকৃতির মধ্যে শর্মিষ্ঠা যখন তাকে। ভিখারির মেয়ে বলেন, অথবা প্রতিহজীবী বলে চিহ্নিত করেন শুক্রাচার্যকে, তখন দেবযানীর মনে আর ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়, অথবা গুরু-শিষ্যের সম্বন্ধ-জ্ঞান অবশিষ্ট থাকে না, তখন সমস্ত সম্বন্ধ পর্যবসিত হয় ধনী-দরিদ্রের চিরন্তন ভেদবৈশিষ্ট্যে। দেবযানী তখন পিতাকে বলেন-ধনীরাও এক ধরনের চণ্ডাল, পিতা। চণ্ডালরা এবং ধনীরা সবসময়েই পরের উৎপীড়ন করে। ভাল কাজ এরা কেউই করে না এবং টাকার ক্ষমতায় এরা বড় হতে চায়। ধনী আর চণ্ডাল একইরকম পাপী, এরা একই রকম দুর্বত্ত–দুর্বত্তা পাপকর্মাণশ্চণ্ডালা ধনিনোপিচ। দেবযানী আরও বললেন–শুধু চণ্ডালের ঘরে জন্ম নিয়ে জাতিতে যারা চণ্ডাল, তাদেরই শুধু চণ্ডাল বললে চলে না। নিজের কর্তব্য কর্মটি যে করছে না, অথচ টাকা-পয়সা, আভিজাত্য, আর বিদ্যার অহংকারে যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, তারাও এক ধরনের চণ্ডালধনাভিজনবিদ্যাসু সাশ্চণ্ডাল ধর্মিনঃ।
দেবযানী যা বললেন, তার মধ্যে তিনি নিজেও জড়িয়ে যান কিনা সে কথা পরে বিচার্য। কিন্তু এই মুহূর্তে এমন মোম একটি কথা তিনি বলেছেন, যার সামাজিক তাৎপর্য এখনও বিদ্যমান। ভারি আশ্চর্য লাগে। একটা ব্যাপার ভারি আশ্চর্য লাগে। যার টাকা নেই, সে যখন অপরের কাছে মাথা নোয়ায়, তার কারণ বুঝি। যার শিক্ষা-দীক্ষা, বিদ্যাবত্তা নেই, সে যখন অপরের কাছে মাথা নোয়ায়, তারও কারণ বুঝি। কিন্তু যার টাকা-পয়সা আছে অথবা যার বিদ্যা আছে, সে যে কেন অপরের কাছে মাথা নুইয়ে চাটুকারিতা করে, সেটা ভেবেই আশ্চর্য লাগে। আজকাল কলেজ-ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ শিক্ষক রাজশক্তির কাছে মাথা নুইয়ে আরও কিছু পাবার আশায় প্রতিনিয়ত কতগুলি অযোগ্য রাজনৈতিক নেতার পদলেহন করেন। শিক্ষকসমাজের এই সামগ্রিক লোভ এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, সর্বার্থে তাদের দরিদ্র বলতে আমাদের কোনও অসুবিধে নেই।
মহামতি শুক্রাচার্য কারও চাটুকারিতা করেন না, কারও তোয়াক্কা করেন না–সে কথা দেবযানীও ভালভাবেই জানেন। কিন্তু রাজশক্তির প্রতিভূ হয়ে রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠা যদি অন্যায়ভাবে কোনও ভিত্তি ছাড়াও শিক্ষক শুক্রাচার্যকে রাজশক্তির উপাসক বলে চিহ্নিত করেন, তবে তার ঔরসজাতা বালিকা কন্যাও তাকে দরিদ্র মনে করেন। দেবযানী বললেন–দরিদ্র লোক যদি কিছু লাভের আশায় বিদ্বেষী ধনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বাবা, তবে তার থেকে বেশি দুঃখের আর কিছু নেই এই পৃথিবীতে–যৎ সপত্নবিয়ং দীপ্তাং হীনশ্রীঃ পর্য্যপাসতে।
আসলে শর্মিষ্ঠা নয়, রাজনন্দিনী শর্মিষ্ঠার কটু কথাগুলি দেবযানীর হৃদয়ে কাটার মতো বিধছে। কাটা আঙুল জোড়া লাগে, কুঠারছিন্ন অঙ্গে নতুন অঙ্গ জন্ম নেয়, কিন্তু কটু কথায় জর্জরিত হৃদয় কখনও সুস্থ হয় না। দেবযানী পিতাকে বুঝিয়ে ছাড়লেন–অসুরগুরু শুক্রাচার্য আজ নিশ্চয় রাজশক্তির কাছে মাথা নুইয়েছে, নচেৎ শুক্রাচার্য আজ শর্মিষ্ঠার কটুক্তিগুলিকে বালিকাসুলভ চাপল্য বলে উড়িয়ে দেবেন কেন?
