দেবযানী পিতার ক্রোধ উদ্দীপ্ত করে ব্যঙ্গোক্তিতে বললেন–বাবা! আমি যদি সত্যি সত্যি একজন স্তাবক এবং পরের দান প্রতিগ্রহী পিতার পুত্রী হই, তাহলে বলুন, আমি শর্মিষ্ঠার হাতেপায়ে ধরে তাকে যথাসাধ্য খুশি করার চেষ্টা করব;–আমি শর্মিষ্ঠার সখীকে আমার এই প্রতিজ্ঞার কথা বলেই দিয়েছি–প্ৰসাদয়িয্যে শর্মিষ্ঠামিত্যুক্তা তু সখী ময়া। দেবযানী এবার শেষ অপমানের কথাটা ধরিয়ে দিলেন শুক্রাচার্যকে। বললেন–শুধু কথা বলেই আমাকে শাস্তি দেওয়া শেষ হয়নি বাবা! এই বিজন বনের ভেতর আমাকে সে কুয়োয় ফেলে দিয়েছে এবং ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে গেছে–কূপে প্রক্ষেপয়ামাস প্রক্ষিপ্য গৃহমাগমৎ।
শুক্রাচার্য প্রাথমিকভাবে দেবযানীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি মহাপণ্ডিত এবং জ্ঞানী ব্যক্তি। দানবরাজ বৃষপর্বা যে তাকে কত সম্মান করেন, তা তার ভালই জানা আছে। এই অনাবিল সুসম্পর্কের মধ্যে দুটি অল্পবয়সী সুন্দরীর ঝগড়া তাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলেছে। শুক্রাচার্য বললেন–একেবারে, ভুল বুঝেছ দেবযানী! তুমি কখনও একজন স্তবক, যাচক অথবা দানজীবী ব্রাহ্মণের মেয়ে নও। তুমি সেই বাপের মেয়ে, যে কোনওদিন কারও চাটুকারিতা করে না, কারও তোয়াক্কা করে না উলটে সবাই যার স্তব করে,-অস্তোতুঃ স্বয়মানস্য দুহিতা দেবযান্যসি।
তার কথা যে কতটা ঠিক, সেটা প্রমাণ করার জন্য শুক্রাচার্য তিনটি বিশাল ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন-অসুররাজ বৃষপর্বা জানেন, দেবরাজ ইন্দ্র জানেন, আর জানেন মলোকের অধীশ্বর মহারাজ যযাতি। তারা জানেন–একমাত্র পরব্রহ্মাই আমার বল, আমার সর্বশক্তি। আর কারও তোয়াক্কা আমি করি না।
মহারাজ যযাতির সঙ্গে দেবযানীর দেখা হয়েছে। তিনিই যে দেবযানীকে উদ্ধার করেছেন–সে কথা এই মুহূর্তে ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করলেন না দেবযানী। শুধু এইটুকু বুঝে নিলেন যে, মনুষ্যলোকের এই কীর্তিমান পুরুষটি তার পিতার যথেষ্ট আদরণীয়। শুক্রাচার্য তখনও দেবযানীকে বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি যে কত কিছু পারেন, দৈত্য-দানবরা যে তাকে কতটা সমীহ করে চলে, সে সব কথা বলে তিনি শর্মিষ্ঠার কথাটাকে লঘু করে দিতে চাইছেন। শুক্রাচার্য বললেন–ভদ্রলোকেরা নিজের গুণের কথা নিজের মুখে বলে নাকি কখনও! আমার কত ক্ষমতা, সে তো তুমি জান, মা! এ জগতে আমিই একমাত্র লোক, যে সঞ্জীবনী বিদ্যা জানে। আর সেই বিদ্যা দিয়ে কত মৃত মানুষকে আমি জীবন দিয়েছি, তাও তো তুমি জান–ত্বং মে জানাসি য বল।
শুক্রাচার্যের ভাবটা এই–এত যার ক্ষমতা, সে কারও চাটুকারিতা করতে পারে না, বরং অন্যেরাই, তার চাটুকারিতা করে। শুক্রাচার্য দেবযানীকে বুঝিয়ে বললেন-স্বর্গে-মর্ত্যে যা কিছু আছে, সব কিছুই আমার অধীনে। স্বয়ং ব্রহ্মা আমায় সে কথা বলে দিয়েছেন। কাজেই যে যাই বলুক, দেবযানী! তোমার পিতা কোনও যাচক, স্তাবক মানুষ নন। তুমি ওঠো, বাড়ি চলো। বরং এই ভাল, শর্মিষ্ঠাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। কারণ বড় মানুষের গুণই হল ক্ষমা–তস্মাদুত্তিষ্ঠ গচ্ছামঃ স্বগৃহং কুলনন্দিনি।
আমরা দেবযানীর প্রকৃতি একটু-একটু জানি। তার ইচ্ছে এবং অনিচ্ছে দুটোই খুব তীক্ষ্ণ এবং প্রবল। খানিকটা খামখেয়ালিপনাও বলা চলে। শুক্রাচার্য তার মেয়েটিকে খুব ভাল করেই চেনেন। ছোটবেলা থেকে এই মাতৃহারা মেয়েটির ওপর তার অজস্র প্রশ্রয় সত্ত্বেও তিনি জানেন–দেবযানীর কিছু দোষ নিশ্চয়ই আছে। তাছাড়াও এই অকিঞ্চিৎকর ঘটনা তার কাছে নতুন এক বিপন্নতা বয়ে এনেছে। দুই পিতার মধ্যে সম্পর্ক খুবই ভাল, অথচ তাদের মেয়েরা ঝগড়া করছে, দুই স্বামীর মধ্যে সুসম্পর্ক আছে, অথচ তাদের স্ত্রীরা ঝগড়া করছে। এই অবস্থায় দুই পিতা বা দুই স্বামীর মনে যে বিচলিত অবস্থার সৃষ্টি হয়, শুক্রাচার্যেরও তাই হল। এর ওপরেও মনে রাখতে হবে–শুক্রাচার্য মহাজ্ঞানী ঋষি। যেমন তার শাস্ত্রজ্ঞান, তেমনই মার্জিত তার বোধশক্তি। তিনি দেবযানীকে এবার শাস্ত্রের যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলেন।
শুক্রাচার্য বললেন–রাগ জিনিসটা মোটেই ভাল নয় দেবযানী। ঘোড়ার লাগাম যে ধরে থাকে, সেই লোকটাই শুধু সারথি নয়, কেন না ওই রাগ জিনিসটাই হল ঘোড়ার মতো। শুধুই দৌড়ে চলে, শুধুই টগবগ করে লাফায়। যে মানুষ টগবগে ফুটন্ত ক্রোধ প্রশমন করতে পারে তাকেই আসলে সারথি বলতে হবে-যঃ পতিতং ক্রোধং নিগৃহ্নাতি হয়ং যথা। স যন্তা…। শুক্রাচার্য ক্রোধের দোষ এবং ক্রোধ-প্রশমনের গুণ দেখিয়ে অনেকক্ষণ বক্তৃতা দিলেন। তারপর দেবযানী এবং শর্মিষ্ঠার বিবাদ-বিসম্বাদের অন্তঃসারশূন্যতা সপ্রমাণ করে একটি সারকথা বললেন–অবুঝ নির্বোধ ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করেই থাকে–যৎ কুমারাঃ কুমাৰ্যশ্চ বৈরং কুর্য্যরচেতসঃ। তাই বলে, বড়রাও যদি সেই বিবাদে শামিল হয়, তাহলে কী করে চলে?
শুক্রাচার্যের শেষ কথাটা দেবযানীর পছন্দ হল না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার প্রতিক্রিয়া জানালেন। বললেন–আমার বয়স অল্প হলেও ধর্ম আর অধর্মের ফারাকটা আমি বেশ বুঝি, বাবা-বেদাহং তাত বালাপি ধর্মাণাং যদিহান্তর। ক্ষমা করা যে খুব ভাল, আর রাগ করাটা যে খুব খারাপ–সেটাও আমার ভালরকম জানা আছে। কিন্তু বাবা! শিষ্য যদি শিষ্যের মতো আচরণ না করে, আর চাকর যদি চাকরের কাজটি না করে তাহলে তো সবই বৃথা-প্ৰেষ্যঃ শিষ্যঃ সুবৃত্তিং হি বিসৃজ্য বিফলং গতঃ। শিষ্য যদি কখনও গুরু-গুরু ভাব দেখায়, আবার কখনও বা শিষ্য-শিষ্য ভাব দেখায় তবে, তাহলে সেই রম মিশ্রবৃত্তি শিষ্যের বাড়িতে আমার থাকতে ইচ্ছে হয় না, বাবা! তাছাড়া আরও একটা কথা। এঁরা কী রকম মানুষ, বাবা! আমাদের যা বৃত্তি আমরা সেই কাজ করি, অথবা আমাদের যা বংশ, আমরা সেই বংশের পরম্পরাগত ক্রিয়াকর্মের অনুষ্ঠান করি। এখন যদি কেউ আমাদের বংশ তুলে ভিখারি’ বলে গালাগালি দেয়, ব্রাহ্মণের বৃত্তির নিন্দা করে, দানজীবী বলে পরিহাস করে–পুমাংসো যে হি নিন্দন্তি বৃত্তেনাভিজনেন চ–তাহলে সেখানে অন্তত কোনও বুদ্ধিমান লোকের থাকা চলে না।
