মহামতি শুক্রাচার্য অনেক আগেই বৃষপর্বার রাজসভায় চলে গেছেন। দেবযানীর সঙ্গে। শর্মিষ্ঠার বিবাদ, দেবযানীকে কুয়োয় ফেলে দেওয়া, এবং যযাতির আগমন–কোনও খবরই তার কাছে পৌঁছয়নি। আশ্রমের দাসী ঘূর্ণিকা জানত–দেবযানী স্নানে গেছেন। সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে স্নানকেলি, নানা র, নানা খেলা-অতএব দেবযানীর দেরি হতেই পারে–এই ডেবে ঘূর্ণিকা এতক্ষণ বাড়িতেই বসেছিল। কিন্তু স্নানের বেলা বয়ে গিয়ে খাবার বেলাও যখন বয়ে গেল, তখন ঘূর্ণিা দেবযানীর খবর নিতে বেরল। দাসী দেখল-শর্মিষ্ঠা সহ অন্যান্য সব সখী বাড়ি ফিরে এসেছে, শুধু দেবযানী ফেরেননি। কানাঘুষোয় সে খবর পেয়েছে যে, উদ্যানবাটিকার মধ্যে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে দেবানীর কথা-কাটাকাটি হয়েছে। দাসী ঘূর্ণিকা দেবযানীর জেদ এবং খামখেয়ালিপনার সঙ্গে পরিচিত। সে আস্তে আস্তে সেই উদ্যানবাটিকার মধ্যে এসে পৌঁছল।
দেবযানী দাসীকে দেখামাত্রই শর্মিষ্ঠার সঙ্গে যা যা বাদ-বিসংবাদ হয়েছিল সব জানালেন। তারপর তাকে আদেশ দিলেন–তুমি এই মুহূর্তে পিতার কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বলো। আমার যা অপমান হয়েছে তাতে আমি অন্তত বৃষপর্বার রাজবাড়িতে ঢুকব না-নেদানীং সংপ্রবেক্ষ্যামি মগয়ং বৃষপণ। ঘূর্ণিকা তখনই ছুটল দানবরাজ বৃষপর্বায় সভাস্থলে, যেখানে শুক্রাচার্য বসে আছেন। দাসী ব্যস্ততা দেখিয়ে শুক্রাচার্যকে জানালে–আচার্য। বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে আঘাত করেছে। দেবযানী বলেছেন–আর তিনি এ বাড়িতে ঢুকবেন না। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় শুক্রাচার্য সঙ্গে সঙ্গে বৃষপর্বার সভাস্থল ত্যাগ করে নগরোপান্তের সেই উদ্যানবাটিকায় উপস্থিত হলেন। আদরিণী কন্যাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়ে খুব দার্শনিকভাবে বললেন–সকলের জীবনেই কখনও দুঃখ, কখনও বা সুখ আসে। তবে জান তো, নিজের কথা অন্যায় অথবা নিজের করা ভাল কাজ থেকে মানুষ দুঃখ পায় অথবা সুখ পায়। আমার ধারণা–তুমি নিজেই এমন কিছু অন্যায় করেছ, যার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে শর্মিষ্ঠার আঘাতে– মনে দুশ্চরিতং তেত্তি যস্যয়ং নিষ্কৃতি কৃতা।
আগেকার দিনে এটা ছিল। পাড়ায় চুড়ান্ত দস্যিপনা এবং বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করার পর বাড়িতে যদি কোনওভাবে সে খবর পৌছত বা নালিশ হত, তাহলে মা-বাবা আমাদেরই ধরে আগে খানিকটা পিটিয়ে নিতেন। তারপরে বিচার-আচার, কথাবার্তা। অনুরূপভাবে এও জানি–যে বন্ধুর অভিভাবক আমার বাড়িতে নালিশ করতে এসেছেন, তিনিও তার পুত্রকে তুমি কি ধোয়া তুলসী পাতা–ইত্যাদি গালাগালি সহযোগে উত্তম না হলেও মধ্যম গোছের কিছু ব্যবহার করে এসেছেন। তারপর যখন বিচার করে দেখেছেন, দোষটা বিপক্ষেরই বেশি, তখনই তিনি সলজে নালিশ জানাতে এসেছেন আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাবা-মাদের একটি সহজাত গুণ ছিল যে, তারা নালিশ শ্রবণমাতেই হার আরম্ভ করতেন; তখন পরপক্ষের অভিভাবকেরই যথেষ্ট মায়া হত। তিনি মাঝখান ঘেঁকে এসে প্রহার থামানোর চেষ্টা করতেন এবং বলতেন-দেখুন, ছেলেপিলেদের বাজার, আমারটিও কিছু কম অসভ্য নয়, কাজেই এবার হেড়ে দিন, যা হবার হয়ে গেছে অদ্ভুত উপায়ে যে আমাদের পিতৃ বিশেষত মাতৃকুল এক মুহূর্তের মধ্যে আপন উদগিৰ্য্যমান ক্রোধরাশি সম্বরণ করে নিয়ে পর মুহূর্তেই শত্রুপক্ষের নালিশকারী অভিভাবকের জন্য সহাস্যে বসন সম্বরণ করে চা করতে যেতেন, তা রীতিমতো শিক্ষণীয়। এই নিরিখে আধুনিক পিতামাতাকে জীবনের বহু রোমাঞ্চকর নাটক থেকে বঞ্চিত বলে মনে করি। স্বকপোলকল্পিতভাবে অতি নির্দোষ পুত্র-কন্যার পিতা-মাতা হওয়া প্রায় নির্বাণ-মুক্তির শামিল। পুত্র-কন্যারা তাই এখন অল্প বয়সেই বৃদ্ধ পিতামহের মতো বিজ্ঞ স্বভাব।
কথাগুলি উল্লেখ করলাম এইজন্য যে, মহামতি শুক্রাচার্য অতিশয় জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি মনে মনে বেশ জানেন যে, বিনা প্ররোচনায় শর্মিষ্ঠা তার মেয়েকে আঘাত করেনি। দেবযানীর কিছু দোষ নিশ্চয়ই আছে। অন্যদিকে আধুনিক পিতা-মাতার মতো তিনি একটি মাত্র কন্যার পিতা হওযায়, অপিচ কন্যাটি শৈশবের মাতৃহারা হওয়ায়, কন্যার ব্যাপারে তাঁর কিছু প্রশ্রয়ও আছে। কাজেই প্রাচীন এবং অত্যাধুনিক বৃত্তির দ্বৈরথে দাঁড়িয়ে শুক্রাচার্যের মতো পিতা কী করেন, সেটাই এখন দেখার।
লক্ষণীয় বিষয় হল, শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে যত অপমান করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি অপমান করেছেন শুক্রাচার্যকে। বালক-বালিকার ঝগড়াঝাটির মধ্যে পিতা-মাতার ওপর এই আক্রমণই ঘটনা জটিল করে তুলল। দেবযানী নিজের সুবিধের জন্য সেই মোক্ষম জায়গায় আঘাত করলেন। বললেন–পিতা! আপনি বলেছেন, আমার নিজের দোষের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে শর্মিষ্ঠার আঘাতে। কিন্তু কিসের এই প্রায়শ্চিত্ত? দেবযানী যে শর্মিষ্ঠাকে গালাগালি দিয়েছিলেন, সে কথা পিতাকে বললেন। শর্মিষ্ঠা যে ভুল করে তার কাপড়খানি পরে ফেলেছিলেন এবং সেই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিও যে দেবযানী সহজভাবে নেননি–এসব কথা তিনি কিচ্ছুটি বললেন না। তিনি শর্মিষ্ঠার পরের কথাগুলি সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন পিতার ক্রোধাগ্নি উদ্দীপিত করার জন্য।
দেবযানী বললেন–আমার প্রায়শ্চিত্তই বল আর যাই বল,–নিষ্কৃতিৰ্মেন্তু বা মাস্তু-শর্মিষ্ঠা আমাকে কী বলেছে, একটু মন দিয়ে শোনো। শর্মিষ্ঠা চোখ লাল করে আমাকে বলেছে–তোর বাপ দৈত্যদের চাটুকারী স্তাবক। এ কথা কি সত্যি বাবা? তুমি কি সত্যিই এক স্তাবক-সত্যং কিলৈতৎ সা প্ৰাহ দৈত্যানামসি গায়নঃ? শর্মিষ্ঠা আমাকে বলেছে-তুই হলি সেই বাপের মেয়ে যে আমার বাবার স্তাবক এবং আমার বাবার কাছ থেকে যে দান প্রতিগ্রহ করে। আরও বলেছে–আমি হলাম সেই বাপের মেয়ে, যে স্তুত হয়, যে দান দেয়।
