দেবযানী বললেন–মহারাজ! এই আমার সেই দক্ষিণ হাতখানি, সেই তারক্ত অঙ্গুলি পঞ্চক–এষ মে দক্ষিণা রাজন্ পাণিস্তাম্রখালিঃ। আপনি এই হাতখানি ধরেই তুলে নিন আমাকে। দেবযানী নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্যই রাজাকে মর্যাদা দিয়ে বললেন–নিশ্চয় মহান কোনও কুলেই আপনার জন্ম। আপনাকে দেখে শান্ত, বলবান এবং মনস্বী পুরুষ বলেই মনে হচ্ছে, আর ঠিক সেই কারণেই আমার হাত ধরে ওপরে তুলে নিয়ে যাবার জন্য আপনাকেই আমি যোগ্য লোক বলে মনে করছি তস্মান্মাং পতিতামস্মাৎ কৃপাদুদ্ধর্তুমহসি।
দেবযানী যে অবস্থায় পড়েছিলেন, তাতে যে কোনও লোকের হাত ধরেই তিনি ওপরে উঠে আসতেন। কিন্তু নিজের সম্বন্ধে তিনি এতটাই সচেতন যে, রাজাকে দেখামাত্র তিনি নিজের অধীরতা প্রকাশ করেননি। কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসার আকুলতা দেখিয়ে নিজেকে তিনি কোনও প্রার্থিনী প্রগলভা রমণীতে পরিণত করেননি। বিপমুক্তির জন্য তার কোনও অধীরতা বা আকুলতা ছিল না, তা মোটেই নয়। ছিল, কিন্তু বিদগ্ধা দেবযানী সে ব্যাকুলতা চেপে রেখে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যযাতির সমমর্যাদায়। বলেছেন–তুমি শান্ত, বীর্যবান এবং মনস্বী বলেই আমাকে উদ্ধার করার উপযুক্ত মনে করি তোমাকে।
মহারাজ যযাতি বুঝলেন-রমণী ব্রাহ্মণকন্যা। অতএব যথোচিত মর্যাদা প্রদর্শন করে তার দক্ষিণ হাতখানি বাড়িয়ে দিলেন দেবযানীকে তুলে আনার জন্য। মানবদেহের দুটি হাতই যথেষ্ট প্রয়োজনীয় হলেও ডান হাতটিই মর্যাদা এবং সভ্যতার প্রতীক। যযাতি তাই নিজের দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে ব্রাহ্মণকন্যা দেবযানীর দক্ষিণ হস্তখানি ধারণ করলেন–সেই হস্তখানি, যার আতা আভায় যযাতির ধনুর্ধারণ কর্কশ হস্তখানি যেন রঞ্জিত হল। দেবযানীকে তিনি কৃপগর্ত থেকে উদ্ধার করে আনলেন–গৃহীত্ব দক্ষিণে পাণাবুজ্জহার ততো’বটাৎ! কূপ থেকে দেবযানীকে তুলে আনবার পর মহারাজ আর এক মুহূর্তের জন্যও দেরি করেননি। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যযাতি নিজের রাজধানীতে ফিরে এলেন।
মহাভারতের কবি কিচ্ছুটি বললেন না। অথচ খটকা একটা রয়েই গেল। যে রাজা মৃগয়ায় মত্ত হয়ে বনে বনে ঘুরছিলেন, তৃষ্ণার্ত হয়ে উদ্যানবাটিকায় প্রবেশ করেছিলেন, তার শিকার বন্ধ হয়ে গেল, জল খাওয়া মাথায় উঠল। তিনি এক মুহূর্তের জন্য দেবানীকে দেখলেন, আর বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। এ কেমন কথা হল? মহাভারতের কবি যযাতির বিদায়-যাত্রা বর্ণনা করেছেন একটি মাত্র পংক্তিতে এবং সেটি বড়ই অর্থবহ। বঙ্কিমি কায়দায় বলতে গেলে ব্যাপারটা এইরকম দাঁড়ায়–নির্জন জনপদে বিশাল উদ্যানবাটিকার মধ্যে সমীরণ যখন বড়ই ব্যাকুল, পাঠক! আপনি তখন তৃণাবৃত কুপের মধ্য হইতে এক সুন্দরী রমণীকে উদ্ধার করিতে প্রস্তুত হইয়াছেন। রমণীদেহের লঘুতা শাস্ত্রেকাব্যে যতই প্রশংসিত হউক, রমণীর কিশলয়পল্লববৎ কোমল অঙ্গুলিমাত্র, ধারণ করিয়া সম্পূর্ণ রমণীর শরীর কৃপের নিম্নতা হইতে সমভূমির উচ্চতায় তুলিয়া আনা কেবল দেবতার অলৌকিক স্পর্শেই সম্ভবে, মনুষ্যদেহে নহে।
মহাভারতের কবিকে তাই বলতে হল–যযাতি বলপূর্বক তাকে কুয়োর মধ্যে থেকে তুলে এনেই-উদ্ধৃত্য তরসা চৈনা-সুনিতম্বা দেবযানীর কাছ থেকে বিদায় নিলেন–আমন্ত্ৰয়িত্ব সুশ্রোনীং যযাতিঃ স্বপুরং যযৌ। বলপূর্বক কুপ হইতে উদ্ধার করিতে গেলে রমণী শরীর কী পরিমাণে স্পর্শ করিতে হইবে, কতটুকুই বা বলপ্রয়োগ করিতে হইবে, পাঠক আন্দাজ করিতে পারেন। কিন্তু বিশাল বুদ্ধি ব্যাসের শব্দভাণ্ডারে দেবযানীর বিশেষণ হিসেবে আর কি কোনও শব্দ প্রযুক্ত হতে পারত না। সুশ্রোণী দেবযানীর কাছে বিদায় নিলেন যযাতি। ভাবে বুঝি– যযাতির দাঁড়াবার কোনও উপায় ছিল না। অপরিচিতা রমণীকে যে শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে তাকে তুলে আনতে হয়েছে, তাতে যযাতির আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রম্ভালাপ করার মুখ ছিল না। তিনি মুহূর্তের মধ্যে বিদায় নিলেন, কিন্তু যাঁর কাছে তিনি বিদায় নিলেন, তিনি ধীরা, স্নিগ্ধা, লজ্জিতা দেবযানী নন, তিনি সুনিতম্বা দেবযানী। যযাতির বিদায় মুহূর্তে রমণীশরীরের এই একটি মাত্র প্রত্যঙ্গ সন্ধির উল্লেখ করে মহাভারতের কবি বুঝিয়ে দিলেন–যযাতি মরিয়াছেন, তিনি পুনরায় মরিতে আসিবেন। দীপ্ত অগ্নিশিখাবৎ-কন্যামগ্নিশিখামিব–দেবযানীকে স্পর্শ করিয়া যে পতঙ্গ একবার হস্তপক্ষ পুড়াইয়াও কোনওমতে বাঁচিল, সে অগ্নির রূপে মুগ্ধ হইয়া আবার পুড়িতে আসিবে। পতঙ্গবন্ বহ্নিমুখং বিবিক্ষুঃ। পাঠক! ক্ষণকাল অপেক্ষা করো। রূপের আগুন মনুষ্যপতঙ্গকে মেনে পুড়ায়, বসিয়া দেখো।
০৩৫. দেবযানী-যযাতি-শর্মিষ্ঠা
৩৫.
নির্জন উদ্যানবাটিকার মধ্যে শীতল পুষ্করিণীর ধারে একাকী দাঁড়িয়ে ছিলেন দেবযানী। হৃদয়ের মধ্যে ক্ষণিকের অকারণ ঘোর লাগিয়ে দিয়ে মহারাজ যযাতি চলে গেছেন। রাজা চলে যেতে শর্মিষ্ঠার কথা মনে পড়ল দেবযানীর। মনে পড়ল তাঁর চরম অপমানের কথাগুলি। মনে পড়ল–শর্মিষ্ঠা তাঁকে কুয়োর মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তাঁকে মারবার চেষ্টা করেছেন। রাগে অপমানে দেবযানীর মুহূর্তপূর্বের প্রসন্ন মুখখানি লাল হয়ে উঠল। এদিকে এতক্ষণ তিনি বাড়ি ফিরছেন না দেখে শুক্রাশ্রমের দাসী তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। দাসীর নাম ঘূর্ণিকা।
