আমরা মৃগয়ার কথাটা তুললাম এই জন্য যে, চন্দ্রবংশের কৃতী পুরুষ যতির ভাই যযাতি বহুদিন ধর্মানুসারে রাজত্ব করে পাত্রমিত্র সঙ্গে নিয়ে মৃগয়ায় বেরলেন। সেকালের দিনে মৃগয়ায় বেরলে অসুবিধে যেমন অনেক হিল, তেমনই সুবিধেও ছিল কিন্তু কিছু। মৃগয়ার জন্য দিন-রাত বনে-জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে যখন চরম ক্লান্তি আসত, তখন রাজাদের একমাত্র ভরসা ছিল ঋষিদের আশ্রম। ঋষি-মুনিরা লোকালয়ের বাইরে নির্জন অরণ্যভূমিতে পর্ণকুটির বেঁধে থাকতেন, ঋষিমুনিদের সঙ্গে দেখা করা এবং সৎসঙ্গ আলোচনায় এই হিল সুযোগ। মুনি। গৃহস্থ হলে ঋষিকন্যাও খুব দুর্লভ ছিল না। দুষ্যন্ত হরিণের পিছনে ছুটতে ছুটতেই কৰাশ্রমবাসিনী শকুন্তলার দেখা পেয়েছিলেন। কিন্তু তার বহু পূর্বপুরুষ যযাতির কাছে ব্যাপারটা এত সহজ হয়নি। সারাদিন মৃগ-বরাহের অনুবর্তী হয়ে তিনি অসম্ভব তৃষ্ণার্ত হয়ে বৃষপর্বার সেই বিশাল উদ্যানবাটিকায় প্রবেশ করলেন। তার মন আনন্দে নেচে উঠল। সামনেই বিশাল বাঁধানো ঘাট। উত্তাল সমীরণে পুষ্করিণীর জলে ঢেউ উঠছে, যেন তাকে হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে জলপানের জন্য।
রাজা ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়াটি ছেড়ে দিলেন তৃণভোজনের জন্য। হরিণের পিছনে ছুটে ছুটে ঘোড়াটি পরিশ্রান্ত, রাজা যযাতি পিপাসার্ত। ধনুক-বাণ উষ্ণীধ রেখে রাজা যযাতি জল খেতে নামবেন, এমন সময় তাঁর কানে ভেসে এর রমণীকণ্ঠে ক্রন্দনের রোল। ক্রন্দনধ্বনি তত পরিষ্কার নয়, কেমন যেন গুমরানো, কোনও এক বন্ধ জায়গা থেকে যেন এ ক্রন্দন ভেসে আসছে। যযাতি ধনুক-বাণ-তরবারি পুণরায় হাতে নিলেন। মাথায় রাজোচিত পরিধান করে নিতে ভুললেন না। ক্রন্দনের স্বর লক্ষ্য করে এগোতে এগোতে রাজা বুঝলেন দূরে কোথাও নয়, কাছেই আছে এই ক্রন্দনের উৎস। একটু এগোতেই তাঁর ভারী আশ্চর্য লাগল। একটি পরিত্যক্ত মজা কুয়োর মধ্যে একটি রমণি আর্ত চিৎকার করছে বাঁচার আশায়। রমণী অতিশয় সুন্দরী। তাঁর রূপ আগুনের শিখার মতো, যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে। পরিত্যক্ত মজা কুয়োর কথা পাঠকের স্মরণে আছে নিশ্চয়। সেই যেখানে বস্ত্রহরণের বিবাদে দানবরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা দেবীকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলেন।
ক্ষণিকের জন্য মহারাজ যযাতি হতচকিত বোধ করলেন। মহাভারতের কবি একটিমাত্র উপমার অঙ্গুলিসংকেতে যযাতির মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। সাধারণ অবস্থার একটি রমণীকে কুয়োয় পড়ে থাকতে দেখলে একটি পুরুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হত তাকে হাত বাড়িয়ে তুলে আনা। কিন্তু কবি বলেন–রমণী যেন আগুনের শিখার মতো– অগ্নিশিখামিব। আগুনে হাত দিতে যেমন মানুষের ভয় লাগে, তেমনই দেবযানীর চেহারার মধ্যে এমন এক আগুনপানা ব্যক্তিত্ব ছিল, এমন অহংকার ছিল, এমন এক দূরত্ব ছিল যেন তাঁকে দেখামাত্রই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলা যায় না—উঠে এস।। তাঁকে বিপদ থেকে ত্রাণ করার আগে ত্রাণকর্তাকেই যেন নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে হয়। তাঁকে স্পর্শ করার আগে মহারাজ যযাতির ভাষায় মধুর সান্ত্বনার স্বর যুক্ত হল—সান্না পরমবস্তুনা। যযাতি আগে তাঁর পরিচয় জানতে চান, আগুনে হাত দেওয়ার আগে তার দাহিকাশক্তি অথবা উষ্ণতার পরিমাণ করে নিতে চান যেন।
যযাতি বললেন–কে তুমি কন্যেও– ত্বং তানী শ্যামা মণিকুলা। সংস্কৃত শ্লোকের মধ্যে ‘শ্যামা’ শব্দটি লক্ষণীয়। কালিদাসের মেঘদূত-এ মন্দাক্তান্তায় উচ্চারিত ‘তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা’র ঝংকারে যারা যক্ষপ্রিয়াকে কালো মেয়ে ভাবেন, তারা অবশ্যই ভ্রান্ত। শ্যামা মেয়ে মানে, যে মেয়ের গায়ের রঙ গলিত সুবর্ণের মতো। এর ওপরে আছে মহামতি নীলকণ্ঠের টিপ্পনি–শ্যামা ষোড়ষবার্ষিকী যৌবনারূঢ়া। অর্থাৎ যযাতি যখন দেবযানীকে সম্বোধন করে বলেন–কে তুমি গো শ্যামা মেয়ে, তখন তার একটি শব্দচ্চারণের মধ্যেই যেন দেবযানীর সোনা-গলা গায়ের রং, আর তার ষোলো বছরের যৌবনটুকু ইঙ্গিতে বোঝানো আছে। অর্থাৎ আমার চোখ এড়ায়নি সুন্দরী, আমার খেয়াল আছে। যযাতি জিজ্ঞাসা করেন কে তুমি কন্যে? এমন তপ্ত-সোনার মতো গায়ের রং তোমার, ওপরে উঠবার জন্য যে। আঙুলগুলি তুমি বাড়িয়ে দিয়েছ, কেমন ঘষা তামার মতো লাল সেই আঙুলগুলি, কানে হিরে-পান্নার মাজা দুল–কিন্তু এসব তো সৌভাগ্যের লক্ষণ, সুন্দরী। এত সৌভাগ্য সত্ত্বেও তুমি বিপদাতুর মানুষের মতো কাঁদছ কেন–কস্মাচ্ছোচসি চাতুরা।
মহারাজ যযাতি আশ্চর্য হলেন। পরিষ্কার বুঝলেন, রমণী দূরে কোথাও থাকে না। ওই মাঠ, নদী, জঙ্গল, পুষ্করিণী–কোনওটাই যে এই রমণীর খুব অপরিচিত, তা মনে হচ্ছে না। যযাতি তাই অবাক হয়ে বললেন–এমন তো নয় যে, এই তৃণ-গুল্ম আচ্ছাদিত পরিত্যক্ত এই কুয়োটির কথা তুমি জানতে না, তবু তুমি কী করে এর মধ্যে পড়ে গেলে–কথঞ্চ পতিতাস্যস্মিন্ কুপে বীরুণাবৃতে? তার ওপরেও জরুরি কথাটা হল–তুমি কার মেয়ে? তোমার পরিচয় কী?
কুয়োর মধ্যে পড়ে থেকেও রমণী সগর্বে উত্তর দিল–যিনি সঞ্জীবনী বিদ্যার প্রভাবে দেবতাদের দ্বারা নিহত অসুরদেরও বাঁচিয়ে তুলতে পারেন, আমি সেই অসুরগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা। আমি যে এখনও এই নোংরা মজা কুয়োর মধ্যে পড়ে আছি, তার কারণ আমার এই আকস্মিক বিপন্নতার সংবাদ তার কানে পৌঁছয়নি–তস্য শুক্ৰস্য কন্যাহং স মাং নূনং ন বুধ্যতে। দেবযানী বুদ্ধিমতী এবং বিদগ্ধা। তিনি রাজাকে সেইটুকুমাত্র পরিচয় জানিয়েছেন, যেটুকু না জানালে নয়। এক অপরিচিতা সুন্দরীকে হাত ধরে টেনে তোলার আগে মহারাজ যযাতি সংকুচিত ছিলেন, অতএব আত্মপরিচয় দিয়ে দেবযানী রাজার সংকোচ অপনোদন করলেন মাত্র। কিন্তু কেন, কোথায়, কী হয়েছিল, কেনইবা তিনি কুয়োয় পড়ে গেলেন–এসব কথা তিনি কিছুই বললেন না, অনেক কথা বলে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব লঘু করে দিলেন না যযাতির কাছে। বরঞ্চ কুয়ো থেকে তাড়াতাড়ি উঠে আসার জন্য তিনি তার নিজের রক্তলাল অঙ্গুলিগুলির কথা পুনরুল্লেখ করলেন, কেন না রাজা যযাতি একটু আগেই তার অঙ্গুলিগুলির প্রশংসা করেছেন।
