যাগ-যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতার সঙ্গে রাজাদের এই একাত্মতার প্রয়াস যদি সত্যি হয়, তাহলে রাজার অভিষেকের সময় ধর্ম’ শব্দের প্রয়োগটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় হবে। রাজসিংহাসনে উপবেশন করার আগে নানা যাগ-যজ্ঞের মধ্য দিয়ে রাজার অভিষেক সম্পন্ন করা হত। পাঁচ দিনের অভিষেক মহোৎসবের প্রথম দিনের যজ্ঞে অন্তত আটজন দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হত। রাজার সত্যনিষ্ঠার জন্য সবিতার উদ্দেশে, গার্হস্থ্য জীবনের জন্য অগ্নির উদ্দেশে–এই রকম আরও দেবতা আছেন–তারা কেউ সত্যপ্রসব, কেউ ‘গৃহপতি’ কেউ বা বনস্পতি। কিন্তু সবার শেষে যে দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হয় সেই বরুণ দেবতা কিন্তু ধর্মপতি’। এই ধর্ম শব্দের অর্থ ন্যায়; এই ধর্ম হল রাজদণ্ডের সুষ্ঠু প্রয়োগ। কারণ, বৈদিক দেবতার রাজ্যে বরুণই হলেন ন্যায়দণ্ডের অধিকর্তা। বরুণ তাই ধর্মপতি–বরুণো ধর্মপতীনা। যজ্ঞাহুতির একাত্মতায় রাজাকেও তাই ধর্মপতি হবার চেষ্টা করতে হয়, যে ধর্মের পতি’ হয়ে রাজা আইনের শাসন সূঠিকভাবে চালু করার চেষ্টা করবেন। ঐতিহাসিক রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় The Hindia theory regards Dharma or law, as the real sovereign, and the king as Danda or executive to support and enforce Dharma.
নহুষ যযাতিকে যদি ধার্মিক বলতে হয়, তবে এই অর্থে তাকে ধার্মিক বলতে হবে। নানা যাগ-যজ্ঞ করা অথবা নিত্য-নৈমিত্তিক দেবকার্য বা পিতৃকার্য সম্পন্ন করা–এইসব অর্থে যযাতি যত বড় ধার্মিক, তার থেকেও বেশি ধার্মিক তিনি রাজদণ্ডের পরিচালনায়। তাকে পরাজিত করেন এমন রাজা সোলে ছিলেন না। যাঁরা তাঁর প্রতিকূল ছিলেন, তাঁদের তিনি আপন শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন নিজে অপরাজিত থেকে। পররাষ্ট্রনীতির এই মাহাত্ম্য প্রভাব ফেলেছিল তার অন্তঃরাষ্ট্রীয় শাসনে। যযাতির ব্যক্তিত্ব এবং ভালবাসায় সমস্ত প্রজা তাঁর বশবর্তী হয়েছিল এবং সেই বশবর্তিতার নিরিখেই বলা যাবে যযাতি ধার্মিক রাজা, তিনি ধর্মানুসারে বঙ্কাল প্রজা-পালন করেছিলেন-স শাশ্বতীঃ সমাঃ রাজা প্রজা ধর্মেন পালয়।
যাঁরা ভাবেন–সেকালের রাজাদের জীবন খুব আয়েসে কাটত, তা সর্বার্থে ঠিক নয়। যিনি আদর্শ প্রজারঞ্জক রাজা তার জীবন মন্দাক্রান্তা তালে কাটত না। বরঞ্চ মন্দাক্রান্তা ছন্দের চেয়ে ত্বরিতগতি অথবা শার্দুলবিক্ৰীড়িত ছন্দের উপযোগই সেখানে বেশি। সকালে উঠে বন্দির বন্দনাগানের আয়েসটুকু মিটতে না মিটতেই বিদ্বান-বৃদ্ধ ব্রাহ্মণদের সম্ভাষণ-সৎকার দিয়ে রাজার দিন শুরু হত। তারপর সারাদিনই কাটত নানা ব্যস্ততার মধ্যে। দিনের পর দিন রাজকর্মের ব্যস্ততা রাজাদের এক সময় ক্লান্ত করে তুলত। আরও যেটা বড় সমস্যা রাজাদের নানারকম কর্মমন্ত্রণা এবং মানসিক ব্যস্ততার মধ্যে শারীরিক কায়ক্রেশ যেহেতু খুব কমই ঘটত, তাই শরীরে অস্বস্তিকরভাবে মেদের উপচয় ঘটত।
জীবনের ক্লান্তি এবং শারীরিক অস্বস্তি–এই দুটোই কাটানোর একমাত্র উপায় ছিল শিকারে চলে যাওয়া। বলা বাহুল্য, রাজাদের এই মৃগয়াপর্ব একদিনের মধ্যে সমাধা হত না। মৃগয়া মানেই দেড়/দুমাস বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, বাঘ-সিংহ, বন্য বরাহ এবং হরিণের পেছন পেছন ছোটা। খাওয়া-দাওয়ার সময়-অসময় নেই, নিদ্রার জন্য হস্তিপৃষ্ঠ এবং বৃক্ষশাখার সুব্যবস্থা। এতে শরীর ঝরে যেত দু চার দিনেই। আমাদের শাস্ত্রকারেরা মৃগয়াকে রাজাদের ‘ব্যসন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কারণ এই ব্যাপারটি কখনও কখনও রাজাদের মনে নেশার মতো চেপে বসত। এতে যেমন রাজকার্য নষ্ট হয়, তেমনই ঘটত বৃথা প্রাণিহত্যা। রাজনীতির নীতিনির্ধারকেরা তাই রাজাদের মৃগয়া একদমই পছন্দ করেননি।
কিন্তু নীতি-নিয়র বাঁধন-দণ্ডের মধ্যে আকাশের মুক্তি ছড়িয়ে দেবার মতো মানুষ ছিলেন আমাদের কবিরা। সুপ্রসিদ্ধ চন্দ্রবংশের অন্যতম অধস্তন পুরুষ মহারাজ দুষ্যন্ত যখন মৃগয়ায় যাবেন, তখন মহাকবি কালিদাস নীতিবাগীশদের মৃগয়া সম্বন্ধী প্রবচনগুলি মাথায় রেখে সেনাপতির মুখ দিয়ে গুণ গাইলেন মৃগয়ায়। রাজার বিদূষক মাধব্য দিনরাত রাজবাড়ির আরামে থেকে থেকে এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, সে বিরলে বসে রাজাকে গালাগালি দিচ্ছিল। বলছিল, কী পাল্লাতেই না পড়েছি। এ শিকারী রাজার বন্ধু হয়ে আমার কী ঝামেলাই না হয়েছে।
তার ঝামেলাটা কী আমরা জানি। রাজবাড়ির রাজভোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্য হরিণ শুয়োরের মাংস পুড়িয়ে খেতে হচ্ছে। গাছের পাতা-পড়া এঁদো পুকুরের তিক্ত-কষায় জল পান করতে ধরে। গ্রীষ্মের রোদ্দুরে ঘুমিয়ে পড়ার মতো সুনিবিড় বৃক্ষছায়া পর্যন্ত নেই। দুষ্যন্তের সেনাপতি কিন্তু প্রাণোচ্ছ্বল ব্যক্তি। রাজার সঙ্গে বনেবাদাড়ে ঘুরতে তার বেশ লাগছে। রাজাকে দেখেই সে বলে ওঠে–আহা। কী চেহারা হয়েছে মহারাজের, যেন পাহাড়ি হাতি। অনবরত ধনুকের গুণ টানতে টানতে শরীরের ওপর দিকটা একেবারে পেটা লোহা হয়ে গেছে। রোদে গরমে কোনও কষ্টই হচ্ছে না রাজার। সেনাপতি রাজার বিদুষককে দুয়ো দিয়ে বলে ওঠে–মেদ ঝরে যাওয়ায় মহারাজের শরীরটা কেমন রোগা হয়ে গেছে দেখেছেন, একেবারে ঝরঝরে, যেন এই ডাকলে এই ওঠেন, কোনও আলস্য নেই। দুষ্যন্তের শরীর এবং মনে অসাধারণ উৎসাহ লক্ষ্য করে সেনাপতি শেষ সিদ্ধান্ত দেয়–মৃগয়ার মধ্যে শত শত দোষ খুঁজে শুধুশুধুই লোকে একে ‘ব্যসন’ বলে গালি দেয়, সত্যি সত্যি মৃগয়ার মতো এমন আনন্দ আর আছে নাকি-মিথ্যৰ বাসনং বদতি মৃগয়াশীগ বিনোদ কুতঃ।
