এত সমবয়সী মেয়ের সামনে রাজার মেয়ে হিসেবে এই অপমান মেনে নিতে পারলেন না শর্মিষ্ঠা। এতক্ষণ জলের মধ্যে যার কোনও স্বাতন্ত্র্যবোধ ছিল না, সে জল থেকে উঠেই তার সমবয়সী সখীকে ‘শিষ্যা’ বলে অপমান করবে–এই বড়মানুষী ঢং কোন রাজার মেয়ের সহ্য হয়। অন্তত অনুচরীদের সামনে সম্মান বাঁচানোর জন্যই শর্মিষ্ঠা একেবারে দেবযানীর পিতার নাম তুলে বললেন–বেশি গুরুগিরি দেখাস না বামনী। তোর বাপ নত হয়ে বসে থাকে আমার বাবার সিংহাসনের নীচে–নীচৈঃ বি বিনীতবত। ওতে বসতে তোর বাবা আমার বাবার খিদমদগারি করে–শীন শয়ান পি তে পিতরং। তেীতি বন্দী চর্তিী..। শর্মিষ্ঠা আরও কেটে কেটে বললেন–তুই হলি সেই বাপের মেয়ে, যে বাপ দিনরাত চাটুকারিতা করে, ভিক্ষে চায়, আর দান নেয়—যাচতত্বং হি দুহিতা প্রতিপূঃ। আর আমি হলাম সেই বাপের মেয়ে, যে বাপ স্তুতি করে না, স্তুতি শোনে না; যে দান নেয় না, দান করে—সুতাহং স্তুয়মানস্য দদতো প্রতিগৃহ্নতঃ।
কথাটি সত্য নয় মিথ্যাও নয়। অথবা সত্যও বটে মিথ্যাও বটে। অসুরগুরু শুক্রাচার্য অসুররাজ বৃষপর্বার তত্বাবধানেই থাকেন। তাঁর ভরণ-পোষণের ভার বৃষপর্বার ওপরেই। তিনি অযাচক-বৃত্তি হলেও রাজার অর্থ সম্পত্তি তাঁকে ব্যবহার করতেই হয়। শুক্রাচার্য সোজাসুজি বৃষপর্বার স্তুতি না করলেও দেশের রাজা হিসেবে বৃষপর্বার তদারকি তাঁকে খানিকটা মেনে নিতেই হয়। সমস্ত কিছুর মধ্যে শুক্রাচার্যের অসীম স্বাতন্ত্র্য থাকা সত্ত্বেও বৃষপর্বার রাজ্যশাসনের নিয়ম-কানুন তাঁকে মেনে চলতেই হয়। বৃষপর্বা শুক্রাচার্যকে যত সম্মানই করুন, তাঁর মেয়ে শর্মিষ্ঠা এই ব্রাহ্মণ-গুরুকে যেহেতু রাজোপজীবী এক পুরোহিতমাত্র বলেই জানেন, তই শুক্রাচার্যের মেয়ে দেবযানীর কর্তৃত্ব তিনি সেভাবে মেনে নিতে পারেননি। দেবযানীর প্রতি তাঁর ব্যবহার রাজকীয় মর্যাদা অতিক্রম করে এবদন্ত স্ত্রীসুলভ লঘুতায় পর্যবসিত হয়েছে।
শেষ করার আগে শর্মিষ্ঠা রীতিমত গালাগালি দিয়ে বললেন–ভিখারী মাগী। তুই কপাল কুটেই মর, অথবা মাটিতে গড়াগড়ি দে, তুই আমার অপকারের চেষ্টাই কর অথবা চিরকাল রাগ দেখিয়ে ঘুরে বেড়া–তুই আমার কিছুই হতে পারবি না। তুই বামনী ভিখারী, তোর যাতে অস্ত্রও নেই কোনও। আর আমি হলাম গিয়ে রাজকন্যা এবং তাও সশস্ত্রা। তুই জেনে রাখ, অন্তত আমি তোকে একটুও গ্রাহ্য করি না-ন হি ত্বং গণম্যৎ।
অসুরশক্তির কাছে যুক্তিতর্কের শক্তি খাটে না। দেবযানী নিজের মান্যতা বোঝানোর জন্য অনেক যুক্তি-তর্ক দেখিয়ে বিফল হলেন। শেষে অসুরকন্যা শর্মিষ্ঠার অঙ্গে জড়ানো আপন বসনখানি খুলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন দেবযানী। শর্মিষ্ঠার কোপ গাঢ়তর হল। উদ্যানবাটিকার মধ্যে একটি মজা কুয়ো হিল। কাপড় ধরে টানাটানি করতেই শর্মিষ্ঠা রাগের চোটে এমনই ধাক্কা দিলেন দেবযানীকে যে, তিনি সেই কুয়োর মধ্যে গিয়ে পড়লেন। শর্মিষ্ঠা বুঝেশুনেই দেবযানীকে ধাক্কা দিয়েছেন এবং সেটা এতটাই ইচ্ছাকৃত এবং সুপরিকল্পিত যে, তিনি জানতেন-দেবানী কুয়োয় পড়ে মারা যাবেন।
কুয়ো এতটাই গভীর যে সেখান থেকে একা একা উঠবার কোনও উপায় নেই। অসুরবাড়ির রাজকন্যা যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে মারতে চেয়েছেন, তাকে অন্য কেউ, অন্তত ওই চত্বরের কেউ দয়া দেখিয়ে ওপরে তুলবে না। শর্মিষ্ঠা একবারের তরেও কুয়োয়-পড়া দেবযানীর দিকে ফিরেও তাকালেন না–অনবেক্ষ্য যযৌ বেশ। তিনি এই ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন যে, দেবযানী মারা গেছে–হতেয়মিতি বিজ্ঞায় শর্মিষ্ঠা পাপনিশ্চয়।
.
৩৪.
চৌত্রিশ আগেই বলেছিলাম-মহারাজ নহুষের অনেক পুত্র থাকা সত্ত্বেও যে দুটি পুত্রের সুবাদে তাকে যথার্থ পুত্রবান বলা যায়, সেই দুই পুত্র হলেন, যতি এবং যযাতি। যতি জ্যেষ্ঠ ছিলেন বটে, কিন্তু রাজ্যাকাক্ষী ছিলেন না। তিনি মুনিব্রত গ্রহণ করে বনবাসী হলেন আর পিতার রাজ্যে অভিষিক্ত হলেন যযাতি।
একটি বিশাল রাজ্যের রাজা হওয়ার জন্য যা যা গুণ থাকা দরকার, যযাতির তা ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং সত্যনিষ্ঠ–যযাতি নাহুষশ্চাসীৎ রাজা সত্যপরাক্রমঃ। মনে রাখা দরকার–ধর্ম বলতে যারা ফুল, বেলপাতা, নৈবেদ্য এবং পুরোহিত বোঝেন, সেই অর্থে যযাতিকে ধার্মিক বলা ঠিক হবে না। ধর্ম শব্দটা এখানে খুব বিশদর্থে প্রযোজ্য। বিশেষত সেকালের মনু-কথিত রাজধর্মের নিরিখে ধার্মিক রাজা বলতে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, যথোপযুক্ত দণ্ডদাতা এবং এক প্রজাপালক রাজাকেই নির্দিষ্ট করা যায়। সেকালে যে কোনও রাজার পক্ষে বহুবিধ যাগ-যজ্ঞ করাটা ছিল তাঁর জীবনের অঙ্গ। আধুনিকেরা এগুলিকে একধরনের রাজোচিত বিলাস বলেই মনে করেন। তবে যাগ-যজ্ঞের ব্যাপারটা আদতেই তা নয়।
রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালক হিসাবে রাজা ছিলেন চরম ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু যাগ-যজ্ঞের সময় একদিকে যেমন রাজাকে নিজের অভিমানমঞ্চ থেকে নেমে এসে ব্রাহ্মণের সর্বময় কর্তৃত্ব মেনে নিতে হত, তেমনই অন্যদিকে এই বিশেষ সময়গুলিতে তার পক্ষে দার্শনিকভাবে কিছু উন্নত হওয়ারও সুযোগ আসত অথবা সুযোগ ঘটত নিজেকে চেনার। যজ্ঞস্থলীর অগ্নিকুণ্ডে ক্রমাগত আহুতি দেওয়ার বহিরঙ্গে নিশ্চয়ই কিছু আড়ম্বর আছে, কিন্তু যজ্ঞকার্যের অন্তরঙ্গে যজ্ঞাধিষ্ঠিত দেবতা পুরুষের সঙ্গে একাত্মতাবধের ভাবনা থাকায় রাজা যাগ-যজ্ঞের মাধ্যমে নিজেকে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত করতেন। বৈদিকেরা বলেছেন–দেবতারা যে সত্যি সত্যি দেবতা হয়েছেন, তা এই যাগযজ্ঞ করেই হয়েছেন–তেনোপাবৃত্তেন দেবা অজন্ত, তেনো, এতদভব যদিদং দেবাঃ। অর্থাৎ যাগ-যজ্ঞ করে যজমান ভাবে, ভাবনায়, মানসিক সিদ্ধিতে নিজেকে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা করতেন–যা বৈদিকাশ্য অশরীরা আহুতয়ঃ অমৃতত্বমেব তাভির্যজমানো জয়তি।
