অসুরগুরু শুক্রাচার্যের সঙ্গে অসুররাজ বৃষপর্বার সম্পর্কের অবনতি ঘটল আকস্মিকভাবে এবং তা ঘটল দেবযানীর কারণেই। কেন জানি না, মহাভারতের কবি এই ঘটনার মধ্যেও দেবতাদের ক্রুর অভিসন্ধি লক্ষ্য করেছেন। মহাভারত বলেছে বৃহস্পতির পুত্র কচ দেবলোকে মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা নিয়ে গেলেন এবং তা শেখাতেও লাগলেন দেবতাদের। মন্ত্রলাভ করে দেবতারা ভাবলেন-দানবদের এবার উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। এই ভাবনা রূপায়ণের জন্য দেবরাজ ইন্দ্র নিজে উদ্যোগী হলেন। তিনি ছদ্মবেশে তার শত্ৰুপুরী বৃষপর্বার রাজধানীতে এসে পৌঁছলেন। মহাভারতের কবি বলেছেন-ইন্দ্র হাওয়ার মতো অদৃশ্য হয়েছিলেন-বায়ুভূতঃ। কিন্তু আমাদের ধারণা, এই ‘বায়ুভূত’ শব্দটার মধ্যেই আসল সত্যটা লুকিয়ে আছে। কথাটা খুলে বলি।
অসুর-দানবদের ওপর আক্রমণ হানার আগে ইন্দ্র নাকি বৃষপর্বার গৃহসংলগ্ন বিশাল রাজোদ্যানের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন–রাজার ক্রীড়া সরোবরে অনেক রমণী জলক্রীড়া করছে। ইন্দ্র তখন বায়ুভূত হয়ে সরোবরের তীরে রাখা রমণীদের পরিত্যক্ত বসনগুলি এলোমেলো করে মিশিয়ে দিলেন–বায়ুভূতঃ স বস্ত্রাণি সর্বাণ্যের ব্যমিশ্রয়।
এর পরে যে ঘটনা ঘটবে, হয়তো তাতেই দেবকার্য সিদ্ধ হবে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, বৃহস্পতি-পুত্র কচের কাছে সঞ্জীবনী বিদ্যা শিক্ষা করা এবং দানবদের ওপর আঘাত হানা–এই দুয়ের সঙ্গে বায়ুভূত ইন্দ্রের উপরি উক্ত ক্রিয়ার কোনও সম্পর্কই নেই। এমন কী ঘটনা যা ঘটবে, তার সঙ্গেও সঞ্জীবনী মন্ত্র এবং দেবতাদের যুদ্ধোদ্যোগের কোনও সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে একমাত্র ঘটনা হল, রমণীদের বসনগুলি এলোমেলো হয়ে মিশে যাওয়া। কিন্তু তার জন্য সাধারণভাবে শুধু হাওয়াই যথেষ্ট, দেবরাজ ইন্দ্রের সুরদ্বিপাস্ফালন-কর্কশাঙ্গুলির কোনও ভূমিকাই এখানে নেই। বস্তুত এলোমেলো হাওয়ায় যে বিষম বিপত্তি ঘটল, তাতেই দেবকার্য সিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় মহাভারতের পৌরাণিক এখানে দেবরাজ ইন্দ্রের কারসাজি দেখতে পেয়েছেন। আসল ঘটনা কিন্তু সেই দেবযানীকে নিয়ে। কচের কাছে প্রত্যাখ্যাত দেবযানীকে নিয়ে। কচ যেহেতু স্বর্গে গিয়ে বিদ্যা বিতরণ করতে আরম্ভ করেছিলেন, অতএব নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবেই এখানে ইন্দ্রের বায়ুভূত অভিসন্ধির কথাটা এসেছে। মূল ঘটনা কিন্তু একেবারেই আলাদা।
প্রকৃত যা ঘটেছিল, তা হল–রাজধানীর বিশাল উদ্যানের মধ্যে মেয়েদের স্নান করবার জায়গা, ক্রীড়া-সরোবর। পৌরাণিকদের কথাবার্তা থেকে যা বুঝি, তাতে মনে হয়–সেকালের দিনের যুবতী মেয়েরা অন্তঃপুরের সুরক্ষিত ক্রীড়াসরোবরে স্নান করতে নামার সময় অঙ্গের মূল বসন পরিত্যাগ করেই জলে নামতেন। হয়তো বা কখনও কোনও স্বল্পবাসও ব্যবহার করতেন। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে বস্ত্রহরণ লীলাতেও এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় এবং এ বিশ্বাস নেমে এসেছে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত–
অচ্ছোদ সরসীনীরে রমণী যেদিন/ নামিলা স্নানের তরে…
তীরে শ্বেত শিলাতলে সুনীল বসন
লুটাইছে এক প্রান্তে স্খলিতগৌরব
অনাদৃত…
লুটায় মেখলাখানি যৌন অপমানে;
সেদিন কতগুলি যুবতী রমণী এইভাবেই উদ্যানবাটিকার ক্রীড়া-সরোবরে স্নান করতে নেমেছিল। ক্রীড়ারসের মত্ততায় কেউ অন্যের গায়ের জল ছেটাচ্ছিল, কেউ সাঁতার কাটছিল, কেউ হাবুডুবু খাচ্ছিল, আবার কেউ বা রঙ্গ-রসে নানা কথা বলছিল। স্নানরতা এই রমণীকুলের মধ্যে শুক্ৰদুহিতা দেবযানী যেমন আছেন, তেমনই আছেন দানবরাজ বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠা। দেবযানী এবং শর্মিষ্ঠার বয়স একই রকম। উভয়েই অসাধারণ সুন্দরী। কিন্তু দুজনের স্বভাবে কিছু পার্থক্য আছে। জলক্রীড়া করার সময়, একই জলভাগের অন্তরে দাঁড়িয়ে স্নান করবার সময় সমবয়সী এই দুই রমণীর মধ্যে কোনই বিসম্বাদ চোখে পড়েনি।
জলের শীতলতা, রঙ্গ-কৌতুকের মত্ততা এবং রমণীকুলের যৌবনের সরসতার সঙ্গে আরও যেটা ছিল, সেটা হল উতলা আকুল বাতাস। বাতাসের কাজ বাতাস করেছে। পুষ্করিণীর তীরে রাখা রমণীদের পরিত্যক্ত বসনগুলি বাতাসে এলোমেলো হয়ে একাকার হয়ে গেছে। স্নানকেলি সাঙ্গ হবার পর এত রমণী একই সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে উঠে এল আপন আপন বস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য। উদার আলোরাশির মধ্যে পরস্পর বিলোকনে তারা লজ্জায় অভিভূত হয়ে পড়েছিল। তাড়াতাড়ি বস্ত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে, অপিচ পরম্পর কথা কুহলে অন্যমনস্ক থাকায় অসুররাজ বৃষপর্বার মেয়ে শর্মিষ্ঠা বেখেয়ালে অসুরগুর মেয়ে দেবযানীর কাপড়খানি পরে ফেললেন।
দেবযানী সিক্তদেহে পুষ্করিণী থেকে উঠে এসে নিজের কাপড় খুঁজে পেলেন না এবং কোনওভাবে লজ্জামুক্ত হবার পর তিনি দেখতে পেলেন–শর্মিষ্ঠার গায়ে জড়ানো আছে তারই পূর্বপরিহিত বসনখানি। দেবযানীর মাথায় যেন খুন চেপে গেল। এমনিতেই অসুরগুরুর মেয়ে হওয়ার দরুন তিনি কিছু স্বাতন্ত্র নিয়ে থাকেন, তার মধ্যে কচের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর থেকে তার মেজাজটা একেবারেই ভাল থাকে না। শর্মিষ্ঠার পরিধানে নিজের বসনখানি দেখে দেবযানী ঝাড় দিয়ে বলে উঠলেন–হ্যাঁলা অসুরের ঝি! তোর ভাল হবে না মোটেই। কোনও আচার নেই, বিচার নেই, ভাল-মন্দবোধ নেই। ই আমার শিষ্যের মতো। তুই মাগী অসুরের মেয়ে হয়ে আমার কাপড়টা পরলি কোন বুদ্ধিতে শুনিকস্মা গৃহাসি মে বস্ত্রং শিষ্যা ভূত্ব মোসুরি।
