কবষ ঐলুষের উদাহরণ থেকে আমাদের আরও মনে হয় মন্ত্রদর্শন করা মানে নতুন কবিতার জন্ম–সে কবিতার জন্ম রামায়ণের বাল্মীকিকে ঋষি করেছে। শ্লোক উচ্চারণ করেই বাল্মীকি চমকে উঠেছিলেন–এ আমার মুখ দিয়ে কী বেরল! বাল্মীকি ঋষি হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের ধারণা–রাজর্ষি রথবীতির মহিষী একজন কবি-ঋষিকে তার জামাই হিসেবে চান–যে মন্ত্র দর্শন করেছে, ছন্দোবদ্ধ কবিতা সুন্দরীকে দেখতে পেয়েছে।
মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি কাকে বলে? অধ্যাত্মবাদীরা বলেন–বহু তপস্যার ফলে কোনও জ্ঞানী ব্যক্তি বেদমন্ত্র দর্শনের পুণ্যলাভ করতেন। ঋগবেদে যত মন্ত্র আছে, তা সবই কোনও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের মন্ত্রদর্শনের ফল। তাদের মতে, বেদের মন্ত্র কেউ লেখেনি। অধ্যাত্মবিদ্যার চরম পর্যায়ে আরোহণ করে যারা মন্ত্র দর্শন করেছেন, তারাই ঋষিদর্শনা ঋষয়ে বভূবুঃ! সেই আর্যমন্ত্র শ্রুতিপরম্পরায় নেমে এসেছে আমাদের কাছে।
অধ্যাত্মবাদীদের কথা ঠেলে ফেলে দিয়ে কেউ যদি জড়ভাবেও কথাটা ব্যাখ্যা করেন, তবুও মন্ত্রদর্শনের মূল্যটা কম নয়। অলংকারশাস্ত্র মতে ঋষির এক নাম হল কবি। এঁদের মতে ক্ৰান্তদশী কবি তার গভীর দৃষ্টি আর বর্ণনার ক্ষমতাতেই কবি পদবি লাভ করেন-দর্শনা বর্ণনাচ্চৈব রূঢ়া লোকে কবিক্ৰতিঃ। হাজার হাজার বছর আগে অনেক আধুনিক সভ্যতার পূর্বতনেরা যখন কাঁচা মাংস খাচ্ছেন, তখন ভারতবর্ষে বেদের মতো কবিতার জন্ম হয়েছে। রাজমহিষীর কথার আলংকারিক ব্যাখ্যা করে যদি বলি–যে এখনও বেদের মন্ত্র দর্শন করেনি –নৈব মন্ত্রান্ হি দৃষ্টবান্–অর্থাৎ যে এখনও একখানি বৈদিক কবিতার সৃষ্টি করতে পারেনি, সেই রকম অকবি-অঋষির হাতে আমার মেয়ে দেব না। কবিতা যে লেখে, সেই কবিতার জনক, পিতা। বেদমন্ত্র দর্শন করে যে মানুষ ঋষি হলেন, সেই স্রষ্টা, দ্রষ্টা ঋষিকেই লোকে বেদের পিতা বলে মানে–রাজমহিষীর ভাষায়–ঋষিং মদৃশং বেদপিতরং মন্যতে যত। সেই বেদপিতা ঋষির সম্বন্ধেই একটি কুলবতী কন্যা বেদমাতা হবার সম্মান পায়। অন্তরে বুঝি আশা থাকে–এক মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিপত্নীর গর্ভ থেকেই আরও এক মন্ত্রদ্রষ্টা বেদপিতা ঋষির জন্ম হবে।
রাজা রথবীতি, রাজর্ষি রথবীতি রাজমহিষীর যুক্তি উড়িয়ে দিতে পারেননি। সত্যিও তো কবি, বিদ্বান, মন্ত্রদ্রষ্টা একজন ঋষিকেই তিনি জামাই হিসেবে পেতে চান। শ্যাবাশ্বকে তিনি জানিয়ে দিলেন–সম্ভব নয় বৎস! যিনি মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি নন, তিনি আমার জামাই হতে পারেন না–অনুষির্ণৈব জামাতা কশ্চিদ ভবিতুমহতি।
রথবীতির রাজ্যে তার প্রারব্ধ যজ্ঞক্রিয়া শেষ হয়ে গেল।
মহর্ষি অর্চনানা এবং শ্যাবাশ্ব দুঃখিত মনে আশ্রমে ফিরে যাবার উপক্রম করলেন। কিন্তু শ্যাবাশের মন পড়ে রইল রথবীতির রাজ্যে। সে মন জুড়ে রইল অদৃশ্য রাজকন্যার উপস্থিতি-শ্যাবাশ্বস্য তু কন্যায়াং মনো নৈব ন্যবর্তত। আশ্রমে ফিরে যাবার পথে আরও দুই রাজবাড়ি ঘুরে অনেক ধন-ধান্য, পশু-হিরণ্য দান লাভ করে মহর্ষি অত্রির কাছে ফিরে এলেন অর্চনানা এবং শ্যাবাশ্ব।
কিন্তু শ্যাবাশ্বের মনে কোনও শান্তি নেই। তিনি মন্ত্রদর্শন করে ঋষিপদবি লাভ করেননি বলেই তো আজ রথবীতির মতো যজমানের কাছে প্রত্যাখ্যাত হলেন। মনের দুঃখে তিনি বনবাসী হলেন। অন্তরে বার বার শুধু রাজকন্যার মুখটি জেগে ওঠে আর শ্যাবাশ্ব ধিক্কার দেন। নিজেকে–শুধু মন্ত্রদর্শন করে ঋষি হইনি বলেই না আজ অমন সুন্দরী রাজকন্যার হৃদয় থেকে আমি বঞ্চিতন লব্ধবানহং কন্যাং হন্ত সর্বাঙ্গশোভানা। আহা যদি আমি মন্ত্র দর্শন করতে পারতাম, তাহলে কী সুখই না হত।
প্রেমের এই অদ্ভুত আকৃতি থেকেই শ্যাবাশ্ব মরুক্ষণের সাক্ষাৎ পেলেন অরণ্যের মধ্যে। মরুণের বয়স এবং রূপ শ্যাবাশ্বের মতোই। সে দেবতার বুকে রুপোর বর্ম আঁটা। দিব্যতেজ সমন্বিত মরুগণকে দেখেই শ্যাবাশ্বের মন্ত্রোচ্চারণ আরম্ভ হল। নতুন ঋক মন্ত্র, নতুন কবিতা, মরুদগণের স্তুতি-সূক্ত। শ্যাবাশ্ব ঋষি হলেন অথবা আমাদের মতে কবি হলেন। মন্ত্র দর্শন। করার সঙ্গে সঙ্গে শ্যাবাশ্বের মন ছুটে গেল রথবীতির রাজ্যে–অগচ্ছন্মনসা তদা। ঋষি-কবি সশরীরে উপস্থিত হলেন রাজর্ষি দার্ভ রথবীতির রাজ্যের সীমানায়। দূতীর মাধ্যমে রাজার কাছে ঘোষণা করা হল ঋষিকবির নবীন ঋমন্ত্রোচ্চারণের কথা। রথবীতি সলজ্জে কন্যার হাত। ধরে উপস্থিত হলেন শ্যাবাশ্বের পিতা অর্চনানার কাছে। রাজা কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন–রাগ করবেন না মহর্ষি। একসময় আপনি আমার সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ ঘটানোর কথা নিজমুখে। বলেছিলেন। সেদিন আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। কিন্তু আজকে জেনেছি–ঋষির পুত্র স্বয়ং ঋষি হয়েছেন। আপনি এখন এক মদ্রষ্টা ঋষির পিতা-ঋষেঃ পুত্রঃ স্বয়ম্ঋষিঃ পিসি ভগবন্ ঋষেঃ। আপনি দয়া করে আমার কন্যাকে পুত্রবধূ হিসেবে অঙ্গীকার করুন। তরুণ কবি-ঋষি শ্যাবাশ্বের সঙ্গে এইবার রাজর্ষিকন্যার মিলন সম্পূর্ণ হল।
আমরা বৃহদ্দেবতার এই উপাখ্যানের অবতারণা করলাম শুধু ওই শেষ পংক্তিটির জন্য ঋষেঃ পুঃ স্বয়মঋষিঃ। দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ শুক্রাচার্যের কাছে সঞ্জীবনী মন্ত্র লাভ করেছেন অথচ সে মন্ত্র প্রায় বিফল হয়ে গেল দেবযানীর অভিশাপে। কচ অভিশাপ দিলেন–কোনও ঋষিপুত্র তোমার পাণিগ্রহণ করবেন না। কী নির্মম এই অভিশাপ, অথবা এই অভিশাপের সামাজিক তাৎপর্য কত গভীর, তা খানিকটা বোঝা গেল বৃহদ্দেবতার উপাখ্যানে এবং এই উপাখ্যানেরই উত্তরাধিকার নেমে এসেছে মহাভারতের সমাজে। দেবযানী পরমর্ষি শুক্রাচার্যের কন্যা হয়েও কোনও ঋষিপুত্র বা স্বয়ং কোনও ঋষির পত্নী হবেন না–এই অভিশাপ দেবযানীকে যে কতটা উতলা করে তুলেছে, কতটা বেপরোয়া করে তুলেছে, তা বুঝতে হবে দেবযানীর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়গুলি দেখে।
