রথবীতির কন্যা হয়তো এমনিই এসেছে যজ্ঞগৃহে। কখনও সে যজ্ঞের প্রক্রিয়া দেখে কৌতূহলী হচ্ছে, কখনও কারও সঙ্গে গল্প করছে, কখনও বা অবলীলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যুবক শ্যাবাশ্ব মাঝে মাঝেই তাকে লক্ষ করছেন। যজ্ঞকর্মের নানা কাজের মধ্যেও রাজপুত্রীর দিকে যেমন তার নজর আছে, তেমনই যজ্ঞকর্মের অবসরে তার হাত থেকে তৃষ্ণার জলপাত্র গ্রহণ করার সময়, আহারের পর তাম্বুল গ্রহণের সময় অথবা অন্যত্র কথোপকথনের অলস কোনও মুহূর্তে যুবক শ্যাবাশ্ব রাজপুত্রীকে যতবার দেখেছেন, ততবারই মোহিত হয়েছেন মনে মনে-শ্যাবাশস্য চ তস্যাং বৈ সমাসীদা মনঃ। দিন যায়, রাত যায়, শ্যাবাশ্ব রাজপুত্রীকে দেখেন, মুগ্ধ হন, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারেন না। তবে সমস্ত কিছুর মধ্যে তার সান্ত্বনা রথবীতির পুত্রটি তার পিতা অর্চনানার অনুমোদিতা পাত্রী। অর্থাৎ বিবাহ করতে চাইলে পিতা তাকে না বলবেন না অন্তত।
মনে মনে ছটফট করতে করতে শ্যাবাশ্ব একদিন রাজা রথবীতিকে বলেই ফেললেন মহারাজ! আপনার কন্যাটিকে বিবাহের অনুমতি দিন আমাকে–সংযুজ্যস্ব ময়া রাজ। রাজা রথবীতি এমন কিছু চমকিত হননি। কোথায় কী ঘটছে, তিনি সবই খবর রাখেন। শ্যাবাশ্বের প্রস্তাবে রথবীতির খুব একটা আপত্তি কিছু ছিল না-শ্যাবাশ্বায় সুতাং দিসু। কিন্তু একেবারে শেষ কথা দেওয়ার আগে তিনি রাজমহিষীকে একবার জিজ্ঞাসা করা সঙ্গত মনে করলেন। নারীপ্রগতিবাদীরা বৃহদ্দেবতার এই অংশ শুনে খুশি হবেন কি না জানি না, কিন্তু সেই কালের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সম্বন্ধে যাঁদের ধারণা তত ভাল নয়, তারা অন্তত একটি কথা শুনে স্বস্তি পাবেন যে, রথবীতি রাজমহিষীর যুক্তি-তর্ক মেনে নিয়েছিলেন।
রাজমহিষীকে রাজা বললেন-বুঝলে রানি! এই শাবাশ্ব ছেলেটির হাতেই আমি আমার কন্যা সম্প্রদান করতে চাই। তা তুমি কী বল–কিং তে মতমহং কন্যাং শ্যাবাখায় দদামি হি? রথবীতি বিবাহকার্যের যৌক্তিকতা বোঝাতে চাইলেন পাত্রের যোগ্যতা এবং মর্যাদা দেখিয়ে। রথবীতি বললেন–শ্যাবাশ্ব ছেলেটি ভাল। মহর্ষি অত্রির বংশ বলে কথা। আমাদের জামাই হবার যথেষ্ট সামর্থ্য এই ছেলেটির আছে–অত্রিপুত্রোদুর্বলো হি জামাতা বয়োরিতি।
রাজমহিষী মহর্ষি অত্রির অথবা অত্রিপুত্র অর্চনানার অভিশাপের ভয় করলেন না। রাজার কথাও শুনলেন না। রাজর্ষি রথবীতির মহিষী হবার গৌরবের সঙ্গে নিজের পিতৃগৌরব মিশিয়ে তিনি বললেন-মহারাজ! আমি এক রাজর্ষি-ঘরের মেয়ে-নৃপর্ষিকুলজা হ্যহম্। আমিও এই গৌরব মাথায় নিয়ে তোমায় জানাচ্ছি–এখনও যে ব্রাহ্মণ-যুবক বেদের একটি মন্ত্রবর্ণও দর্শন করেননি, এখনও যিনি ঋষি-পদবাচ্য নন, সেই রকম এক অঋষির হাতে আমি আমার মেয়েকে দিতে পারি না। তাকে জামাই হিসেবেও মন থেকে মেনে নিতে পারি না–নানৃষি-নৌ তু জামাতা নৈষ মন্ত্রান্ হি দৃষ্টবান্। এবার রাজমহিষী তার নিজস্ব যুক্তি দেখিয়ে বললেন–মেয়ের যদি বিয়েই দিতে হয়, তবে তাকে দাও এক ঋষির হাতে। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষির হাতে পড়লে লোকে আমার মেয়েকে বলবে বেদমাতা। যেহেতু মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিকে লোকে বেদপিতা বলেই মান দেয়—ঋষয়ে দিয়তাং কন্যা বেদস্যাম্বা ভবিষ্যতি।
লক্ষণীয় বিষয় হল–রাজমহিষী কোনও ব্রাহ্মনের কথা বলছেন না। তিনি একজন ঋষিকে জামাই হিসেবে দেখতে চান। তিনি ব্রাহ্মণ হবেন, কি ক্ষত্রিয় হবেন–এ সম্বন্ধে তাঁর কোনও বক্তব্য নেই। অনেকের ধারণা আবে–ঋষি মাত্রেই ব্রাহ্মণ। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। হ্যাঁ, একথা অবশ্যই মানতে হবে যে, বৈদিক সমাজে অধিকাংশ ঋষিই ছিলেন ব্রাহ্মণ। কিন্তু বিদ্যা জ্ঞানসম্পন্ন ক্ষত্রিয়রা অনেক ঋষি ছিলেন এবং অনেক ক্ষত্রিয় রাজর্ষিই ছিলেন পরবর্তী কালের অনেক ব্রাহ্মণ ঋষির গুরু। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো–শূদ্র কিংবা জারজ হওয়া সত্বেও বৈদিক সমাজে ঋষিত্ব আটকানো যায়নি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ কবষ ঐলূষ।
সেকালের বৈদিকদের কাছে সরস্বতী নদীর মাহাত্ম্য ছিল সবচেয়ে বেশি। এই সরস্বতী নদীর তীরে একসময় এক বিরাট যজ্ঞের আয়োজন হয়েছিল। সেই পবিত্র যজ্ঞস্থলের মাঝখানে ঐলুষপুত্র কবষকে দেখতে পেয়ে অন্যান্য ঋষিরা বললেন–এ ব্যাটা দাসীপুত্র বেজন্মা কবষ এই যজ্ঞের দীক্ষা পেল কী করে? খুব তো এর সাহস দেখছি। ঋষিরা ঐলুষ কবষকে সেই পবিত্র সোমযোগের স্থান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বললেন-এই চত্বরে যেন না দেখি। এই সরস্বতী নদীর জল পর্যন্ত তুই খাবি না, ছুঁবি না। কবষ ঐ্লুষ এক জলহীন দেশে বিতাড়িত হয়ে পিপাসায় আর্ত হলেন। মনে তাঁর ক্ষোভ–ঋষিরা তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে একত্র বসে পান-ভোজনও করবেন না বলেছেন। এই ক্ষোভ আর আকুতি থেকেই তাঁর জিহ্বায় জন্ম নিল অপূর্ব বৈদিক মন্ত্র। সরস্বতীর ঢেউ-তোলা জল বৈদিক ছন্দে বাঁধা পড়ল কবষ ঐলুষের কণ্ঠে। আর সঙ্গে সঙ্গে সরস্বতী নদীর পবিত্র জলধারা তাঁর চারদিক দিয়ে বইয়ে দিতে লাগল কবষ ঐলুষের মনের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তাল রেখে।
ব্রাহ্মণ ঋষিরা সব দেখলেন। লজ্জায় তাঁদের মাথা নুয়ে গেল। যাঁকে তাঁরা এত হেলাফেলা করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাঁকে পিপাসার্ত হয়ে মেরে ফেলার জন্য জলহীন দেশে তাঁর স্থান নির্দেশ করেছিলেন, সেই কবষ ঐলুষ, তাঁদের ভাষায় জারজ বেজন্মা দাসীপুত্র–সেই কবষ ঐলুষ নদীরূপা সরস্বতী মন্ত্র দর্শন করে তাঁদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণ ঋষিরা সমবেত হয়ে ঐলুষের কাছে এসে ‘ঋষি’ সম্বোধন করে বললেন–প্রণাম ঋষি। রাগ করবেন না আমাদের ওপর অস্তে অস্তু মা নো হিংসী। আমাদের মধ্যে আপনিই শ্রেষ্ঠ, নইলে যে সরস্বতীর জলবাহিন৷ এর থেকে আপনাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেই সরস্বতী আপনারই অনুগমন করছে–ত্বং বৈ নঃ শ্রেষ্ঠোসি যং কেয়মন্ধেতি।
