দেবযানী যাকে প্রিয় ভাবছেন, যাকে সুন্দর দেখে মোহিত হচ্ছেন, সেই প্রিয়ত্ব এবং মোহের সঙ্গে তার কর্মদক্ষতার হিসাবটুকু দেবযানীকে সম্পূর্ণ প্রেমিকার মর্যাদায় উত্তীর্ণ করে না। পরিশেষে কচের কাছে প্রেম নিবেদন করার সময়েও তিনি অন্য এক হিসাবের খাতা খুলে বসেছেন। সোজা কথায় তার ভাবটা দাঁড়ায়–আমি তিনবার তোকে দয়া করে বাঁচিয়েছি, তুই আমাকে বিয়ে করবি না কেন? দেবযানী জানেন না–প্রেমের রাজ্যে প্রাণ-দানের দয়ার চেয়েও মনের সরসতা এবং পারস্পরিক সমতা অনেক বেশি জরুরি। দেবযানী শুক্রাচার্যের আশ্রমে পুনরায় একাকিত্বের অবসরে জীবন কাটাতে লাগলেন বটে, কিন্তু সাময়িকভাবে কচের কাছে প্রেম নিবেদনের দীনতা ছাড়া তার একাকিত্বের সঙ্গী হল তার অহংকার, এবং তার একান্ত স্ব-আরোপিত এক মর্যাদাবোধ-যা একটা মানুষকে নিজের মনের মধ্যে যতই বড় করে তুলুক, তাকে শাস্তি দেয় না। সরসতা দেয় না।
কচ দেবযানীকে অভিশাপ দিয়ে গেছেন–কোনও ঋষিপুত্র তোমার পাণি গ্রহণ করবে না। আপাতদৃষ্টিতে এই অভিশাপের বড় একটা তাৎপর্য নাই থাকতে পারে! আমরা ভাবতেই পারি যে, একজন ঋষির ছেলে অথবা স্বয়ং কোনও ঋষির সঙ্গে বিয়ে না হলে ভারি বয়েই গেল দেবযানীর। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এই সামান্য অভিশাপেরও একটা গভীর সামাজিক তাৎপর্য আছে। না, আমরা একথা বলছি না যে, মহাভারতের যুগে একজন ঋষিকনার সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের বিবাহ হয়নি অথবা একজন ঋষি কোনও ক্ষত্রিয়া রমণীকে কণ্ঠলগ্না করেননি। এ রকম উদাহরণ ভূরি ভূরি আছে এবং সে উদাহরণ বর্ণসঙ্কর্যের ক্ষেত্রেই স্মরণীয়। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে একজন ঋষিকন্যা স্বামী হিসেবে কোনও ঋষিপুত্রের সন্ধান পেলেন না–এটা পিতামাতার পক্ষে কষ্টকর ছিল।
মনে রাখতে হবে–মহাভারতের সমাজ বৈদিক সমাজের উত্তর পর্যায় মাত্র। বৈদিক রীতি-নীতি এবং সামাজিকতা কোনও না কোনওভাবে মহাভারতের সমাজেও অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। সে যুগে ঋষি এবং পুরোহিতেরা শুধু অধ্যাত্ম-বিদ্যার পথ-প্রদর্শকই ছিলেন না, শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার এবং মর্যাদা ছিল সব চাইতে বেশি। ফলে একটি ঋষির ঘরের মেয়েকে যদি অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার ক্ষত্রিয় ঘরে বা বৈশ্য ঘরে বন্ধু হয়ে যেতে হত, তবে সেটা সামাজিকভাবে খুব আদরণীয় হত না। এমনকি ব্রাহ্মণ যদি ক্ষত্রিয়ের ঘরের মেয়েকেও বিয়ে করতে চাইতেন তবে একটি ক্ষত্রিয় পিতা মাতা উদ্বিগ্ন হতেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা যাচাই করে দেখতেন–সেই ব্রাহ্মণের শিক্ষা দীক্ষা মান মর্যাদা কতটা? আরও ভাবতেন রাজার ঘরের মেয়েকে যখন রাজপুত্রের সঙ্গেই বিয়ে দেওয়া গেল না তখন যে ব্রাহ্মণের সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে তার অন্তত বিদ্যাবত্তা এবং পাণ্ডিত্যের মর্যাদাটুকু থাকুক। এই ভাবনা যে কত দৃঢ় প্রোথিত ছিল তা বোঝা যায় বৈদিক দেবতাবিষয়ক সুপ্রাচীন গ্রন্থ বৃহদ্দেবতার একটি কাহিনীর মধ্যে। কোনও ঋষিপুত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে না–কচের এই অভিশাপের তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যাবে মহাভারত পূর্ব এই কাহিনীর মধ্যেই।
.
৩৩.
কচের অভিশাপের মধ্যে আমরা মহাভারতের সমাজের ওপর অব্যবহিত পূর্ববর্তী বৈদিক সমাজের উত্তরাধিকার দেখতে পাব। তার জন্যই বৃহদ্দেবতার একটি উপাখ্যান এখানে উল্লেখ করব।
ঘটনার ‘লোকেশন’ সেই হিমালয়ের উত্তরখণ্ড–রম্যে হিমবতঃ পৃষ্ঠে–যে জায়গাটাকে পর্বে আমরা স্বর্গভূমির আদলে চিহ্নিত করেছি। ঘটনা আরম্ভ হচ্ছে রাজা দার্ভ রথবীতিকে দিয়ে। রথবীতি দার্ভ শুধু রাজা নন, তিনি রাজর্ষি অর্থাৎ রাজাও বটে ঋষিও বটে; হয়তো এক্ষেত্রে রাজার চেয়ে ঋষির গুণ তার মধ্যে বেশি। রথবীতি একটি যজ্ঞ করবেন বলে মহর্ষি অত্রির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। ঋষিকে তার প্রয়োজনের কথা জানিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন রথবীতি দার্ভ। মহর্ষি অত্রি বৃদ্ধ হয়েছেন যথেষ্ট। তাই যজ্ঞকর্মে ঋত্বিকের কার্যভার সমাধা করার জন্য তিনি তার পুত্র অর্চনানাকে নিযুক্ত করলেন। রাজা রথবীতি আত্রেয় অর্চনানাকে ঋত্বিক হিসেবে বরণ করে ফিরে এলেন নিজের রাজ্যে।
আজ থেকে পঞ্চাশ/ষাট বছর আগেও যারা বংশপরম্পরায় পৌরোহিত্যের কাজ করতেন, তারা নান্দীমুখ, কুশণ্ডিকা, অশৌচান্ত শ্রাদ্ধ বা সপিণ্ডকরণের মতো বড় বড় স্মার্ট ক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় সপুত্ৰক যজ্ঞিবাড়িতে উপস্থিত হতেন। নবীন ব্রাহ্মণ এইভাবে পিতৃপুরুষের ধারায় স্মার্ত ক্রিয়াকর্মগুলি নিজে রপ্ত করার চেষ্টা করত আবার পিতাকে সাহায্যও করত। মহর্ষি অর্চনানাও রাজবাড়িতে যাবার সময় আপন পুত্র শ্যাবাশ্বকে নিয়ে গেলেন-স সপুত্রোভ্যগচ্ছত্তং রাজানং যজ্ঞসিদ্ধয়ে। শ্যাবাশ্ব নবীনবয়সী যুবা। পিতার কাছে এতদিন তিনি বেদ-বেদাঙ্গের সম্পূর্ণ পাঠ শিক্ষা করেছেন। এখন রথবীতির যজ্ঞকার্যে পিতার সঙ্গে তিনি রাজাকে যাজন করাতে এসেছেন।
যজ্ঞকার্য আরম্ভ হল। একেকটি যজ্ঞের প্রক্রিয়াতে বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যায়। বাড়িতে দুর্গাপূজা হলে চার/পাঁচ দিনের ওঠাবসায় পুরোহিতের সঙ্গে যেমন সম্পূর্ণ পরিবারের আত্মীয়তা গড়ে ওঠে–তেমনই এক্ষেত্রেও তাই হল। যজ্ঞের বিস্তীর্ণ ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যেই মহর্ষি অর্চনানা একদিন রাজা রথবীতির কন্যাকে বড় কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলেন। মেয়েটিকে দেখে তার বড় ভাল লাগল। যেমন তার রূপ, তেমনই তার প্রকৃতি। মহর্ষি অর্চনানা ভাবলেন– মেয়েটিকে যদি আমার ছেলের বউ করে নিয়ে যেতে পারতাম তবে ভারি ভাল হত–সুষা মে রাজপুত্রী স্যা ইতি তস্য মনোভবৎ।
