কচ দেবযানীর প্রণয়-সূক্তিতে একটুও ভুললেন না। তিনি সেই একই যুক্তি দেখিয়ে বললেন,–যে কাজ করা উচিত নয়, তুমি সেই কাজটাই আমাকে দিয়ে জোর করে করাতে চাইছ। আমি বললাম না–তুমি আমার গুরুর মতো। আর যদি আমি শুক্রাচার্যের সঙ্গে শিষ্য সম্বন্ধটাই বড় করে দেখি, তবে তুমি আমার ভগিনী। কাজেই ওইসব বিয়ে-টিয়ের কথা আর মুখ দিয়ে উচ্চারণও কোরো না-ভগিনী ধর্মততা মে ত্বং মৈবং বোচঃ সুমধ্যমে।
যে সব কথা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘বিদায়-অভিশাপ’ আরম্ভ করেছিলেন, সেইসব কথা মহাভারতে আসছে কচের দ্বিধাহীন প্রত্যাখ্যানের পর। দেবযানীকে খুব খানিকটা ধমকে দেওয়ার পরই যেন কচের মনে হল–সামান্য একটু কৃতজ্ঞতা বোধহয় দেবযানীকে জানানো দরকার। কাজেই সামান্য মধুর এক সমাপনের জন্য একেবারে দায়সারা ভাবে কচ বললেন ভালই ছিলাম, দেবযানী! ভালই ছিলাম এখানে। কোনও দৈন্য, কোনও কষ্ট আমাকে স্পর্শ করেনি–সুখমঘূষিতো ভদ্রে ন মনবিদ্যতে মম। তোমার কাছে যাবার অনুমতি চাই। যাবার পথ যাতে নির্বিঘ্ন হয় সেই মঙ্গলটুকু শুধু তুমি কামনা কর আজ। গুরু শুক্রাচার্য বা আর কারও সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যদি আমার কথা আসে, তবে স্মরণ করো আমাকে স্মর্তব্যোস্মি কথাত্তরে। শুরু শুক্রাচার্য তোমার পিতা, তার পরিচর্যা কোরো যথাসম্ভব।
কচের এই কটি কথার মধ্যে প্রেমের পরিপাটি যতটুকু আছে, তার চেয়ে বেশি আছে সান্ত্বনা। প্রত্যাখ্যানের পরবর্তী মধুর প্রলেপবাক্য। বিশ্বকবি এই কটি কথাকেই কবিতার প্রথমে নিয়ে এসে কচের অন্তরঙ্গতা স্থাপন করেছেন মোহময়ী ব্যঞ্জনায়। অথচ মহাভারতে কচের এই সান্ত্বনা-প্রলেপের বাক্য স্তব্ধ হয়ে গেছে দেবযানীর কঠোর অভিশাপে। দেবযানী বলেছেন–তুমি যখন আমার প্রেম এবং বিবাহের প্রস্তাব এইভাবে প্রত্যাখ্যান করলে, তখন তোমার নবলব্ধ সঞ্জীবনী বিদ্যাও সফল হবে না–ততঃ কচ ন তে বিদ্যা সিদ্ধিমে গমিষ্যতি। কচও এখানে এত মহানুভব নন যে অভিশাপ শুনেও নিঃস্বার্থ সাধুতায় বলে উঠবেন–আমি বর দিনু, দেবী, তুমি সুখী হবে। ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।
মহাভারতের দেবযানীর অভিশাপে ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ হয়ে বৃহস্পতিপুত্র কচ পালটা অভিশাপ উচ্চারণ করেন-তুমি ইচ্ছে করেই আমাকে এমন নিষ্ঠুর অভিশাপ দিলে দেবযানী। আমি তোমাকে ধর্মকথা বলেছিলাম। বলেছিলাম–গুরুপুত্ৰী তুমি, তাই বিয়ে করতে পারব না। অথচ ধর্মের কথা না শুনে শুধু কামে মত্ত হয়ে তুমি আমায় অভিশাপ দিলে। তা শুনে রাখ, আমিও তোমায় অভিশাপ দিচ্ছি–তুমি যা চেয়েছিলে, তা কখনও হবে না। কোনওদিন কোনও ঋষিপুত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে না-ঋষিপুত্রো ন তে কশ্চিজ্জাতু পাণিং গ্রহীষ্যতি। কচ আরও কথা শোনালেন দেবযানীকে। ব্যঙ্গ করে বললেন–খুব তো বললে আমার বিদ্যা ফলবে না। তা কী আসে যায় তাতে? আমি কোনও মৃতের প্রাণ সঞ্চার করতে নাই বা পারলাম। কিন্তু আমি যাকে বিদ্যা শেখাব সে তো আমার হয়ে কাজটা করতে পারবে। তার তো বিদ্যা ফলবে–অধ্যাপয়িষ্যামি তু যং তস্য বিদ্যা ফলিষ্যতি।
অভিশাপ লাভ করে অভিশাপ দিয়ে কচ শেষ পর্যন্ত স্বর্গে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য স্বর্গে বিশাল আয়োজন ছিল। স্বয়ং ইন্দ্র অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কচকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেলেন স্বর্গসভায়। এদিকে প্রত্যাখ্যান লজ্জিতা দেবযানী একাকিনী পড়ে রইলেন শুক্রাচার্যের আশ্রমে। তার সান্ধ্য শিঙ্গারের জন্য কেউ আর ফুল তুলে আনে না। কেউ তার অবসর সময় পূর্ণ করে তোলে না নৃত্য গীতে, বাদিত্রে।
দেবযানীর চরিত্র এখনও আমরা সম্পূর্ণ বুঝতে পারিনি। ঘটনা যতটুকু ঘটেছে তাতে নিঃসন্দেহে এইটুকু বলা চলে যে, দেবযানী মৃদুলা বনলতাটি নন। তার মন অনেক কঠিন ধাতুতে গড়া। মহাভারতের চিত্র থেকে যতটুকু বোঝা যায়, তাতে কচের দিক থেকে প্রেম-ভালবাসার কোনও আভাস আমরা দেখিনি। তিনি সুচতুর অভিনয় করেছেন এবং দেবযানীর জন্য কুসুম-চয়ন থেকে আরম্ভ করে নৃত্য-গীত-দাসত্ব, সবই ছিল এই অভিনয়ের অঙ্গ। দেবযানীকে তুষ্ট করে তিনি শুক্রাচার্যের হৃদয়ে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছেন–”বিদায় অভিশাপ’-এ দেবযানীর এই বাস্তব আক্ষেপটুকুই সত্যি।
অন্যদিকে এও স্বীকার করতে হবে, দেবযানীর ব্যবহারও কিছু কৃত্রিমতা মুক্ত নয়। তিনি যে অসাধারণ সুন্দরী, তিনি যে অসুর-গুরু শুক্রাচার্যের কন্যা এবং সর্বোপরি তিনি যে সকলের চেয়ে আলাদা–এই উদগ্র অনুভূতি দেবযানীর মন সদা-সর্বদা ব্যাপ্ত করে রেখেছিল। মহাভারতের কয়েকটি পংক্তি আমাদের মনে ক্রিয়া করতে থাকে। কচ তার স্বর্গীয় নৃত্যগীত দেখিয়ে দেবযানীর মন মাতানোর সঙ্গে সঙ্গে তার দাসত্বভাব বরণ করেছিলেন–প্রেধনৈশ্চ তোষয়ামাস ভারত। আরও লক্ষণীয়, তৃতীয়বার কচ দানবদের হাতে মারা পড়লে তাকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য যে সমস্ত কারণ দেবযানী দেখিয়েছিলেন, তার মধ্যে কচের জন্য তার প্রণয় এবং প্রিয়ত্ব প্রকাশ পেলেও সে প্রিয়ত্ব সর্বার্থে অহংবর্জিত নয়। প্রেমের মধ্যে প্রণয়ের সঙ্গে যে বিনতি থাকে, যে আত্মনিবেদন থাকে, দেবযানীর ব্যক্তিত্ব তাকে কোনওদিন সেই প্রণয়ের রসভাগিনী করেনি। পিতার কাছে যখন তিনি কচকে বাঁচানোর জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছেন, তখন কচের জন্য তাঁর প্রণয় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আরও যেটা বড় হয়ে উঠেছে সেটা দেবযানীর ভাষায় প্রকাশ করলে দাঁড়ায়–শুধু ব্রহ্মচর্য আর তপশ্চর্যাই নয়, সব ব্যাপারে কচের উৎসাহ ছিল দেখার মতো। আর কাজ করতে বললে সে যেন সদা প্রস্তুত, যেন এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে। কাজের দক্ষতাও তার সেই রকম– সদোখিতঃ কর্মসু চৈব দক্ষঃ।
