দেবযানী এবার খুব সরলভাবে বিদ্যাবংশের কথা তুলে তার নিজের কাছে বৃহস্পতির মান্যতা স্থাপন করছেন। আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও বিদ্যাবংশের একটা গুরুত্ব ছিল পণ্ডিত-সমাজে। ঔরসজাত পুত্র-পরম্পরার থেকে বিদ্যা সম্বন্ধে পরম্পরা-প্রাপ্ত শিষ্যদের মূল্য কিছু কম ছিল না। দেবযানীর পিতা শুক্রাচার্য মহর্ষি অঙ্গিরার শিষ্য। আর দেবগুরু বৃহস্পতি অঙ্গিরার পুত্র। দেবযানী জানালেন–মহর্ষি অঙ্গিরা যেমন আমার পিতার মাননীয়, বৃহস্পতিও তেমনই আমার মাননীয়–যথা মান্যশ্চ, পূজ্যশ্চ মম ভূয়ো বৃহস্পতিঃ। দেবযানী বোঝাতে চাইলেন–ঠিক এই রকম একটা সমীকরণ বুঝে নিলে আমার কথাটাও তোমার শ্রবণযোগ্য হয়ে উঠবে। মহাভারতের মধ্যে ঠিক এই মুহূর্তে যেভাবে দেবযানী নিজের দীনতা প্রকাশ করেছেন তা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়
মনোরথ পুরিয়াছে,
পেয়েছ দুর্লভ বিদ্যা আচার্যের কাছে,
সহস্রবর্ষের তব দুঃসাধ্য সাধনা
সিদ্ধ আজি।
কিন্তু এর পরে রাবীন্দ্রিক দেবযানীর বাচন ভঙ্গিতে যে রমণীয় বিদগ্ধতা আছে–আর কিছু নাহি কি কামনা,/ভেবে দেখ মনে মনে–এই বিদগ্ধতার কোনও লেশও নেই মহাভারতের কবির জবানীতে। সেখানে শুক্রাচার্য আর বৃহস্পতির মান্যতা সমীকরণের সঙ্গে সঙ্গেই দেবযানীর পরিষ্কার ঘোষণা–আজ তোমার বিদ্যালাভ শেষ–স সমাবৃতবিদ্যঃ-কিন্তু যে সব দিনে ব্রত-নিয়মের কঠিন শৃঙ্খলে নিজেকে তুমি বেঁধে রেখেছিলে, সেই সব কঠোর সময়ে আমি তোমার কত সেবা করেছি! সে পরিচর্যার মধ্যে শুধুই কর্তব্যের অনুশাসন ছিল না, ছিল অনুরক্তি, ছিল ভালবাসা। তোমার বিদ্যাশিক্ষা, মন্ত্রলাভ আজ শেষ হয়েছে বটে কিন্তু আমার ভালবাসা তো সেই একই রকম রয়ে গেছে। আর আমি যখন তোমাকে ভালবাসি, তখন তোমারও উচিত আমাকে ভালবাসা। ভালবাসার অঙ্কে হিসাব কষে দুয়ে দুয়ে চার করে দিলেন দেবযানী। তার সিদ্ধান্তও প্রকাশ পেল সঙ্গে সঙ্গে–তাহলে আর দেরি নয়, তুমি বৈদিক বিধি অনুসারে আমার পাণি গ্রহণ করো–গৃহাণ পাণিং বিধিবম মন্ত্ৰপুরস্কৃত।
‘বিদায়-অভিশাপ’-এ বিন্ধা দেবযানীর শত প্রশ্নে, শত তর্ক-যুক্তিজালে কচ একেবারে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছেন। কচের অন্তরে দেবযানীর জন্য যেন গভীর ভালবাসা আছে সেখানে। শুধু তিনি ইন্দ্রের কাছে কথা দিয়েছেন বলেই যেন আজ দেবযানীকে প্রত্যাখ্যান করতে হচ্ছে–এমন একটা ভাব ফুটে ওঠে রাবীন্দ্রিক কচের ভাষণে। আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের নয়, সখী এমন অধরা-ধরা কোনও আবেশ মহাভারতীয় কচের নেই। মহাভারতের কচ-দেবানীর মনের কথা জানেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও জানেন দেবযানীকে ধরে তিনি আপন কার্যোদ্ধার করেছেন মাত্র। এর জন্য তার কৃতজ্ঞতা সামান্য কিছু থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু সংকোচ নেই কোনও। আগে থেকে তিনি দেবযানীর মনের কথা বুঝেছিলেন বলেই তিনি তাড়াতাড়ি শুরুগৃহ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চান। আর যদি বা দেবযানী তাকে শেষ মুহূর্তে ধরেও ফেলেন, তবে তাকে সযত্নে প্ৰত্যাখ্যান কার উত্তর তার সাজানোই আছে। অর্থাৎ মহাভারতের কচও অঙ্ক কষেই রেখেছেন।
দেবযানীর দিক থেকে বিবাহের প্রস্তাব আসতেই মহাভারতের কচ বললেন-তোমার পিতা যেমন আমার পূজনীয় ব্যক্তি, তেমনই তুমিও তাই-তথা ত্বম্ অনবদ্যাঙ্গি পূজনীয়তরা মম। মহাত্মা শুক্রাচার্য নিজের প্রাধের চেয়েও তোমাকে ভালবাসেন, সে কথা জানি। কিন্তু গুরুর কন্যা যেহেতু গুরুত্বৎ মান্যা, তাই বিয়ে করার মতো একটা প্রস্তাব তোমার মুখ দিয়ে না। বেরলেই-ই ভাল,-দেবযানী তথৈব ত্বং নৈবং মাং বন্ধুমহসি। কচের কথায় শাস্ত্রীয় যুক্তি অবশ্যই আছে। এ কথা নিশ্চয়ই ঠিক যে, স্মার্ত পণ্ডিতেরা গুরুপুত্র এবং গুরুপুত্রীদের গুরুর মতই সম্মান করতে বলেছেন। কিন্তু দেবযানী সেই যুক্তির ধারে কাছে গেলেন না। তিনি একেবারে মহর্ষি অঙ্গিরার বিদ্যাবংশ টেনে এনে কচই যে তার আরাধ্যতম ব্যক্তি সে কথা প্রমাণ করে ছাড়লেন।
‘বিদায় অভিশাপে’ কচের ওপরে বারংবার দানবদের আক্রমণ এবং দেবযানীর করুণায় তার পুনরায় জীবন লাভের প্রসঙ্গটি কচ নিজেই কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। স্ত্রীলোকের করুণায় বার বার প্রাণ পাওয়া একটি পুরুষের দিক থেকে এই বিনম্র আচরণই যে সবচেয়ে স্বাভাবিক, রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে তারই আভাস ফুটে ওঠে
ঈর্ষাভরে তিনবার দৈত্যগণ মোরে
করিয়াছে বধ, তুমি দেবী দয়া করে
ফিরায়ে দিয়াছ মোর প্রাণ; সেই কথা
হৃদয়ে জাগায়ে রবে চিরকৃতজ্ঞতা।
এ কথার উত্তরে রবীন্দ্রনাথের দেবযানী দীপ্র হয়ে ওঠেন। তার ভাষা হয়ে ওঠে নিশিত ক্ষুরধার–উপকার যা করেছি হয়ে যাক ছাই। কিন্তু মহাভারতে দেবযানীর করুণালব্ধ জীবনে কচের কৃতজ্ঞতা নেই কোনও। উলটে দেবযানী তির্যক ভঙ্গিতে নিজের উপকারের কথা কচকে স্মরণ করিয়ে দেন, যাতে অন্তত কৃতজ্ঞতার কারণেও কচ তার প্রেমজালে আবদ্ধ হন। দেবযানী বলেন–কচ! অসুররা যখন বার বার তোমাকে মেরে ফেলছিল, তখন বার বার আমি যে পিতার কাছে তোমার প্রাণ ভিক্ষা করে তোমাকে বাঁচিয়ে তুলতে চেয়েছি, তার পেছনে আমার ভালবাসাই ছিল একমাত্র কারণ। আজ কৃতজ্ঞতার কারণেই অন্তত সেই কথাগুলি স্মরণ। করো–তদা প্রভৃতি যা প্রীতিস্তাং মদ্য স্মরস্ব মে–কবির ভাষায় যার অনুবাদ–সুখস্মৃতি নাহি কিছু মনে? গুরু-গুরুপুত্রী, মহর্ষি অঙ্গিরার বিদ্যাবংশের সম্বন্ধ–এই সব কুট তর্কে এখন আর দেবযানী যেতে চান না। দেবযানীর বক্তব্য–অনুরাগ যদি থাকে, তবে বিবাহের পরিণতির জন্য সেই তো যথেষ্ট। ভালবাসার কাঙালকে তুমি এইভাবে ছেড়ে চলে যেতে পার না, কচন মামহসি ধর্মজ্ঞ ত্যংকুং ভক্তামনাগস।
