কচের বিপত্তি এবং শুক্রাচার্যের অভিশাপের ঘটনা বৈদিক যুগের সমসাময়িক কি না অথবা সৌত্ৰামণি যজ্ঞের সঙ্গে শুক্রাচার্যের অভিশাপের বিষয় মিলিয়ে দেওয়া যায় কি না, সেটা খুব বড় কথা নয়। বড় কথা হল, শুক্রাচার্যের অভিশাপের সামাজিক তাৎপর্য। বৈদিক যুগের সৌত্ৰামণি যজ্ঞের মতো এক মহাযজ্ঞে সুরাপানের বিধি থাকায় এক সময় ব্রাহ্মণদের মধ্যে সুরার প্রকোপ নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পায়। হয়তো এই সুরাপানের ফলে কোনও আচার্যস্থানীয় ব্রাহ্মণ-ঋষির মত্ততা দেখা গিয়েছিল এবং তা থেকে কোনও অভাবনীয় দুর্ঘটনাও ঘটে গিয়েছিল। এই রকম ঘটনা যাতে লোক-শিক্ষক ব্রাহ্মণদের মধ্যে না ঘটে সেইখানেই শুক্রাচার্যের অভিশাপের তাৎপর্য। মহাভারতের কবি লিখেছেন-সুরাপানের ফলে মহামতি শুক্রাচার্যের মতো ব্যক্তিত্ব যে রকম কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করে ফেলেছিলেন-সুরাপানা বঞ্চনাং প্রাপ্য বিদ্বান্–সেই রকম প্রমত্ত আচরণ যাতে অন্য কোনও ব্রাহ্মণ-সজ্জন না করেন, সেই হিতৈষণাতেই শুক্রাচার্যের অভিশাপ নেমে এসেছে সুরাপায়ী ব্রাহ্মণের ওপর–তদোশনা বিপ্রহিতং চিকীর্ষঃ/সুরাপানং প্রতি সঞ্জাতমণঃ। বস্তুত ব্রাহ্মণদের সুরাপানমত্ততা নিষেধ করার মধ্যেই শুক্রাচার্যের অভিশাপের তাৎপর্য। সুরামিশ্রিত করে দেহভস্ম পান করে ফেলাটা অনুরূপ কোনও অপেয়-পানের স্মারক উপাখ্যান-মাত্র।
.
৩২.
পূর্বে শুক্রাচার্য তার দানব-শিষ্যদের ওপর খুবই রেগে গিয়েছিলেন। বারংবার কচের ওপর আক্রমণ হতে দেখে ক্রোধাবেশে এক সময় তিনি হুমকি দিয়েছিলেন–দেব-পক্ষে যোগ দেবেন। কিন্তু ক যখন সম্পূর্ণ বেঁচেই উঠলেন, তখন দানবদের ওপর শুক্রাচার্যের আর সেই রাগ রইল না। শুধু একবার তাদের ডেকে বললেন-বাছারা! তোমরা বড়ই মূর্খ। তোমাদের বোকামিতে এই লাভ হল–কচ সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করেছেন। এখন তার ক্ষমতা আমার সমান। তাছাড়া কচ এখন আমার কাছে অনেকদিন থাকবেন–সিদ্ধঃ কচো বৎস্যতি মৎসকাশে। শুক্রের কথা শুনে দানবরা হতচকিত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। হয়তো মেয়ের মুখ চেয়েই শুক্রাচার্য নিজ ভবনে কচের দীর্ঘতর আবাস কল্পনা করেছিলেন। হয়তো বা সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রয়োগ এবং কৌশল আয়ত্ত করার জন্য কচও গুরুগৃহে রয়ে গেলেন আরও বহুদিন। তারপর সময় এল যখন বৃহস্পতির পুত্র কচ শুরু শুক্রাচার্যের কাছে স্বর্গে ফিরে যাবার অনুমতি চাইলেন। কচের ব্যবহারে, গুরু-শুশ্রূষায় তথা মন্ত্র গ্রহণের নিপুণতায় পরম সন্তুষ্ট গুরুদেব তাকে স্বর্গে ফিরে যাবার অনুমতি দিলেন–অনুজ্ঞাতঃ কচো গন্তুমিয়েষ ত্রিদশালয়।
এইবার সবচেয়ে কঠিন কাজটি সারতে হবে কচকে। দেবযানীর কাছে বিদায় নিতে হবে। প্রথমেই স্মরণ করিয়ে দিই, বঙ্গভাষার কবিগুরু যে ভাষায়, যে ভাবধ্বনিতে কচ ও দেবযানীর সংবাদ-সূক্ত রচনা করে বিদায়-অভিশাপ’ উপহার দিয়েছেন, সেই ভাষা, সেই ভাব যদি পাঠকের হৃদয়ে গম্ভীর হয়ে থাকে, তবে মহাভারতে বর্ণিত কচ ও দেবযানীর কথোপকথন। তাদের নিরাশ করবে। কবিগুরু মহাভারত থেকে বিদায়-অভিশাপে’র উপকরণ সংগ্রহ করেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই কাহিনী কবিজনোচিত আত্মীকরণের পর নতুন এক মাত্রা লাভ করেছে। কচ ও দেবযানীর মিলন-বিরহ বঙ্গীয় কবির স্মরণে-মননে-পরিবর্তনে এতটাই মধুর হয়ে উঠেছে যে, সে বুঝি মহাভারতের কবির কল্পনাতেও ছিল না।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মহাভারতের কবি যে সমাজ থেকে কচ আর দেবযানীর চিত্র তুলে এনেছেন, সে সমাজে প্রেমের পথ বড়ই সরল, বড়ই সাধাসিধে। দেবযানীকে একবারও এখানে পরিপুষ্ট শুত্র তনু চিক্কণ পিচ্ছল’ হোমধেনুটির কথা কচকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয় না। মনে করিয়ে দিতে হয় না গ্রাম্যবধূসম’ স্রোতস্বিনী বেণুমতীর কথা। অথবা পর্যায়ক্রমে ‘হোমধেনু’ আর ‘বেণুমতী’র কথা বলেই হঠাৎ করে শুধোতে হয় না নিজের কথা-হায় বন্ধু, এ প্রবাসে/আরো কোনো সহচরী ছিল তব পাশে,/পরগৃহবাসদুঃখ ভুলাবার তরে?’ মহাভারতে বিদ্যাশিক্ষার শেষ দিনে গুরু শুক্রাচার্যের কাছে স্বর্গে ফিরে যাবার অনুমতি লাভ করেই কচ স্বর্গের পথে পা বাড়িয়েছেন। ভূলেও তিনি নির্জন আশ্রমপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দেবযানীর কাছে এসে বলেননি–দেহ আজ্ঞা, দেবযানী, দেবলোকে দাস/করিবে প্রয়াণ।
আসলে, কবিগুরু তার পরিশীলিত রুচিতে দেবযানীর মতো এক অসামান্যা রমণীর এমন দুরবস্থা কল্পনাই করতে পারেন না, যেখানে রমণী স্বয়ং উপচিকা হয়ে প্রায় পলায়নোদ্যত কচকে পাকড়াও করে প্রেম নিবেদন করবেন। মহাভারতের কবির মনে ইউরোপীয় রোমান্সের কোনও জটিলতা না থাকায় তিনি সুন্দরী দেবযানীকে কচের সামনে উপস্থিত করেছেন সোজাসুজি–কোনও ভণিতা না করে মন্ত্রসিদ্ধ কচকে দেখতে পাচ্ছি–তিনি গুরুর অনুমতি নিয়ে–বিসৃষ্টং গুরুশা কম–স্বর্গের দিকে পা বাড়াচ্ছেন। আর ঠিক প্রস্থানোদ্যত অবস্থায়। দেবযানী এসে কচকে ধরে ফেলেছেন-প্ৰস্থিতং তিশাবাসং দেবযান্যব্রবীদিদ। দেবযানীর প্রথম বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ মহাভারতের কবিকেই অনুসরণ করেছেন। দেবযানী বললেন–মহর্ষি অঙ্গিরার পুত্র তুমি। তোমার ব্যবহার, তোর বিদ্যা, তোমার তপস্যা এবং ইন্দ্রিয়-সংযম– সবই তোমার অলংকার–ভ্রাজসে বিদায় চেব তপসা চ দমেন চ।
