কচ বললেন–প্রভু! আপনার কৃপায় আমার স্মৃতিশক্তি এতটুকু নষ্ট হয়নি। সব বলছি। কচ আমূলান্ত সব বললেন-কীভাবে দানবরা তাকে মেরে পুড়িয়ে, গুঁড়ো করে-হত্বা দগ্ধ চয়িত্ব চ কাব্য-সুরার সঙ্গে মিশিয়ে শুক্রাচার্যকে খাইয়ে দিয়েছে–সব বললেন।কচের কথা শুনে, শুক্রাচার্য দেবযানীকে বললেন–কীভাবে তোমার প্রিয় সাধন করব, জানি না মা! আমি যদি মরি তবেই কক্ষ বেঁচে উঠতে পারে–কিং তে প্রিয়ং করবণ্যদ্য বৎসে/বধেন মে জীবিতং স্যাৎ কচস্য। কচকে যদি বাঁচতে হয়, তবে আমার পেট চিরেই তাকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেবযানী পিতার কথায় ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বললেন–কচ যদি মারা যায়, তবে জীবনে আমার সুখ বলতে কিছু থাকবে না, আর তুমি মারা গেলে আমি বেঁচে থাকতেই পারব না।
একদিকে ভালবাসার মৃত্যু, অন্যদিকে পিতার মৃত্যু। যৌবনের সন্ধিলগ্নে দেবযানী যাকে ভালবাসলেন, তিনি যদি মারা যান, তবে দেবযানী মানসিকভাবে সুখ পাবেন না কোনওদিন কচস্য নাশে মম শৰ্ম নাস্তি। আর জম্মদাতা পিতা, যিনি অপার স্নেহে এক মাতৃহারা শিশুকে এত বড় করে তুলেছেন, তিনি যদি দেবযানীর যৌবন-সুখের জন্য মারা যান, তবে দেবযানী নিজের বেঁচে থাকাটা সমর্থন করবেন কী করে–তবোপঘাতে জীবিতুং নাস্মি শক্ত। দেবযানী জানেন–তার পিতা সব পারেন। পিতার তপস্যার শক্তি আছে, তিনি সব পারেন। দেবযানী জানেন–দেবযানীর করুণ ক্রন্দনেই পিতা বিগলিত হয়ে এমন একটা ব্যবস্থা করবেন, যাতে সবারই মঙ্গল হয়।
শুক্রাচার্য মেয়ের মনের অবস্থা সহজেই বুঝেছেন। বুঝেছেন–এক তরুণী-হৃদয় বাঁধা পড়েছে ভালবাসার বাঁধনে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন–কচকে বাঁচাবেন অভিনব এক উপায়ে। কচ তার শত্রুশিবিরের অন্যতম হলেও সে তার তপস্যায়, ব্রহ্মচর্যে এবং সেবায় শুক্রাচার্যকে এতটাই সন্তুষ্ট করতে পেরেছে যে, গুরু তাকে আর অবহেলা করতে পারছেন না। বিশেষত কচ এখন তার গুরুর উদরস্থ হয়ে আছেন; গুরুর ক্ষতি হবে জেনে তিনি নিজে বাঁচবার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি একবারের তরেও। অতএব এই সময়।
শুক্রাচার্য বললেন–তোমার তপস্যায় তুমি সিদ্ধিলাভ করেছ, কচ! তার ওপরে আমার মেয়ে দেবযানী তোমাকে ভালবাসে-যত্ত্বাং ভক্তং ভজতে দেবযানী। অতএব এই সেই উপযুক্ত সময়, তুমি সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ কর–বিদ্যামিমাং প্রাঙ্গুহি জীবনীং ত্ব।
বস্তুত শুক্রাচার্যের জীবন এখন কচের হাতে। মন্ত্র উচ্চারণের পূর্বে শুক্রাচার্য বললেন–তুমি নিজেকে আমার পুত্র বলে মেনে নিয়েছ। অতএব আমার দেহ বিদীর্ণ করে বেরিয়ে আসার পর তুমি সেই সঞ্জীবনী মন্ত্রেই আমাকে আবার বাঁচিয়ে তুলবে-পুত্রো ভূত্ব ভাবয় ভাবিতো মাম/অস্মদ্দেহাদুপনিম্য তাত। গুরুর কাছে বিদ্যা শিখে তুমি বিদ্বান হবে বটে, কিন্তু তাই বলে শিষ্যের ধর্ম যেন বিস্মৃত হয়ো না। আসলে একটাই মাত্র সম্ভাবনা আছে। কচ শুক্রাচার্যের কুক্ষিভেদ করে বেরিয়ে আর শুক্রাচার্যকে না বাঁচিয়ে তুলতে পারেন। তাতেই তো দেবপক্ষের লাভ। সঞ্জীবনী বিদ্যার মন্ত্র কচের মাধ্যমে তাহলে শুধু দেবপক্ষেই থেকে যাবে।
কিন্তু গুরু হিসেবে শুক্রাচার্য যে ধাতুতে গড়া, শিষ্য হিসেবে কচও সেই ধাতুতে গড়া। শুক্রাচার্য তার চরম শত্রুর পুত্রকে শিষ্যত্বে বরণ করে যে উদারতা দেখিয়েছেন, আজ সেই উদারতা ফিরিয়ে দেবার সুযোগ এল। শুক্রাচার্য মন্ত্র উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে কচ বেরিয়ে এলেন গুরুর কুক্ষি ভেদ করে। তিনি দেখলেন–তার গুরু শুক্রাচার্য মাটিতে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন অধ্যাত্ম-জ্ঞানের এক প্রতিমূর্তি ভূমিলগ্ন হয়ে আছে। কচ সঙ্গে সঙ্গে গুরুকে বাঁচিয়ে তুললেন নবলব্ধ সঞ্জীবনী-মন্ত্রে। বেঁচে ওঠা শুক্রাচার্যকে তিনি বললেন–আপনার মতো মানুষ যিনি, যিনি আমার মতো বিদ্যাশূন্য মানুষের কানে বিদ্যার অমৃত মন্ত্র জপ করেছেন, তাকে আমি আমার বাবা-মা–দুইই মনে করি–তং মন্যেহং পিতরং মাতরঞ্চ–আপনার সঙ্গে কোনওভাবেই আমি প্রতিকুল আচরণ করতে পারি না। কারণ, আমি জানি, আপনি আমার কত উপকার করেছেন–তস্মৈ ন দ্রুহ্য কৃতমস্য জান।
শুক্রাচার্যের প্রতিভাশালী শিষ্য ক জীবন ফিরে পেলেন। শুক্রাচার্য যৎপরোনাস্তি খুশি হলেন। মনে মনে নিজের ওপর একটু রাগও হল তাঁর। দানবদের তিনি যতই গালাগালি করুন, তার সুরাপানের অভ্যাসের সুযোগ নিয়েই তো দানবরা এই বিপত্তি ঘটিয়েছে। তাছাড়া তার প্রিয়শিষ্য কচ উদরস্থ অবস্থাতেও তাকে বলেছিলেন–অসুরেরা আমাকে মেরে, পুড়িয়ে আপনার পানীয় সুরার সঙ্গেই আমাকে মিশিয়ে দিয়েছে–অসুরৈঃ সুরায়াং ভবতোস্মি দত্তঃ–আমি কী করে সেই আসুরী মারা অতিক্রম করি? কথাটা শুক্রাচার্যের মনে লেগেছিল। আজ যখন কচ বেঁচে উঠেছেন, তখন সেই আনন্দে শুক্রাচার্য বিধান দিলেন–কোনও অল্পবুদ্ধি বামুন ভুল করেও যদি আজ থেকে মদ খায়, তবে সে ধর্মহীন মহাপাতকী বলে গণ্য হবে–কশ্চিন্ মোহাৎ সুরাং পাস্যতি মন্দবুদ্ধিঃ/অপেতধর্মা ব্ৰহ্মহা চৈব স স্যাৎ।
ব্রাহ্মণদের প্রতি শুক্রাচার্যের এই অভিশাপের সামাজিক তাৎপর্য একটাই। যজ্ঞাদিতে ব্রাহ্মণদের সোম-পানের ব্যবস্থা থাকলেও, সোমরস সুরা নয় বলেই, সেটা কোনও অপরাধ বলে গণ্য হত না। বৈদিক যজ্ঞরাশির মধ্যে একমাত্র সৌভ্রামণি যজ্ঞে সুরার আহুতি এবং সুরাপানের ব্যবস্থা ছিল। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী লিখেছেন–”সৌভ্রামণি যজ্ঞে সুরা দেওয়া হইত; বিধিমতে সন্ধান বা fermentation দ্বারা সুরা প্রস্তুত করিয়া সেই সুরা দেওয়া হইত। এই যজ্ঞের দেবতা ছিলেন অশ্বিদয়, সরস্বতী, আর ইন্দ্র সুত্রামা। অধ্বর্য (যজুর্বেদীয় পুরোহিত) আগুনে দুধ ঢালিয়া দিতেন; তাঁহার সহকারী প্রতিস্থাতা সেই সঙ্গে সুরা ঢালিয়া দিতেন। সুরাহুতির মন্ত্র-যস্তে রসঃ সস্তৃত ওষধিষু, সোমস্য শুষ্মঃ সুরয়া সুতস্য, তেন জিম্ব যজমানং মদেন, সরস্বত্যশিনাবিন্দ্রমগিং স্বাহা’–এই মন্ত্রে সুরাকে স্পষ্টতই সোমস্থানীয় বলা হইয়াছে। কালক্রমে এই যজ্ঞেও সুরাপান অপ্রচলিত হইয়া পড়ে–আপস্তম্ব ব্যবস্থা দিয়াছেন, সুরার পরিবর্তে দুধ চলিবে। দ্বিজাতি-সমাজে–বিশেষত ব্রাহ্মণের পক্ষে সুরাপান নিষিদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। বৃহস্পতির পুত্র কচের হত্যাপরাধে শুক্রের অভিশাপে সুরা অপেয় হইয়াছে, এই পৌরাণিক কাহিনী প্রসিদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল।”
