কচের ফাড়া একবারেই কাটেনি। শুক্রাচার্যও দানবদের কিছু বলেননি। তিনি যেহেতু মন্ত্র জানেন, অতএব দানবদের তিনি তোয়াক্কাও করেন না। তিনি এও চান না–বৃহস্পতির পুত্রকে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপার নিয়ে দানবদের সঙ্গে তার কোনও কথা হোক। তিনি যেমন মেজাজে ছিলেন, তেমন মেজাজেই আছেন। আরও একবার এমন হল–দেবযানী কচকে পাঠিয়েছিলেন বন থেকে ফুল তুলে আনতে। দানবরা তাকে আবার কুচি কুচি করে কেটে সমুদ্রে ফেলে দিল। দেবযানী আবার পিতাকে সব জানাতে, আবারও তিনি কচকে বাঁচিয়ে তুললেন দেবযানীর অনুরোধে। কচ বেঁচে ফিরে যথারীতি সব ঘটনা জানালেন দেবযানীকে।
কিন্তু তৃতীয়বার যেভাবে কচ দানবদের কবলে পড়লেন, তাতে তার পক্ষে বেঁচে ফেরাটাই খুব মুশকিল হয়ে গেল। মহামতি শুক্রাচার্যের একটু সুরাপানের অভ্যাস ছিল। সেকালের ব্রাহ্মণরা সুরাপান সম্বন্ধে ভাল কথা বলতেন না। যজ্ঞে সোমরস পানের ব্যবস্থা অবশ্যই চালু ছিল। কিন্তু সুরার বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য সুবিদিত। কিন্তু শুক্রাচার্যের ব্যাপার অন্য। তিনি ভৃগুবংশীয় ঋষি। যেমন তার তেজ তেমনই তার রাজকীয় সম্মান। বিশেষত তিনি অসুরদের উপাধ্যায়, আচার্য। হয়তো অসুরদের সঙ্গসুখেই তার সুরাপানের অভ্যাস হয়েছিল। দানবরা এই সুযোগটাই নিল। দানবরা এবার কচকে রাস্তা থেকেই তুলে নিয়ে গেল। তারপর তাকে মেরে পুড়িয়ে ফেলল। এতেও তাদের শান্তি হল না। তারা কচের সেই ছাই-ভস্ম সুরার সঙ্গে মিশিয়ে তাদের গুরুকেই খেতে দিল। শুক্রাচার্যও পরমানন্দে, এ বুঝি নতুন স্বাদের কোনও সুরা–এই ভেবে তার পানপাত্র শেষ করলেন–অপিবং সুরয়া সার্ধং কচভস্ম ভৃগদ্বহঃ। কচ তৃতীয়বার মারা গেলেন।
সেদিনও সন্ধ্যাবেলায় আবার সেই একই চিত্র। ব্রাহ্মণ-রাখাল কচ বাড়ি ফিরলেন না। অরক্ষিত গরুর দল নিজেরা পথ চিনে বাড়ি ফিরে এল। দেবযানী ভীত-গ্রস্ত হলেন আগের। মতোই। সন্ধ্যাবেলায় বন্য ফুলের সঞ্চয় হাতে নিয়ে কচের বাড়ি ফেরার কথা। কিন্তু কচ আসেননি। শঙ্কিতা দেবানী পিতার কাছে গিয়ে তৃতীয়বার কেঁদে পড়লেন–কচ ফিরে আসেনি, পিতা! সে গোচারণে গেলে আমি তাকে ফুল নিয়ে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু ফুল নিয়ে সে ফেরেনি, পিতা-পুষ্পহারঃ প্রেষণকৃৎ কচস্তাত ন দৃশ্যতে। নিশ্চয় তাকে কেউ মেরে ফেলেছে, তাকে ছাড়া আমি কেমন করে বাঁচব-তং বিনা ন চ জীবেয়ং কচং সত্যং ব্রবীমিতে।
মেয়ের মনের অবস্থা বুঝে শুক্রাচার্য আবার সঞ্জীবনী মন্ত্রে কচকে আহ্বান করলেন। কিন্তু শুক্রাচার্য এটা বুঝলেন না যে, কচ বাইরে কোথাও নেই; সুরামিশ্রিত তার দেহাবশেষ যে তার নিজেরই উদরস্থ হয়ে আছে, সেটা ধারণা করতে পারলেন না শুক্রাচার্য–জ্ঞাত্বা বহিষ্ঠমজ্ঞাত্বা স্বকুক্ষিস্থং কচং নৃপ। সঞ্জীবনী-মন্ত্রের উচ্চারণ সত্তেও কচ এলেন না দেখে শুক্রাচার্যের ধারণা। হল–কচ মারা গেছেন–কচঃ প্রেতগতিং গতঃ। মেয়েকে তিনি বললেন–কচ বোধহয় সত্যিই মারা গেছে মা! কীই বা করব বল? আমার বিদ্যায় বার বার তাকে আমি বাঁচিয়ে তুলেছি; কিন্তু অসুর-দানবেরা আবার তাকে মেরে ফেলেছে। এ অবস্থায় আমি আর কীই বা করতে পারি–বিদ্যয়া জীবিতো’প্যেবং হন্যতে করবাম কিম?
শুক্রাচার্য দেবযানীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- তুমি আর কেঁদ না মা। মনুষ্য-দেহ চিরন্তন নয়, অতএব মানুষের এই অবস্থা জেনে কচের মতো এক ব্যক্তির জন্য তোমার কান্নাকাটি শোভা পায় না। তাছাড়া অসুর-দানবেরা যেভাবে এর পেছনে লেগেছে, তাতে সত্যিই এই ব্রাহ্মণ-যুবককে বাঁচিয়ে রাখা বোধহয় সম্ভব নয়–অশক্যো’সৌ জীবয়িতুং দ্বিজাতিঃ। দেবযানী বললেন–কী বলছ তুমি, বাবা? বৃদ্ধা মুনি অঙ্গিরা যাঁর পিতামহ, স্বয়ং বৃহস্পতি যাঁর পিতা, সেই কচের জন্য আমি না কেঁদে কেমন করে থাকব-কথং ন শোচেয়ম্ অহং ন রুদ্যাম্। দেবযানী কচের সঙ্গে তাঁর পূর্ব সম্বন্ধের ঘটনাগুলি স্মরণ করলেন। বললেন-কচ আমাদের। জন্য কী করেছে বল? নিয়মিত ব্রহ্মচর্য আর তপস্যার ক্লেশ তো আছেই। এর মধ্যেও তাকে যখন যা বলেছি, সে তা কত দক্ষতার সঙ্গেই না করেছে! মনে রেখ বাবা-কচ যে পথে গেছে, আমারও সেই পথ। আমি কচকে ছাড়া বাঁচতে চাই না। সেই বিদ্বান সুপুরুষ কচকে আমি ভালবাসি–প্রিয়ো হি মে তাত কচোভিরূপঃ।
মেয়ের কষ্ট আর কান্না দেখে শুক্রাচার্য এবার তার দানব শিষ্যদের ওপরেই রেগে উঠলেন। বললেন–অসুর-দানবেরা নিশ্চয় আমার ওপর বিদ্বেষ পোষণ করে। নইলে বার বার কেন তারা আমার নির্দোষ শিষ্যটিকে মেরে ফেলবে–অশংসয়ং মামসুরা দ্বিষন্তি/যে শিষ্যং মে’নাগসং সূদয়ন্তি। তারা যে এইভাবে আমার সঙ্গে প্রতিকূল ব্যবহার করছে, তার ফল তারা নিশ্চয় পা•ে শুক্রাচার্য এখন কচের ব্যাপারে আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বরং যারা তাকে মেরেছে, তাদের শাস্তি দিয়ে এখন তিনি নিজের মনে সান্ত্বনা পেতে চান। দেবযানীকে খানিকটা শান্ত করতে চান। অন্যদিকে অসুর-দানবদের ক্ষতিবৃদ্ধি নিয়ে দেবযানীর কোনও মাথাব্যথা নেই। তিনি করে জীবন চান, নিজে বাঁচার জন্য। দেবযানী বৃহস্পতির পুত্রকে ভালবেসে ফেলেছেন।
দেবযানী কোনও কথাই শুনছেন না দেখে শুক্রাচার্য আবার মন্ত্র পড়ে কচকে আহ্বান করলেন। বিদ্যার প্রভাবে কচ এবার শুক্রাচার্যের উদরের মধ্যেই সঞ্জীবিত হলেন। চৈতন্য লাভ করে তিনি গুরুর কথা শুনতে পেলেন বটে, কিন্তু গুরুর ক্ষতি হবে ভেবে–গুরোহি ভীততা বিদ্যয়া চোপহৃতঃ–তিনি উদরের মধ্যে থেকেই আস্তে আস্তে শুরুর উদ্দেশে বললেন গুরুদেব! প্রণাম। আমি কচ, আপনার উদরের মধ্যে থেকে কথা বলছি। লোকে নিজের পুত্রকে যেমন ভালবাসে, আপনি তেমন করেই আমাকে ভালবেসে ক্ষমা করুন। শুক্রাচার্য বললেন–তুমি কোন পথে আমার পেটের মধ্যে এসে ঢুকলে–তমব্রবীৎ কেন পোপনীতং চোদ্দরে তিষ্ঠসি ব্রহি বিপ্র? শুক্রাচার্য তার দানব-শিষ্যদের চক্রান্ত আশঙ্কা করে কুক্ষিগত কচকে বললেন–তুমি বল সব। এই অসুরদের মেরে আজ আমি দেবপক্ষে যোগ দেব–গচ্ছামি দেবান্ অহমদ বিপ্ন।
