অসুরগুরু শুক্রাচার্য এখন দানবরাজ বৃষপর্বার রাজধানীর কাছেই আশ্রম বেঁধে আছেন–বৃষপর্বাসমীপে হি শক্যো দ্রষ্টুং ত্বয়া দ্বিজঃ। বৃষপর্বার দানব-পরিচারকরা সদা-সর্বদা অসুর শুরুর তত্ত্বাবধান করত এবং সময়ের নিয়মে তারা জেনেও গেল যে, শুক্রাচার্যের নতুন শিষ্যটি আসলে বৃহস্পতির পুত্র কচ। দেবযানীর সঙ্গে ওই যুবকের প্রীতি-সম্বন্ধ তথা শিষ্যের ওপর শুক্রাচার্যের স্নেহ-সম্বন্ধও বৃষপর্বার দানব-সমাজে অপরিচিত নেই। অসুর-গুরুকে তাদের কিছু বলবার সাহস নেই এবং বললেও তিনি শুনবেন না। এখনকার শিক্ষিত-সমাজ যেমন রাজনীতিকদের দয়া-মায়ার ওপর নির্ভর করেন এবং তাদের সুরে সুর মেলান, তখনকার দিনে সেটা তত সুলভ ছিল না। ফলে অসুর-দানবেরা শুক্রাচার্যকে একেবারেই ঘটানোর চেষ্টা করেননি। কিন্তু তাই বলে শত্রুশিবিরের এক প্রধান ব্যক্তির পুত্র তাদেরই গুরুর কাছে সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে তাদেরই বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন–এ জিনিস তারা সইবেন কী করে? তারা তলায় তলায় কচকে মারবার পরিকল্পনা শুরু করে দিলেন।
শুক্রাচার্যের আশ্রমে কচের নিত্যদিনের অনেক কাজের মধ্যে একটি কাজ ছিল গুরুর হোমধেনুটিকে চরাতে নিয়ে যাওয়া। সেকালের গ্রামপ্রান্তে পশুদের তৃণক্ষেত্র থাকত। অন্যান্য দিনের মতো কচ সেইখানেই গরু নিয়ে গেছেন। হোমধেনুর সঙ্গে অন্য গরুগুলিও একসঙ্গে তৃণভোজনে ব্যাপৃত হলে কচ এক জায়গায় বসলেন। তারপর আবার উঠলেন। গুরু শুক্রাচার্যের হোম-যজ্ঞের জন্য সমি-কাঠ কুড়িয়ে জড়ো করলেন। কুশ কেটে গোছ বেঁধে নিলেন। চয়ন করলেন বন্য ফুল। সব এক জায়গায় পুটুলিতে বেঁধে তিনি আবার গিয়ে বসলেন। বটগাছের তলায়। হয়তো তার মনে সঞ্জীবনী মন্ত্রলাভের চিন্তা গম্ভীর হল, হয়তো বা উদাসী হাওয়ায় মনে পড়ল দেবযানীর কথা।
বৃষপর্বার দানব-পরিচারকরা কয়েকদিন ধরে কচের গতিবিধি নিপুণভাবে লক্ষ্য রেখে আজকে গোচারণ ক্ষেত্রে এসে পৌঁছল। তার সঙ্গে কিছু কথা আছে–এই বাহানায় দানবরা তাকে ডেকে নিয়ে গেল বনের একান্তে–গা রক্ষন্তং বনে দৃষ্টা রহস্যেনমমর্ষিতাঃ। কচের গোষ্ঠ-বিহার সুখের হল না। দানবরা তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল। শুধু তাই নয়, তার দেহাবশেষ অস্থি-চিহ্ন দেখে যাতে তার মরণ-সূত্র আবিষ্কার করা না যায়, সেই জন্য তার শরীরের টুকরোগুলি শিকারী কুকুরদের খাইয়ে দিল–হত্বা শালাবৃকেভ্যশ্চ প্রাযচ্ছবশঃ কৃতম্। এর পেছনে তাদের চিন্তা একটাই–বৃহস্পতি দানবদের বার বার ঠকিয়েছেন, অতএব তিনি তাদের শত্রু। বৃহস্পতি বা তার সমর্থিত দৈবপক্ষ যাতে কোনওভাবেই সঞ্জীবনী-বিদ্যা না শিখতে পারে, সেইজন্যেই তারা গোপনে কচকে হত্যা করলেন–জয়ুবৃহস্পতেঘেঁষা বিদ্যারক্ষার্থমেব চ।
বনভূমি আরক্ত করে সেদিনও সূর্য অস্ত গেল। শুক্ৰাশ্রমের গরুগুলি পর্যাপ্ত তৃণ ভোজন করে অনেক শুয়ে থাকল, অনেক জাবর কাটল, অনেক ইতি-উতি চাইল।কচকে তারা দেখতে পেল না। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসবার আগেই পুরাতন অভ্যাসে গরুগুলি আশ্রমে ফিরে এল। অনেকক্ষণ পর এই ফেরার পথেই দেবযানীর সঙ্গে কচের দেখা হয়। সেদিনও তিনি অধীর আগ্রহে বসে আছেন পথ চেয়ে। কিন্তু কচ ফিরলেন না। রাখাল-বালককে কোথায় ফেলে রেখে গরুগুলি ফিরে এল। দেবযানী প্রমাদ গণলেন। এমন তো হবার কথা নয়।
চকিতের মধ্যে দেবযানী শুক্রাচার্যের কাছে গেলেন। বললেন–বাবা! তোমার সায়ন্তন হোম তো শেষ হয়ে গেল। সূর্য অস্ত গেছে কতক্ষণ, আশ্রমের গরুগুলিও ফিরে এল সব। কিন্তু কই, কচকে তো দেখছি না–কচস্তাত ন দৃশ্যতে। এতকাল দানব-সমাজের কাছাকাছি থেকে তিনি যে দানবদের স্বভাব আঁচ করতে পারেন না, তা মোটেই নয়। দেবযানী বললেন–নিশ্চয়ই কেউ তাকে মেরে ফেলেছে, বাবা! অথবা এমন কোনও কারণ ঘটেছে, যাতে নিজেই সে মারা পড়েছে। দেবযানী কেঁদে বললেন-বাবা! যা কিছুই হোক। কচের যদি এমন-সেমন কিছু হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে, সত্যি বলছি বাবা! আমি কিন্তু বাঁচব না-তং বিনা ন চ জীবেয়ম ইতি সত্যং ব্রবীমি তে।
শুক্রাচার্য খুব বেশি বিচলিত হলেন না। তিনি সঞ্জীবনী-বিদ্যা জানেন। তার শুধু কষ্ট হল মেয়েকে দেখে। জন্মলগ্ন থেকে মায়ের স্নেহ-বঞ্চিতা এই মেয়েটির এতটুকু কষ্টও তিনি সহ্য করতে পারেন না। দেবযানী যেন সেই ছোট্ট আদরের মেয়েটি। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে শুক্রাচার্য বললেন–তা ধর–কচ যদি কোনওভাবে মরেই গিয়ে থাকে, তাতেই বা ভয় কী মা! এই আমি এক্ষুনি সঞ্জীবনী মন্ত্র পড়ে জল ছিটিয়ে বলব–কচ এদিকে এস তো, আর অমনি সে বেঁচে উঠবে–এহেহি ইতি সংশব্দ্য মৃতং সঞ্জীবয়াম্যহম্।
মেয়ের অবস্থা দেখে শুক্রাচার্য আর দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে মৃত-সঞ্জীবনী মন্ত্র পড়ে ডাকলেন কচকে। আর অমনি পৌরাণিক কালের সমস্ত অলৌকিকতা নিয়ে কচের কর্তিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কুকুরের পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সম্পূর্ণ কচের রূপ নিয়ে। কচকে বেশ হাসি-খুশি দেখাচ্ছিল। শুক্রাচার্য হয়তো একবারের তরে আদরিণী কন্যার দিকে প্রশ্রয়ের চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিলেন, আর দেবযানী সেই মুহূর্তেই অন্য দিকে কচের মুখের পানে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন–তুমি এত দেরি করলে কেন, কচ! তুমি জান আমি কত ভাবছি–কস্মাচ্চিরায়িতো সীতি পৃষ্টামাহ ভার্গবী। কচ বললেন–ভাবিনী আমার! আমি গুরুদেবের জন্য সমি-কুশ কাষ্ঠভার বেঁধে নিয়ে কেবল বটের ছায়ায় গিয়ে বসেছি। বড় ক্লান্তও লাগছিল। আমাকে বসতে দেখে আশ্রমের গরুগুলিও ছায়ার লোভে আমার আশেপাশে এসে বসল। এমন সময় কতগুলি অসুর এসে আমায় জিজ্ঞাসা করল–তুমি কে বটে? তোমার নাম কী? আমি বললাম আমি বৃহস্পতির পুত্র। লোকে আমাকে কচ বলে ডাকে। যেই না বলা, অমনি আমায় ওরা মেরে ফেলল। তারপর গুরুদেব আমাকে সঞ্জীবনী-মন্ত্রে ডাকলেন, আর আমি কোনওমতে বেঁচে তোমার সামনে এসে দাঁড়াতে পেরেছি–ত্বৎসমীপমিহায়াতঃ কঞ্চিৎ প্রাপ্তজীবিতঃ।
