আমরা এত কথা বললাম এই কারণে, যে বৃহস্পতির পুত্র কচ গুরুগৃহে এসে শুধু আশ্রমের বিধি-নিয়মে আবদ্ধ হলেন না। তার সঙ্গে আরও কিছু উদবৃত্ত কাজ তার জুটে গেল। স্বর্গভূমি থেকে আসবার সময় দেবরাজ ইন্দ্র বলে দিয়েছিলেন-শুক্ৰসুতা দেবযানীকে তুষ্ট করলে শুক্রাচার্যের মন পাওয়া সহজ হবে। আর ঠিক সেই কারণেই বৃহস্পতির পুত্র কচ শুক্রাচার্যের মনস্তুষ্টির জন্য যেমন চেষ্টা করতে লাগলেন, ঠিক তেমনই চেষ্টা করতে লাগলেন দেবযানীর মন পাওয়ার জন্য–আরাধয়নুপাধ্যায়ং দেবযানীঞ্চ ভারত।
.
৩১.
মহাভারতের কবি এক নিঃশ্বাসে বলে দিলেন–গুরু এবং গুরুপুত্রী দুজনের তৃপ্তির জন্যই কচ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এ তো এক বিপরীত সাধন। শুক্রাচার্য যাতে খুশি হবেন সুন্দরী দেবযানী নিশ্চয়ই তাতে খুশি হবেন না। আবার যে ভাবে, যে কাজে দেবযানীর খুশি হওয়ার কথা, শুক্রাচার্য নিশ্চয়ই তাতে খুশি হবেন না। কচের সাধন তাই দুই রকম। একদিকে তিনি ব্রত-নিয়ম-ব্রহ্মচর্যে মুনিব্রত গ্রহণ করেছেন, যাতে গুরু শুক্রাচার্য তুষ্ট হন। অন্যদিকে এক যৌবনবতী সুন্দরীর হৃদয় হরণের জন্য এক উত্তাল যুবক যা করে কচ তাই করছেন। মহাভারতের কবিকে তাই একই পংক্তিতে ‘যুবা’ এবং মুনি’ শব্দটি আলাদা করে করে বিশেষণ হিসেবে উল্লেখ করতে হয়েছে–নিত্যমারাধয়িষ্যংস্তং যুবা যৌবনগাং মুনিঃ। শুক্রাচার্যের মন পাবার জন্য তিনি মুনি, যৌবনবতীর মন পাবার জন্য তিনি যুবা। তবে এই মুহূর্তেই স্মরণ করতে হবে যে, অসুরগুরু শুক্রাচার্যের উপাসনার থেকেও দেবযানীর মন পাবার তাড়না কচের কাছে বেশি জরুরি ছিল। ফলে ব্রতধারী মুনির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসত সেই যুবা, যাঁকে প্রাতঃকালের গুরু-শুশ্রূষার অন্তে এক যৌবনবতী প্রশ্ন করত।
বন্ধু আমার! তুমি না স্বর্গে ছিলে একদিন? স্বর্গসুন্দরী অপ্সরা আর নৃত্য-কুশল গন্ধর্বদের নৃত্য-গীত কতবার তুমি দেখেছ, শুনেছ। আজ এই ঋষির আশ্রমে তুমি নন্দনের গন্ধবহ। তুমি কি স্মরণ করতে পার–সেই নৃত্য-গীত বাদিত্রের ধ্বনি?
যুবা বলে–পারি। শুধু স্মরণ কেন, তুমি চাইলে সেই নন্দনের নৃত্য কিছু দেখাতেও পারি তোমাকে, শোনাতে পারি ইন্দ্রসভায় গাওয়া কোনও গান।
যুবতী বলে–তবে দেখাও সেই মনোমোহন নৃত্য, গাও সেই গান। বৃহস্পতি-পুত্র কচ গুরু শুক্রাচার্যের করণীয় যজ্ঞকর্মের সমস্ত আয়োজন সেরে রেখে নৃত্য-গীতে মেতে ওঠেন দেবযানীর সামনে। সস্মিত মুখে ভুজ-বিলাস আর কঠিন পাদন্যাসে ফুটে ওঠে সুর-নৃত্যের ছন্দ-লয়-তাল–গায়ন নৃত্য বাদয়ংশ্চ দেবযানীমতেষয়ৎ। দেবযানীর ভাল লাগে। বৃহস্পতিপুত্রের মেদবর্জিত শরীরে নৃত্যের নানা বিভঙ্গ নবীনা দেবযানীকে কেমন মোহগ্রস্ত করে তোলে। তিনি ভাল করে বোঝন না–মনের মধ্যে এ কীসের আলোড়ন, রমণী-শরীরে এ কীসের শিহরণ!
কচের প্রাণশক্তি অফুরন্ত। নৃত্য-গীতের পরিশ্রমে তার ক্লান্তি নেই। গুরুসেবার অনন্ত কর্মের মধ্যে তার আরও কিছু নিত্যকর্ম আছে। পূজার ফুল তুলতে গেলে দেবতার জন্য যতগুলি তুলতে হয়, তার চেয়ে বেশি ফুল তুলতে হয় দেবযানীর জন্য। তার কেশবন্ধে পুষ্পের অলংকরণ রচনা করা এখন কচের অন্যতম কাজ। দেবযানীর নিত্য-নতুন বায়না এবং ফরমাশের অন্ত নেই কোনও। বনের পথ চলতে চলতে কখনও এই যুবতী গাছের ফল কুড়িয়ে আনতে বলবে, কখন সেই পথ-সখার অঞ্জলিবদ্ধ কুসুমোচ্চয়ে শিঙার করতে বসবে, আর কখন বা প্রভুর মতো যথেচ্ছ আদেশে কচকে উচ্চকিত, তটস্থ করে তুলবে, তার কোনও ঠিক নেই। কচ সব করেন, দেবযানীর চোখের ইঙ্গিতে তিনি সব কাজ বুঝে নেন। কারণে অকারণে ফুল-ফল কুড়িয়ে আনাই শুধু নয়, আজ্ঞাপেক্ষী দাসের মতো তিনি সদা-সর্বদা দেবযানীর পাশে আছেন–পুষ্পেঃ ফলৈঃ প্রেষণেশ্চ তোষোমাস ভারত।
দেবযানীর জন্য কচের এই অফুরান প্রাণশক্তি বৃথা ব্যয়িত হয় না। তার অল্প-বয়সের কিশোরী-মনে শিহরণ জাগে। তিনি ভাবেন—শুধু তুষ্ট করা নয়। নিশ্চয়ই এই অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যে সরসতা আছে, নইলে কেন, কেন এই সদ্যোযুবক শুক্রাচার্যের পাঠশালার কারাগৃহ থেকে বার বার তার কাছে পালিয়ে আসে। দিনান্তের সূর্য যখন বনভূমি আরক্ত করে তোলে তখন এই ক্লান্ত শ্রান্ত যুবককে দেখে তার মায়া হয়! সেই কোন সুদূরের স্বর্গ থেকে এখানে এসে কচ শুধুই মন্ত্রলাভের জন্য তার দাসত্ব বরণ করেছেন–এ কথা দেবযানীর বিশ্বাস হয় না। তার ধারণা কচ তাকে ভালবাসেন। ফলে সেই আরক্ত সন্ধ্যাবেলায় দেবযানী যখন নির্জন বনভূমিতে উদাস মনে বসে থাকেন, তখন গুরুগৃহে কর্মরত কচের জন্য তার মন কেমন করে। কচের উদ্দেশে তিনি কাছে আসার ডাক পাঠান গানের সুরে-গায়ন্তী চ ললন্তী চ রহঃ পৰ্য্যচরত্তথা।
গুরুগৃহের কাজ ফেলে কচ ছুটে আসেন দেবযানীর কাছে। দেবযানী আঁচল দিয়ে তার কপালের ঘাম মুছিয়ে দেন। মধুর কথায় অপনোদন করেন পরগৃহবাসের ক্লান্তি। দেবযানীর তাড়নায় কচকে যে নাচতে হয়, গাইতে হয়, কুড়িয়ে আনতে হয় ফল-ফুল-সেই সব পরিশ্রম আর কৃত্রিমতা লঘু হয়ে যায় দেবযানীর সহজ সরল চাওয়ায়, রমণীর নির্জন পরিচার-সুখে রহঃ পর্যচরত্তদা। দিন যায়। রাত যায়। দেবযানী আর কচের মধ্যে সাহচর্য ঘনীভূত হয়।
