দেবতারা যে যে উপায়ে কচকে দেবযানীর হৃদয় হরণ করতে বলেছিলেন, তার মধ্যে একটি সাংঘাতিক কথা ছিল। সেটা হল–ইন্দ্রিয়সংযম–আচারেণ দমেন চ। তারা বুঝেছিলেন –দেবযানী যেমন সুন্দরী এবং পিতার প্রশ্রয় পাওয়া মেয়ে, তাতে কচ যদি দেবযানীকে বিমোহিত করতে গিয়ে নিজেই বিমোহিত হয়ে যান, তবে আর সঞ্জীবনী বিদ্যা কোনওদিন দেবলোকে আসবে না। তাই দাক্ষিণ্য অথবা মাধুর্যের মতো মনভোলানো গুণের সঙ্গে দেবতাদের সাবধান বাণী উচ্চারণ করতে হল–আচারেণ দমেন চ।
বৃহস্পতি-সুত কচ দেবতাদের কথা শুনে তাদের আশ্বস্ত করলেন। অবিলম্বে এসে পৌঁছলেন দানবরাজ বৃষপর্বার রাজ্যে, শুক্রাচার্যের আশ্রমে। কচ শুক্রাচার্যের সামনে আভূমি প্রণত হয়ে বললেন–আচাৰ্য। আমার নাম কচ। আমি দেবশুরু বৃহস্পতির পুত্র, মহর্ষি অঙ্গিরার নাতি। আমি আপনার শিষ্য হতে চাই, আপনি দয়া করে আমাকে আপনার শিষ্য হওয়ার সম্মান দান করুন-নামা কচমিতি খ্যাতং শিষ্যং গৃহ্নাতু মাং ভবান্। কচ অঙ্গীকার করলেন–আমি আপনার শিষ্য হবার জন্য হাজার বছর ব্রহ্মচর্য পালন করতে রাজি আছি–ব্রহ্মচর্যং চরিষ্যামি ত্বয়্যহংপরমং গুরৌ।
কচ বৃহস্পতির পুত্র হলেও তার মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ এবং বিনয়ের ভাব দেখে শুক্রাচার্য খুশি হলেন। এরপরে যে ভাষা এবং যে শব্দে তিনি শত্রুসুতকে নিজগৃহে আমন্ত্রণ জানালেন, তা আজকের মাস্টারমশাইদের একটু খেয়াল করা দরকার। শুক্রাচার্য বললেন–আমার বাড়িতে তোমার শুভাগমন হোক। তুমি ব্রহ্মচর্যের অঙ্গীকারে আমাকে যেহেতু গুরু বলে মেনে। নিয়েছ, আমিও তোমাকে শিষ্য হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছিকচ সুস্বাগতং তে’স্তু প্রতিগৃহ্নামি তে বচঃ। আজকের দিনে যাঁরা ভাবেন-সেকালের দিনে গুরুগৃহে ছাত্রদের জন’ খাটতে হত, তাদের কোনও সম্মান ছিল না এবং ছাত্ররা ছিলেন গুরুর নিপীড়ন-অত্যাচারের শিকার, তাদের জানাই–আরুণি-উদ্দালকের উপাখ্যান গুরুভক্তির পারম্য খ্যাপনের জন্যই, গুরুর অত্যাচারের কোনও তাৎপর্য নেই সেখানে। কিন্তু একজন ভাল ছাত্রকে কতটা খাতির করতে হয় তার পরিষ্কার প্রমাণ পাবেন শুক্রাচার্যের উত্তরে। তিনি বললেন–কচ! আমি তোমার অনুরোধ মেনে নিচ্ছি এই কারণে যে, তুমি শিষ্য হিসেবে আমার আরাধনীয়। আমি এক অৰ্চনীয় ব্যক্তিকে আরাধনা করছি, তাতে তুমিও যেমন অর্চিত বোধ করবে, তেমনই অর্চিত হোন তোমার পিতা বৃহস্পতি–অৰ্চয়িষ্যেহম্ অর্চং মর্চিতো’স্তু বৃহস্পতিঃ।
এ ব্যাপারটা সেকালে ছিল। শত্রুপক্ষ হওয়া সত্ত্বেও শুক্রাচার্যের কাছে শিক্ষার্থী হয়ে আসতে কচের কোনও অসুবিধে হয়নি। অনুরূপভাবে শুক্রেরও কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব হয়নি শত্রুপক্ষের কাউকে শিষ্যত্বে বরণ করতে। এমনকি যিনি চরম শত্রু সেই বৃহস্পতির বিদ্যাবত্তা সম্বন্ধে শুক্রাচার্যের মনে যথেষ্ট সম্মানবোধ আছে বলেই তার এই অসাধারণ প্রতিক্রিয়া–তোমাকে শিষ্য হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে আমি শুধু তোমাকেই সম্মান দিচ্ছি না, তোমার পিতা বৃহস্পতিরও মর্যাদা রাখছি-অর্চিতো’স্তু বৃহস্পতিঃ।
আজকের দিনে নানান বিশ্ববিদ্যালয়ে কতগুলি অপগণ্ড শিক্ষক দেখি–যাঁদের বিদ্যাবত্তা নেই বললেই চলে, কিন্তু ঢঙ আছে ষোলো আনা। এঁরা আবার গবেষণা করান। কাজ আরম্ভ হলে দেখা যায়–এঁর কাছে নাম লেখালে অন্য কেউ আর সাহায্য করতে চান না। আবার ওঁর কাছে নাম লেখালে ইনি কোনও সাহায্য করতে চান না। রাজনৈতিক কারণে দু’জনে দু’জনের মুখ দেখেন না। ছাত্র-গবেষক নিজের দলের লোক না হলে অথবা শত্রুপক্ষীয় শিক্ষকের ছন্দানুবর্তী হলে, তার আর রক্ষা নেই। সে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়, তবে একেকটি পরীক্ষাপত্রের একার্ধে সে আটত্রিশ পেলেও অন্যার্ধে পনেরো পাবে। আর সে যদি গবেষক হয়, তবে বাইরে যেখানে তার গবেষণাপত্র গিয়ে পৌঁছল, সেখান পর্যন্ত ইনি ছুটবেন বা অন্যকে ছোটাবেন। ফল অবশ্যম্ভাবী।
রাজ্যের ঊর্ধ্বতম শিক্ষাক্ষেত্রে এই নৈরাজ্যের মধ্যে মহাভারতে দেখা গুরুশিষ্যের এই মহান চিত্রটুকু আমাদের কাছে নানা কারণেই মূল্যবান। শুক্রাচার্যের আশ্রমের সমস্ত বিধি-নিয়ম বৃহস্পতির পুত্র কচ দু’দিনেই রপ্ত করে নিলেন। গুরুগৃহের বিধি-নিয়ম তো মানতেই হয়, সেই সঙ্গে মানতে হয় আরও কিছু যা আজকের অর্থকরী ভাষায় বলে অত্যাচার। এই তথাকথিত অত্যাচার আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও এ দেশে ছিল, তবে সেটা আপনি কীভাবে দেখছেন, তার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। আমার শিক্ষক-পিতার গৃহে আত্মীয়-অনাত্মীয় অনেক ছাত্রই থাকতেন এবং খেতেন। খাবার-দাবার আমার পিতার জন্য যা বরাদ্দ ছিল, ছাত্র এবং পুত্রদের জন্যও তাই বরাদ্দ ছিল। শীতের দিনে যে সব ছেঁড়া কাথার তলায় তার শয়ন। নির্দিষ্ট ছিল, তার ছাত্র এবং পুত্ররাও ছিল সেই সব ছেঁড়া কাঁথারই অংশভাক। এই সব ছাত্রদের দূরের হাট থেকে নুন-লঙ্কা আনতে বললে শিক্ষক এবং ছাত্র কেউই দ্বিধাগ্রস্ত হতেন না। বর্ষাকালের পূর্বে কাঠ কাঠতে বললে এসব ছাত্রদের আনন্দের কোনও ব্যাঘাত হত না কিংবা তার জন্য ছাত্রের পিতা বা অভিভাবকদের কাছে জবাবদিহিরও কোনও প্রশ্ন ছিল না। কারণ, আত্মীয় কিংবা অনাত্মীয় ছাত্রের পিতৃত্বের কাজটি পুরোপুরি ছিল শিক্ষকের। ফলত ছাত্রকে চলতে হত পুত্রের দায় বহন করে। পরবর্তী জীবনে আমার পিতার অনেক ছাত্রকে আমাদের পারিবারিক জীবনে কর্তৃত্বও করতে দেখেছি। জানি না, আপনারা কী বলবেন–ছাত্র জীবনের সেই মধুর অত্যাচার তারা আরও মধুরতর পন্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস। এ ছাড়া অত্যাচারের আর কোন অর্থই বা এখানে বিবেচ্য হতে পারে।
