অসুর-বীরেরা শুক্রাচার্যের দিকে অপছন্দের ভঙ্গিতে তাকিয়ে একটু চোখ গরমও করলেন–ক্রুদ্ধাঃ সংরক্তলোচনাঃ। শুক্রাচার্য রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অসুরদের ছেড়ে চলে গেলেন। যাবার আগে একটা অভিশাপও দিয়ে গেলেন। বললেন–তোরা যখন আমার কথা শুনলি না, তখন যুদ্ধে তোরা অবশ্যই হেরে যাবি। আমাকে অবজ্ঞা করার ফল তখন বুঝতে পারবি-মদবজ্ঞাফলং কামং স্বল্পে কালে হ্যবাঙ্যথ। শুক্রাচার্য অভিশাপ দিয়ে চলে যেতেই বৃহস্পতির কাজ শেষ হয়ে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের রূপ ধারণ করলেন এবং ইন্দ্রের কাছে গিয়ে বললেন-কাজ হয়ে গেছে। শুক্রাচার্য নিজে তার শিষ্যদের শাপ দিয়েছেন–যুদ্ধে তাদের হার হবে। অতএব কেল্লা ফতে–কৃতং কার্যং ময়া ধ্রুব।
দৈত্যদানবরা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং লজ্জায় অধোবদনে শুরু শুক্রাচার্যের পা জড়িয়ে ধরলেন। শুক্রাচার্যের মায়া হল। তিনি অভিশাপ প্রত্যাহার করলেন না বটে, তবে ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
আমি যে এতক্ষণ ধরে শুক্রাচার্য–জয়ন্তী, ইন্দ্র-বৃহস্পতির সম্বন্ধে নানা কথা শোনালাম, তার কারণ দুটি। এক, কোন অবস্থায় শুক্রাচার্য সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে এসেছিলেন। দুই, শুক্রাচার্যের ঔরসে দেবযানীর জন্ম। কোনও কোনও পুরাণে শুক্রাচার্যের আরও দুটি স্ত্রীর নাম পাওয়া যায়। এমনও একবার শোনা গেছে যে, এই দুয়েরই অন্যতমা উৰ্জস্বতীর গর্ভেই দেবযানীর জন্ম। কিন্তু জয়ন্তী এবং শুক্রাচার্যের সঙ্গে মৃত-সঞ্জীবনী বিদ্যা এবং দেবযানী দুটোই যেহেতু জড়িত, তাই অতি প্রাচীন বায়ুপুরাণের বিবরণ–দেবযানী জয়ন্তীর গর্ভজাতা–এই কথাটাই আমরা বেশি বিশ্বাস করি। আরও বিশ্বাস করি এই কারণে যে, দেবযানী পিতৃ-পালিতা এবং তার নয়নের মণি। দেবযানী ঊর্জস্বতীর মেয়ে হলে, দেবযানীর মায়ের নাম বারে বারে আমরা শুনতে পেতাম।
বৃহস্পতি যেমন শুক্রাচার্যের আগমন শুনেই স্বর্গলোকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তেমনই জয়ন্তীও হয়তো পিতার প্ররোচনায় অথবা শুক্রাচার্যের শাপভয়ে স্বর্গে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ শুক্রাচার্য অসুরদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর থেকে আর আমরা জয়ন্তীর সংবাদ পাচ্ছি না। ধরে নিতে পারি-কন্যা দেবযানীকে রেখে জয়ন্তী একা বিদায় নিয়েছিলেন স্বর্গের পথে। আর দেবযানী শুক্র-পিতার সমস্ত আদর এবং মমতা লাভ করে মানুষ হচ্ছিলেন শুক্রাচার্যের কাছে। জন্মের পর-পরই দেবযানীর মা চলে যাওয়ায় তার ওপরে শুক্রাচার্যের স্নেহ এতই মাত্রা-ছাড়া রকমের ছিল যে, অসুর-গুরু মেয়ের সামান্য আহ্বাদের জন্যও অনেক কিছু করতে পারতেন। এর প্রমাণ পাব পরে এবং পদে পদে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হবে–শুক্রাচার্য যখন অসুরদের অভিশাপ দিয়েছিলেন, তখন অসুরদের মুখপাত্র ছিলেন বুড়ো প্রহ্লাদ। শুক্র বলে দিয়েছিলেন–আমার কথা মিথ্যা হবার। নয়। তবে তোমার নাতি বলি রাজার রাজত্বে আবার তোমরা স্বর্গরাজ্য লাভ করবে। শুক্রাচার্য অবশ্য তাঁর শিষ্যদের উপকারে বিরত হননি। অসুরদের ওপর অত্যাচার হলেই তিনি তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন এবং দেবতাদের আঘাতে মৃত্যু হলে সঞ্জীবনী মন্ত্রে বাঁচিয়ে তোলার কাজটিও করতেন। মনে রাখতে হবে–প্রহাদ দিতির ছেলে, দৈত্য।
তিনি যখন দেখলেন–তার বংশে স্বর্গ-গৌরব আসতে দেরি আছে কিছু, তিনি তখন একটু থিতিয়ে গেলেন হয়তো। এই সুযোগে দনুর ছেলে, দানব-কুলের প্রধান পুরুষ বৃষপর্বা দানবদের নেতৃত্ব দিয়ে দেবতাদের সঙ্গে সংঘর্ষ লাগিয়ে দিলেন এবং দৈত্য-দানব–সবারই মুখ রাখলেন বলা যায়।
বলা বাহুল্য, সংঘর্ষের বিষয় সেই একটাই–তিনি ভুবনের অধিকার। দেবতারা বলেন স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের প্রভু হলাম আমরা। অসুররাও তাই বলেন। বলেন–তোরা নয়, আমরাই প্রভু-ঐশ্বর্যং প্রতি সংঘর্ষে স্ত্রৈলোক্যে সচরাচরে। আবারও সেই একই ব্যাপার। দেবতারা গিয়ে ধরলেন অঙ্গিরার পুত্র বৃহস্পতিকে। অসুররা ধরলেন শুক্রাচার্যকে। দেবতা এবং অসুরদের পরস্পর প্রতিপক্ষতা মানেই এই দুই ব্রাহ্মণের চিরন্তন মর্যাদার লড়াই–ব্রাহ্মণৌ তাবুভৌ নিত্যমন্যোন্যস্পর্ধিনৌ ভূশম। তবে এবারের লড়াইতে নতুন বৈশিষ্ট্যটা মহাভারতের কবি একান্তে লিপিবদ্ধ করেছেন। বলেছেন–দেবতারা যখন অসুর দানবদের ওপর মারণাস্ত্র ক্ষেপণ করে মেরে ফেলেছিলেন, তখন শুক্রাচার্য তার সঞ্জীবনী মন্ত্রে তাদের বাঁচিয়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছিলেন–তান্ পুনর্জীবয়ামাস কাব্যো বিদ্যাবলাশ্রয়া। তারা বেঁচে উঠে আবার যুদ্ধ। আরম্ভ করে দিচ্ছিলেন দেবতাদের সঙ্গে। কিন্তু বৃহস্পতির ক্ষমতা সীমিত। যে সমস্ত দেবতারা অসুরদের হাতে মারা পড়ছিলেন, তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা বৃহস্পতির ছিল না, কারণ বৃহস্পতি সেই সঞ্জীবনী বিদ্যা জানেন না–ন হি বেদ স তাং বিদ্যাং যৎ কাব্যো বেত্তি বীর্যবান।
এ ঘটনায় প্রথমে দেবতাদের কষ্ট হচ্ছিল, পরে সেটা ভয়ের রূপ নিল। তারা বৃহস্পতির বড় ছেলে কচের কাছে গিয়ে বললেন-একটু সাহায্য করতে হবে, দাদা। ওই যে মানুষ বাঁচানোর বিদ্যে–মৃত সঞ্জীবনী ওই বিদ্যেটি তোমায় শিখে আসতে হবে, দাদা! সে বিদ্যে জানেন শুধু শুক্রাচার্য, যিনি এখন দানবরাজ বৃষপর্বার বুদ্ধিদাতা। একমাত্র তুমিই সেখানে যেতে পার। তোমার বয়স কম, শুক্রাচার্যের কাছে শিক্ষানবিশী করতে গেলে কেউ তোমায় সন্দেহ করবে না–তমারাধয়িতুং শক্তো ভবান্ পূর্ববয়াঃ কবি। দেবতারা শুক্রাচার্যের কাছে কচকে সোজাসুজি পাঠাতে চাইলেন না। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। দেবতারা কচকে বললেন–জান তো ভাই, শুক্রাচার্যের একটি মেয়ে আছে। নাম দেবযানী। সে যেমন আহ্লাদী মেয়ে, তার ওপরে শুক্রাচার্যের প্রশ্রয়ও সেইরকম–দয়িতাং সুতাং তস্য মহাত্মনঃ। তুমি তাকে ধরেও তোমার কাজ আদায় করতে পার। সত্যি কথা বলতে কি, তুমি তোমার স্বভাব-চরিত্র, দয়া-দাক্ষিণ্য, মধুর ব্যবহার–সব কিছু দিয়ে যদি দেবযানীর হৃদয় বিগলিত করতে পার, তবে জেনে রেখ–সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখতে তোমার দেরি হবে না–দেবযান্যাং হি তুষ্টায়াং বিদ্যাং তাং প্রান্স্যসি ধ্রুবম্।
