হ্যাঁ, এটা অবশ্যই ঠিক, ইন্দ্র তাঁকে যে কাজ করতে পাঠিয়েছিলেন, সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে অন্যভাবে। অর্থাৎ তিনি জয়ন্তীকে দিয়ে শুক্রাচার্যের তপস্যা ভাঙিয়ে সঞ্জীবনী মন্ত্র না পাওয়ার মতো ব্যাঘাত কিছু সৃষ্টি করতে পারেননি। কিন্তু আপাতত দশ বৎসর সময় পাওয়ায় ইন্দ্র অন্য খেলায় মন দিলেন। তিনি যখনই দেখলেন–দৈত্য-দানবরা জয়ন্তী আর শুক্রাচার্যকে রমমান অবস্থায় রেখে চলে গেল, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেবগুরু বৃহস্পতির সঙ্গে পরামর্শ করতে বসে গেলেন–রমমানং তথা আত্বা শক্রঃ প্রোবাচ তং গুরুম। ইন্দ্র বললেন–একটা ব্যবস্থা করুন গুরুদেব। ছলছুতো করে হোক, যেভাবে হোক, আমাদের কাজটা তো আপনাকে করে দিতে হবে–অস্মাকং কুরু কার্যং তং বুদ্ধ্যা সঞ্চিস্ত্য মানদ।
বৃহস্পতি নানা ভাবনা-চিন্তা করে শুক্রাচার্যের রূপ ধারণ করলেন। শুক্রাচার্যের যেমন জামা-কাপড়, যেমন দাড়ি, যেমন ভাবভঙ্গি এমনকি তিনি যেভাবে কথা বলেন-সেইভাবে সব। রপ্ত করে দেবগুরু বৃহস্পতি অসুর-গুরুর রূপ ধরে দৈত্য-দানবদের সামনে উপস্থিত হলেন। দৈত্য-দানবরা শুক্ররূপী বৃহস্পতিকে একটুও চিনতে পারল না। আর যেটুকু বা অন্যরকম দেখাচ্ছিল তা নিশ্চয়ই তারা মেনে নিলেন এই ভেবে যে, বহুদিন ব্যাপী তপস্যার ফলে হয়তো আচার্যের চেহারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। তবে তারা এসব কিছু ভাবেনইনি, শুক্রাচার্যের রূপধারী বৃহস্পতির ছলাকলায় তারা এতটুকুও সন্দেহ প্রকাশ করেননিন বিদুস্তে গুরোমায়াং কাব্যরূপ-বিভাবিনীম। এতকাল পরে গুরুকে দেখে তারা সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করলেন। যথাবিধি অভিনন্দন করে একপাশে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন–প্রণম্য সংস্থিতাঃ সর্বে।
শুক্ৰবেশী গুরু বললেন–তোমরা সব ভাল তো? তোমাদের ভালর জন্যই আমি এতকাল দুশ্চর তপস্যা করে ভগবান শ্যুকে তুষ্ট করেছি। লাভ করেছি সঞ্জীবনী বিদ্যা। তোমাদের সে বিদ্যা একে একে শিখিয়ে দেব–অহং বোধরপয়িষ্যামি প্রাপ্ত বিদ্যা ময়া হি সা। অসুররা আনন্দে আত্মহারা হলেন–তাদের গুরু সফল হয়ে ফিরেছেন, আর তাদের কোনও চিন্তা নেই। দেবতাদের আক্রমণে আহত কিংবা হত হলেও বেঁচে ওঠার সমস্যা আর রইল না। তারা সব শুক্ৰবেশী বৃহস্পতির পিছন পিছন ঘুরঘুর করতে লাগলেন। কোনও কোনও পুরাণ জানিয়েছে যে, বৃহস্পতি মৃত-সঞ্জীবনী বিদ্যা জানতেনই না, তো শেখাবেন কী করে? তিনি নাকি ওই পুরো দশ বছর ধরে অসুরদের অহিংসাব্রত শিখিয়েছিলেন।
সে যাই হোক, এদিকে দশ বৎসর কেটে গেলে শুক্রাচার্যেরও জয়ন্তীর মোহ খানিকটা কেটে গেল। ইতোমধ্যে জয়ন্তীর গর্ভে তার অসাধারণ সুন্দরী একটি মেয়ে হয়েছে। কন্যার নাম দেবযানী-সময়ান্তে দেবযানী সদ্যোজাতা সুতা তদা। শুক্রাচার্য এবার তার অসুর-যজমানদের কথা স্মরণ করলেন। তিনি জানেন-কী অসীম ধৈর্য নিয়ে তার শিষ্যেরা তার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকবেন–আশয়া মম মার্গং তে পশ্যন্তঃ সংস্থিতা কিল। জয়ন্তীকে ডেকে শুক্রাচার্য বললেন–একবার শিষ্যদের একটু দেখে আসি। তারা আমার ভক্ত, তাদের যাতে দেবতাদের থেকে ভয় না হয়, সেটা তো আমায় দেখতে হবে–মা দেবেভ্যো ভয়ং তেসাং মদ্ভক্তানাং ভবেদিতি। জয়ন্তী শুদ্ধমনে–পুরাণের ভাষায়, জয়ন্তী ধর্মবিত্তমা’, শুক্রাচার্যের কথায় সম্মতি দিয়ে বললেন–আপনি যজমানদের দেখতে যাবেন, অসুরদের যাজক হিসেবে সেই তো আপনার ধর্ম, আমি আপনার ধর্মলোপ করব না–এষ ব্ৰহ্মণ সতাং ধর্মো ন ধর্মং লোপয়ামি তে। আপনি স্বচ্ছন্দে যান।
শুক্রাচার্য জয়ন্তীর প্রতি মমতায় পুনরাগমনের অঙ্গীকার করে অসুরদের কাছে গেলেন। গিয়ে দেখলেন–অভাবিত কাণ্ড। দেবগুরু বৃহস্পতি তারই বেশ ধরে অসুরদের নানা উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। শুক্রাচার্য অসুরদের ডেকে বললেন-বাছারা! বৃহস্পতি তোমাদের প্রতারিত করেছেন। ইনি মোটেই শুক্র নন, ইনি বৃহস্পতি, অঙ্গিরার পুত্র বৃহস্পতি। আমি হলাম গিয়ে আসল শুক্র-কাব্যং মাং তাত জানীধ্বমেষ হ্যাঁঙ্গিরসো ভুবি। দৈত্য-দানবরা শুক্রের কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে একবার শুক্রাচার্যকে, আরেকবার বৃহস্পতিকে দেখতে লাগলেন–প্রেক্ষন্তে স্ম ভৌ তত্র। কিন্তু কিছুতেই তারা ঠিক করতে পারলেন না–কোনটা আসল শুক্র। শুক্রাচার্য বিমূঢ় অসুরদের আবার বলেলন–ওরে বোকারা! এটা দেবতাদের গুরু। এঁকে ছাড়! তোরা আমাকে অনুসরণ কর, এটা বৃহস্পতি–অনুগচ্ছত মাং সর্বে ত্যজনৈং বৃহস্পতিম্।
শুক্রাচার্য যখন তারস্বরে আত্মঘোষণা করে যাচ্ছেন, তখন বিপদ বুঝে বৃহস্পতি পালটা চাল চাললেন। বৃহস্পতি বললেন–ঘোর চালাকি। একদম ফাঁকে পড়ো না বাছারা। ইনিই দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি। আমার ছদ্মবেশ ধরে তোমাদের ভোলাচ্ছে। এতদিন কোথায় ছিলেন উনি? তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ–আমিই শুক্র, ওটাই বৃহস্পতি-কাব্যোহং বো গুরুদৈত্যা মপোয়ং বৃহস্পতিঃ। দশ বছর ধরে শুক্ররূপী বৃহস্পতির কাছে থেকে, দশ বছর তার সমস্ত আদেশ-উপদেশ শোনার অভ্যাসে দৈত্য-দানবরা আসল শুক্রাচার্যকে গ্রহণ করলেন না। তারা বললেন–দশ বছর ধরে ইনি আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন। ইনিই আমাদের গুরু। ইনি অঙ্গিরার পুত্রই হোন, আর ভৃগু-পুত্রই হোন এঁকেই আমরা আমাদের গুরু বলে মানি। আপনি এখন যেতে পারেন–অয়ং গুরুৰ্হিতোস্মাৈকং গচ্ছ ত্বং নাসি নো গুরুঃ–আপনি আমাদের গুরু নন।
