একদৃষ্টি শুক্রাচার্য ধুম-তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে যেদিন সঞ্জীবনী মন্ত্র পেলেন মহাদেবের কাছে, সেদিন তার দৃষ্টি পড়ল ইন্দ্রকন্যা জয়ন্তীর ওপর। কতকাল ধরে এই রমণী তার ভোজন-শয়ন, জপ-যজ্ঞ-তপস্যার ওপর নির্বাক দৃষ্টি রেখেছে। একদিনের তরেও সে বলেনি–আমি ইন্দ্রকন্যা, আমি এই চাই আপনার প্রসন্নতার পরিবর্তে। শুধু প্রসন্নতাই যে চেয়েছে তার দিকে আজ ঘুরে দাঁড়ালেন শুক্রাচার্যকে তুমি রমণী? তুমি কি কারও পত্নী? কেনই বা তুমি আমার কষ্ট দেখে কষ্ট পাও–কস্য ত্বং সুভগে কা বা দুঃখিতে ময়ি দুঃখিতা? আমি কঠোর তপস্যায় মগ্ন, আর তুমি সব সময় আমাকে রক্ষা করে চলেছ। আমার প্রতি মমতায় আমাকে তুমি শুধু প্রশ্রয়ই দিয়েছ, আর তোমার দিক থেকে ছিল শুধু আত্মদমন, নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করা। আমি বড় খুশি হয়েছি। বল তুমি কী চাও, তোমার সমস্ত প্রার্থনা আমি পূরণ করব–কিমিচ্ছসি বরারোহে কস্তে কামঃ সমৃধ্যতাম্।
ইন্দ্রকন্যা জয়ন্তী নিজের পরিচয় দিলেন না। শুধু সলজ্জে বললেন–আমি কী চাই জানি না! আপনি আপনার মনের তপস্যায় জেনে নিন আমি কী চাই? শুক্রাচার্য তপস্যায় বসেন। স্মরণ করেন–প্রথম সেই দিনটির কথা, যেদিন মধ্যাহ্নের সূর্য-দন্ধ তার মাথার ওপর আঁচল বিছিয়ে ছায়া করে দাঁড়িয়েছিল এই রমণী। একে একে স্মরণ-তপস্যায় ভেসে আসে জয়তীর। নানা চিত্রপট–শয়নে বসনে আসনে অশনে, তার উৎকট তপশ্চরণে তপস্বিনী এক রমণীর সদা-জাগ্রত সুরক্ষার ছবি। কিন্তু কেন? কেন এই শুষ্ক-রুক্ষ মুনির জন্য রমণীর এই রমণীয় মমতা? শুক্রাচার্য বুঝলেন-রমণী কী চায়। তবু এই অভিনব সুন্দরীর আপন মুখে শুনতে ইচ্ছে হয় সেই কথা–যা বার বার উচ্চারণে লাঘবতা প্রাপ্ত হলেও চিরন্তন। শুক্রাচার্য বললেন-আমি আমার মনশ্চক্ষুতে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি তোমার মনের কী অভিলাষ। তবু তুমি একবার স্পষ্ট করে স্বকণ্ঠে বলো সে কথা, আমি শুনতে চাই।–আতং ময়া তথাপি ত্বং ব্ৰহি যন্মনসেঙ্গিত। তুমি যা বলবে আমি শুনব। করব।
জয়ন্তী বললেন আমি ইন্দ্রের কন্যা। জয়ন্তের কনিষ্ঠা ভগিনী। আমি আপনাকে ভালবাসি, আচার্য। আমি আপনার সঙ্গ কামনা করি। আপনার সঙ্গে মিলিত হতে চাই ধর্মের নিয়ম-বিধি অনুসারে-রহস্যে ত্বয়া মহাভাগ ধর্মতঃ প্রীতিপূর্বক শুক্রাচার্য সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন–দশ বছর। দশ বছর আমার সঙ্গে তুমি সুখে কালাতিপাত কর, সবার অগোচরে অদৃশ্যভাবে। শুক্রাচার্য সম্মতা জয়ন্তীকে গৃহে নিয়ে গেলেন। নিজগৃহে কিনা বলা যায় না, তবে কোনও গৃহে নিশ্চয়। তারপর বিধিসম্মতভাবে তার পাণিগ্রহণ করে শুক্রাচার্য ইন্দ্রকন্যা জয়ন্তীর সঙ্গসুখে মত্ত হলেন–এবমুক্তা গহং গত্বা জয়ত্যাঃ পাণিমুহ।
দৈত্য-দানবদের মধ্যে হই-হই পড়ে গেল। তারা শুনেছেন–তাদের গুরু তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে ফিরে এসেছেন। মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা এখন শুক্রাচার্যের করায়ত্ত। তারা সকলে ছুটে এলেন গুরুর বাড়িতে। কিন্তু কোথায় কী, গুরুকে তারা চোখের দেখাও দেখতে পেলেন না। সেই যে শুক্রাচার্য জয়ন্তীকে বলেছিলেন–তোমার সঙ্গসুখে থাকব দশ বছর, সকলের অগোচরে অদৃশ্য হয়ে–সর্বভূতৈরদৃশ্যা চ রমস্বেহ যদৃচ্ছয়া। অতএব মায়াবৃত শুক্রাচার্যকে অসুরেরা দেখতে পেলেন না। দৈত্য-দানবরা তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতায় জানতেন যে তাদের আচার্য অসম্ভব ‘মুডি’ মানুষ। কখন তার কী ইচ্ছে হয় কেউ বলতে পারে না। তারা যেমন গুরুর সিদ্ধিলাভ এবং ফিরে আসার সংবাদ পেয়েছিলে, তেমনই এও নিশ্চয়ই শুনেছিলেন যে, এক রমণীকে ভালবেসে শুক্রাচার্য তাকে নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে। মায়াবৃত’–কথাটার মধ্যে যতই অলৌকিকতা থাকুক, আমাদের ধারণা–অসুরেরা যখন শুক্রাচার্যের খবর পেয়ে দেখতে এসেছিলেন, তখন দেখাও নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন। কিন্তু জয়ন্তীর সহবাসে শুক্রাচার্যের সরস অবস্থা দেখে তারা তাকে আর বিরক্ত করার সাহস পাননি। তারা পালিয়েছেন। পুরাণের কথা থেকেও তা বোঝা যায়। গুরুকে না দেখে অসুর-বীরেরা সিদ্ধান্ত নিলেন–তাদের গুরুর এখন এই রকমটাই ভাল লাগছে, তিনি যখন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে চাইছেন, অতএব তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না-দাক্ষিণ্যং তস্য ত বুধ্বা প্রতিজম্মু যথাগত। তারা ফিরে গেলেন।
আগেও দেখেছি–অসুরেরা নিজেদের সততায় ঠিক থাকেন। তারা যখন ঠিক করলেন– গুরুর বাড়ির কাছাকাছিও থাকবেন না। অতএব তারা থাকেননি। তারা যখন ভাবলেন–গুরু যেদিন নিজের ইচ্ছেয় আসবেন, সেদিনই তার সঙ্গে দেখা হবে; অতএব তারা বাড়িতেই গুরুর অপেক্ষায় বসে রইলেন। শুক্রাচার্যের ধারও মাড়ালেন না। ঠিক এই সুযোগেই ইন্দ্রের খেলা শুরু হল। দেবপক্ষপাতী পৌরাণিকেরা ছোট্ট করে জানিয়েছেন–ইন্দ্রকন্যা জয়ন্তী পিতার কার্যসাধনের জন্যই শুক্রাচার্যকে দশ বৎসর ব্যস্ত করে রেখেছিলেন ইন্দ্রিয়সুখের মোহজালে-পির্থে দশবর্ষানি জয়ন্ত্যা হিতকাম্যয়া। কিন্তু আমাদের ধারণা–এই মোহজালে শুক্রাচার্য নিজেই ধরা দিয়েছিলেন। দশ বৎসর সময়টিও তাঁরই দেওয়া। ইন্দ্রিয়ের সকল দ্বার রুদ্ধ করে অনেক বছর তপস্যা করার পর আচার্যের এই মুক্তি কামনাও কোনও অস্বাভাবিক কাণ্ড নয়। জয়ন্তীও কোনও জাল বিস্তার করেননি। তিনি শুক্রাচার্যের ছন্দচারিণী হয়েছেন তাঁরই ইচ্ছায়।
