ধূমোগারী কুণ্ডাধার আমাদের ধারণায় কোন হট স্প্রিং হবে বোধহয়, আর হাজার হাজার বছরের তপস্যা মানে বহু বছরের তপস্যা। সে যাই হোক শুক্রাচার্য একদিকে তপস্যায় বসলেন, অন্যদিকে অসুরেরাও নিয়ম-ব্রতে মন দিলেন। দেবতারা অবশ্য এই সুযোগ ছাড়লেন না। এই অবস্থাতেও তারা অসুরদের ওপর আক্রমণ চালাতে লাগলেন। অসহায় অসুরেরা তখন শুক্রের। মায়ের কাছে আশ্রয় নিলেন। শুক্রমাতা কোনওক্রমে অসুরদের বাঁচিয়ে রাখলেও তিনি নিজে দেবতাদের হাত থেকে নিস্তার পাননি। কিন্তু সুবিধা ছিল–সেটা ভৃগুমুনির আশ্রম। ভৃগুমুনি খুব সহজ লোক নন। একালের কবি তাঁকে বিদ্রোহী বলে চিহ্নিত করেছেন, কাজেও তিনি তাই ছিলেন। ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে যাঁর বাঁধেনি, তাঁর পক্ষে ইন্দ্র-বিষ্ণুর সাহস প্রতিহত করা মোটেই অসম্ভব হয়নি। অসুরেরা শুক্ৰমাতার নিরাপদ আশ্রয়ে কোনওরকমে বেঁচে রইলেন।
দেবতারা প্রমাদ গুনলেন। সব কিছু পেয়েও ইন্দ্রের রাতের ঘুম কেড়ে নিলেন শুধু শুক্রাচার্য। তিনি নিশ্চল তপস্যায় মগ্ন। ঠিক এই সময়ে ইন্দ্র দুটি কাজ করলেন। কাজ দুটি ক্রমান্বয়ে বলতে হবে। প্রথম কাজ-ইন্দ্র তার নিজের মেয়ে জয়ন্তীকে ডেকে বললেন–বৎসে! একটা কাজ করে দিতে হবে তোমায়। অসুরগুরু শুক্রাচার্য ধূম্ৰত গ্রহণ করে দুশ্চর তপস্যা করছেন মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য। এই কারণে আমি বড় ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। হয়তো আমার ইন্দ্ৰত্বই চলে যাবে। এই সময়ে আমার আদেশে তুমি শুক্রাচার্যের কাছে যাও। তার যেমন ভাল লাগে, তেমন ব্যবহারে, নানা উপচারে তুমি তাকে সেবা করে বশ করো–সমারাধয় তন্বঙ্গি মৎকৃতে তং বশং কুরু। শুধু আমার জন্য এই কাজটা তোমায় করে দিতে হবে।
ইন্দ্র জানতেন—মনোমোহিনী অপ্সরাদের শুক্রাচার্যের কাছে পাঠালে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাতে তপস্বী মুনির অভিশাপ জোটা মোটেই অসম্ভব নয়। তার চেয়ে নিজের মেয়ে যদি বাপের করুণ অবস্থা বুঝে তোষামোদ আর ভালবাসায় কার্যোদ্ধার করতে পারে, সেটাই হবে সবচেয়ে ভাল। শব্দটাও তিনি ব্যবহার করেছেন মোক্ষম–বশং কুরু–বশ করতে হবে, যেভাবে হোক। নিজের মেয়েকে এর চেয়ে বেশি কীই বা আর বলা যায়। পিতার চিন্তাকুল অনুরোধ শুনে শুভচারিণী জয়ন্তী সোকণ্ঠে উপস্থিত হলেন শুক্রাচার্যের তপোভূমিতে যেখানে শুধু কুণ্ড-ধূমপান করে শিবের তপস্যায় মগ্ন আছেন অসুর-গুরু।
শুক্রাচার্যকে দেখার পর থেকে জয়ন্তী তার সঙ্গে সেই ব্যবহারই করতে লাগলেন, যেরকমটি ইন্দ্র তাকে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবহারের মাত্রায় বুঝি কিছু তফাৎ ছিল। স্বার্থের কথা মাথায় রেখে নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে শতেক প্রলোভন সৃষ্টি করতে পারতেন জয়ন্তী। কিন্তু ইন্দ্রের নিজের মেয়ে হওয়ার জন্যই হোক, অথবা জয়ন্তীর মধ্যে সেই গভীরতা আগে থেকেই ছিল, যার জন্য তিনি শুক্রাচার্যের সঙ্গে কোনও অসংযত আচরণ করতে পারলেন না। অন্যদিকে সমস্ত দেবতার বিরুদ্ধ-পক্ষে দাঁড়িয়ে একা একটি মানুষ কীভাবে তার হতশ্রী শিষ্যদের জন্য কষ্ট করে যাচ্ছেন–এই উদ্যম, এই প্রয়াস জয়ন্তীকে মুগ্ধ করল। জয়ন্তী শুক্রাচার্যের মায়ায় পড়ে গেলেন।
ধূমোদগারী জলাধারের পাশে বসে শুক্রাচার্য তপস্যা করেন, আর জয়ন্তী তার শরীরের উষ্ণতা হ্রাস করার জন্য কলার পাতা কেটে এনে তাকে হাওয়া করেন–কদলীদলমাদায় বীজয়ামাস তং মুনি। তৃষ্ণারুক্ষ মুনির সামনে এনে রাখেন সুবাসিত নির্মল জল। গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে শুক্রাচার্য যখন শিবের তপস্যায় প্রচণ্ড দাব দাহ সহ্য করছেন, তখন জয়ন্তী তার আঁচল বিছিয়ে ছায়া করেন মুনির মাথার ওপর—ছায়াং পত্রেণ ভাস্করে মধ্যগে সতি। দিনান্তে মুনির ভোজনের জন্য বন্য ফল আহরণ, সকাল বেলায় মুনির নিত্যকর্ম অগ্নিষ্টোমের জন্য কুশ-কুসুমের ব্যবস্থা রাত্রে পল্লব-শয্যা রচনা করে আচার্যকে একটু পাখার হাওয়া করার জন্য বসে থাকেন জয়ন্তী। মুনি কোনও কথা বলেন না। জয়ন্তীও কোনও কথা বলেন না, এমন কোনও ব্যবহারও করেন না, যাতে মুনির মনে বিকার আসে, অথবা ক্রোধের আবেশ হয়–হাবাভাবাদিকং কিঞ্চি বিকারজননঞ্চ যৎ ন চকার জয়ন্তী সা শাপভীতা মুনেস্তদা। এক অর্থে শুক্রাচার্য যদি মহাদেবের তুষ্টির জন্য তপস্বী হয়ে থাকেন, তবে ইন্দ্রকন্যা জয়ন্তী শুক্রাচার্যের তুষ্টির জন্য তপস্বিনী। আসলে জয়ন্তী অসুরগুরু শুক্রাচার্যকে ভালবেসে ফেলেছেন।
পৌরাণিক সংখ্যার গৌরবে হাজার বছর পর শুক্রাচার্যের তপস্যা নির্বিঘ্নে শেষ হল। সন্তুষ্ট মহাদেব বর দিলেন–যে তপস্যা তুমি করেছ, তা অন্য কেউ পারে না। আমি আশীর্বাদ করছি–আমি যে নিগুঢ় মন্ত্র জানি তার সমস্ত রহস্য তুমি ছাড়া আর অন্য কারও কাছে প্রতিভাত হবে না–প্রতিভাস্যতি তে সর্বং তস্যাদ্যন্তং ন কস্যচিৎ। এই মন্ত্রের শক্তিতে এবং তোমার প্রতিভার তেজে তুমি সমস্ত সুর-সমাজকে পরাভূত করতে পারবে–তেজসা চাপি বিবুধান্ সর্বানভিভবিষ্যসি।
মহাদেব শুক্রাচার্যকে যে মন্ত্র দান করলেন, সেটারই নাম সঞ্জীবনী মন্ত্র-যে মন্ত্রে মৃত অসুরদের বাঁচিয়ে তুলতে পারবেন শুক্রাচার্য, যে মন্ত্র জানবার জন্য দেবসভা থেকে স্বয়ং বৃহস্পতির পুত্র কচ আসবেন শুক্রাচার্যের কাছে। কিন্তু তার আগে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে সেই মৌন-মূক রমণীটির দিকে যিনি শুক্রাচার্যকে বশ করতে এসে নিজেই বশীভূত হয়ে বসে আছেন।
০৩০. ইন্দ্রকন্যা জয়ন্তী
৩০.
