সত্যি কথা, স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রের সুস্থিতির জন্য দেবগুরু বৃহস্পতি করেননি হেন কাজ নেই। নিজে বেদবাদী ব্রাহ্মণ হয়েও রজির পুত্রদের নাস্তিকের ধর্ম শিক্ষা দিয়েছেন। একবার দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য তপস্যায় গেলে বৃহস্পতি শুক্রাচার্যের বেশ ধরে দৈত্যশিবিরে গিয়েছিলেন এবং দৈত্যদের এমন কুশিক্ষা দিয়েছিলেন যে, তাদের সে শিক্ষা ভুলতেই সময় লেগেছিল কয়েক বছর। এসব তো সামান্য কথা। ইন্দ্র এবং অপরাপর দেবতাদের জন্য অনেক গভীর অন্যায়। এবং ছলের আশ্রয় নিয়েছেন বৃহস্পতি। কিন্তু তবু কখনও এমন হয়নি যে, দৈত্য-দানবেরা তার বুদ্ধিতে চিরতরে বিনষ্ট হয়ে গেল আর দেবতারা চিরতরে স্বর্গলক্ষ্মীর ঐশ্বর্য ভোগ করলেন।
না, এমন হয়নি। হয়নি, তার কারণ বলেছিলাম প্রথমে। অমৃত, লক্ষ্মী এবং স্বর্গরাজ্যের অধিকার নিয়ে দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের চিরকালের লড়াই লেগেই ছিল। এই লড়াইতে দেবগুরু বৃহস্পতি যেমন দেবতাদের স্বার্থরক্ষায় সদা-সর্বদা নিযুক্ত ছিলেন, তেমনই শুক্রাচার্য নিয়েছিলেন অসুরদের পক্ষ। শুক্রাচার্য মহা তেজস্বী ব্রাহ্মণ। আমরা পূর্বে ভৃগু এবং পুলোমার কাহিনী বলেছি। শুক্রাচার্য ভণ্ড-পুলোমার সাত ছেলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। মহাভারতের একটি শ্লোক দেখে অবশ্য মনে হয়, শুক্রাচার্য ভৃগুর ছেলে না হয়ে নাতিও হতে পারেন। ভৃগুর পুত্র কবি, কবির পুত্র শুক্রাচার্য-ভূগোঃ পুত্রঃ কবি বিদ্বান্ শুক্রঃ কবিসুতো গ্রহঃ। আবার কোনও মতে ভৃগুমুনির অন্য নামই হল কবি। অতএব শুক্রাচার্য ভৃগুরই পুত্র। দেব-দানবদের প্রথম সংঘাতের সময় থেকেই বৃহস্পতি দেবতাদের পক্ষে আর শুক্রাচার্য দৈত্য-দানবদের পক্ষে যোগ দেন। শুক্র দেব-দানবদের পরামর্শদাতা, গুরু–অসুররামুপাধ্যায়ঃ শুক্ৰস্তু ঋষিসুতো হৃৎ।
মহাভারতে শুক্রাচার্যের বাসস্থানটিও বড় চমৎকার। তিনি নাকি মেরু-পর্বতের চূড়ায় থাকেন আর সমস্ত দৈত্য-দানবেরা দিনরাত তার পরিচর্যা করছে–তস্যৈ মূর্ধশনাঃ কাব্যে। দৈত্যৈ মহামতে। তার ভাণ্ডারে ধন-রত্নের শেষ নেই। সে ধন-রত্নের পরিমাণ এতটাই যে, ধনপতি কুবেরকে তিনি তার সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ ভাগ দেন–তস্মাৎ কুবেরো ভগবান্। চতুর্থং ভাগমতে।
শুক্রাচার্যের চার ছেলে এবং তারাও অসুর-রাক্ষসদের যাজন করেন। শুক্রাচার্য যখন থেকে অসুরদের শুরু হয়েছেন, তখন থেকে আরম্ভ করে এ পর্যন্ত দেবতা এবং অসুরদের বিরাট বিরাট যুদ্ধ হয়ে গেছে এবং সে যুদ্ধের সংখ্যা বারো। অসুরদের মধ্যে হিরণ্যকশিপু, প্রহাদ এবং বলি–এঁরা তিনজনই ইন্দ্রপদ লাভ করেন–ইন্দ্রায়স্তে বিখ্যাতা অসুরাণাং মহৌজসঃ–এবং প্রায় দশ যুগ ঐরা তিন ভুবনের সর্বময় অধিকর্তা ছিলেন। কিন্তু বলি বামনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাজ্য হারালে স্বয়ং ইন্দ্র আবার স্বর্গ দখল করেন। অসুরদের অবস্থা তখন খুবই খারাপ হয়ে পড়ল। মাঝে মাঝেই দেবতাদের অতর্কিত আক্রমণে অসুরেরা প্রাণ হারাতে লাগলেন। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য তার অসুর-শিষ্যদের ডেকে বললেন–বারোটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। প্রধান। প্রধান অসুরেরা সকলেই প্রায় নিহত হয়েছেন। এখন আর মাত্র ক’জন তোমরা বেঁচে আছ–কিঞ্চিচ্ছিষ্টাস্তু বৈ যুয়ং যুদ্ধেবত্যেষু বৈ স্বয়ম্। এই অবস্থায় তোমরা আর যুদ্ধের কোনও চেষ্টাই করো না। আমি অতি শীঘ্রই মহাদেবের তপস্যা করতে যাব। আমি জানি–ওদিকে বৃহস্পতি দেবতাদের জন্য কী মন্ত্র সাধনা করছেন। মহাদেবের উপাসনা করে আমাকে সেই মন্ত্র জেনে আসতে হবে, যা বৃহস্পতি কিংবা দেবপক্ষের অন্য কেউ জানেন না। তোমরা যুদ্ধ-বাসনা ত্যাগ করে আপাতত দেবতাদের সঙ্গে সন্ধি করো।
গুরুর কথা শুনে দৈত্যকুলের তদানীন্তন মুখপাত্র বুড়ো প্রহ্লাদ দেবতাদের ডেকে বললেন–আজ থেকে তোমাদের সঙ্গে আর আমাদের কোনও বিবাদ-বিসম্বাদ রইল না। তোমরা এই তিন ভুবনের অধিকার নাও-ন্যস্তবাদা বয়ং সর্বে লোকান্ যুয়ং ক্রমন্তু বৈ। আমাদের যা অবস্থা তাতে আমাদের গাছের বাকল পরে বনবাসী তপস্বী হওয়া ছাড়া কোনও উপায় আর নেই। তোমরা সুখে রাজত্ব করো।
অসুরেরা যা বলেন, তাই করেন। শুক্রাচার্যও অসুরদের পরিকল্পনা অনুমোদন করে বললেন–আমি যতদিনে মহাদেবের তপশ্চর্যা সেরে ফিরে না আসি, ততদিন তোমরাও সংযত হয়ে তপস্যায় মন দাও-যুয়ং তপশ্চরধ্বং বৈ সংবৃতা বন্ধলৈবনে। তারপর আমি ফিরে এলে দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ হবে আবার। সেখানে তোমাদের জয় হবে সুনিশ্চিত। শুক্রাচার্য চলে গেলেন। অসুররাও মন দিলেন তপস্যায়। দেবতারা একে একে অসুরদের সমস্ত ভূ-সম্পত্তি অধিকার করে নিলেন নিশ্চিন্তমনে।
শুক্রাচার্য মহাদেবের কাছে গিয়ে বললেন-প্রভু! আমি এমন বিদ্যা চাই, যা দেবগুরু বৃহস্পতিও জানেন না-মানিচ্ছাম্যহং দেব যে ন সন্তি বৃহস্পতৌ। মহাদেব দেখলেন শুক্রাচার্য যে উদ্যম নিয়েছেন–তাতে দেবতাদের বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তিনি ইচ্ছে করেই এমন এক কঠিন তপশ্চরণের নির্দেশ দিলেন শুক্রাচার্যকে, যা মনুষ্যদেহে প্রায় অসম্ভব। তিনি বললেন–তুমি যদি হাজার বছর ধরে অবামুখ অবস্থায় শুধু কুণ্ডধুম পান করে তপস্যা করতে পার তবেই বৃহস্পতির অগম্য সেই মন্ত্র লাভ করবে তুমি। শুক্রাচার্য মহাদেবের নির্দেশ মেনে তারই নির্দিষ্ট একটি ধূমোদগারী কুণ্ডাধারের পাশে তপস্যায় বসে গেলেন–তত নিযুক্তো দেবেন কুণ্ডাধারোস্য ধুমকৃৎ।
